যখন একটি শিশু নিরাপদ নয়, তখন সভ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ

আমরা প্রতিদিন নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং খুব বেশি হলে দেশের কোনো জটিল পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা সময় ভাবি। তারপর আবার নতুন ব্যস্ততা, নতুন ঘটনা, নতুন সংবাদ এসে পুরোনো সবকিছু সরিয়ে দেয়। এটাই আমাদের জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু পৃথিবীর এমন কিছু বাস্তবতা আছে, যেগুলো জানলে আমাদের প্রতিদিনের উদ্বেগগুলোও কখনও কখনও খুব ছোট মনে হয়। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, এই আধুনিক যুগেও পৃথিবীর এমন দেশ আছে যেখানে একটি ছোট্ট শিশুকে দিনের আলোতে অপহরণ করা হয়, ধর্ষণ করা হয়, নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তারপর দেহ টুকরো করে লুকিয়ে রাখা হয়? অপরাধী গ্রেপ্তার হওয়ার পর সব স্বীকার করলেও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা এতটাই ভেঙে গেছে যে মানুষ আর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা পর্যন্ত করতে পারে না। আবার এমন ঘটনাও ঘটে যেখানে একজন মানুষ রাস্তায় মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো, আর হত্যাকারী শহরের মাঝখান দিয়ে পালিয়ে অন্য দেশে চলে গেল। প্রশাসন তখনও কার্যকর কিছু করতে পারেনি। হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের কথা বলছি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের একটি ছোট্ট দেশ, যার ভৌগোলিক আকার সুইডেনের প্রায় এক তৃত

যখন একটি শিশু নিরাপদ নয়, তখন সভ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ

আমরা প্রতিদিন নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং খুব বেশি হলে দেশের কোনো জটিল পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা সময় ভাবি। তারপর আবার নতুন ব্যস্ততা, নতুন ঘটনা, নতুন সংবাদ এসে পুরোনো সবকিছু সরিয়ে দেয়। এটাই আমাদের জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা।

কিন্তু পৃথিবীর এমন কিছু বাস্তবতা আছে, যেগুলো জানলে আমাদের প্রতিদিনের উদ্বেগগুলোও কখনও কখনও খুব ছোট মনে হয়। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, এই আধুনিক যুগেও পৃথিবীর এমন দেশ আছে যেখানে একটি ছোট্ট শিশুকে দিনের আলোতে অপহরণ করা হয়, ধর্ষণ করা হয়, নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তারপর দেহ টুকরো করে লুকিয়ে রাখা হয়? অপরাধী গ্রেপ্তার হওয়ার পর সব স্বীকার করলেও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা এতটাই ভেঙে গেছে যে মানুষ আর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা পর্যন্ত করতে পারে না।

আবার এমন ঘটনাও ঘটে যেখানে একজন মানুষ রাস্তায় মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো, আর হত্যাকারী শহরের মাঝখান দিয়ে পালিয়ে অন্য দেশে চলে গেল। প্রশাসন তখনও কার্যকর কিছু করতে পারেনি।

হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের কথা বলছি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের একটি ছোট্ট দেশ, যার ভৌগোলিক আকার সুইডেনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। জনবহুল, দরিদ্র এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র। এমন এক বাস্তবতা, যেখানে কখনও কখনও মনে হয় আইন ও শৃঙ্খলা যেন কাগজে লেখা কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছু নয়।

সম্প্রতি ছোট্ট শিশু রামিসার ওপর ঘটে যাওয়া নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এত বছর ধরে বিচারহীনতা এবং অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি মানুষের মনে যে গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে, তা রামিসার বাবার অসহায় ক্ষোভ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

আহ্ রামিসা। ছোট্ট শিশুটি আর কখনও ফিরে আসবে না। কতটা ভয়, কষ্ট এবং অসহায়ত্ব নিয়ে তাকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয়েছে, সেটা কল্পনাও করা কঠিন। একটি শিশুর শৈশব হওয়ার কথা ছিল মুক্ত আকাশে পাখির মতো উড়ে বেড়ানোর, খেলাধুলা করার, নিরাপদে বড় হয়ে ওঠার। কিন্তু সে মানুষ নামের কিছু বিকৃত মানসিকতার শিকার হয়ে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়েছে।

এই ঘটনাগুলো শুধু অপরাধ নয়, এগুলো একটি সমাজের গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। দেশে কতটা বিকৃত মানসিকতার মানুষ বেড়ে উঠেছে, তা শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া একের পর এক নৃশংস ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। দ্রুত বিচার, অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এই পরিস্থিতি থামানো কঠিন।

কিন্তু শুধুই শাস্তি যথেষ্ট নয়। সমাজকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। বিকৃত যৌন মানসিকতা, মাদকাসক্তি, সহিংসতা এবং পর্নোগ্রাফির প্রভাব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব অপরাধ অনেক সময় পরিচিত মানুষদের মাধ্যমেই ঘটে। প্রতিবেশী, আত্মীয়, পরিবারের পরিচিত মানুষ, যাদের আমরা নিরাপদ মনে করি। রামিসার ক্ষেত্রেও অভিযোগ উঠেছে এমন একজনের বিরুদ্ধে, যার নিজেরও সন্তান আছে। একজন মা হয়েও অভিযুক্তের স্ত্রী পালাতে সাহায্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতা সমাজের নৈতিক ভাঙনের গভীরতাকেই সামনে আনে।

আজ বাংলাদেশে ছেলে বা মেয়ে, কোনো শিশুই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। পরিবার এবং স্কুল পর্যায়ে শিশুদের আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও আরও সতর্ক হতে হবে। শুধু অপরিচিত মানুষ নয়, অন্ধ বিশ্বাস থেকেও এখন সতর্ক থাকার সময় এসেছে।

আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্পর্কের পবিত্রতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাবোধ ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টের, কিন্তু চোখ বন্ধ করে থাকার সুযোগ আর নেই।

একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদ। যদি একটি রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে যায়।

একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা তার অর্থনীতি বা প্রযুক্তি দিয়ে নয়, তার শিশুদের নিরাপত্তা দিয়ে বিচার করা উচিত। যখন একটি শিশু নিজের ঘর, প্রতিবেশী কিংবা সমাজের ভেতরেও নিরাপদ থাকে না, তখন সেটি শুধু একটি দেশের সংকট নয়, মানবতার সংকট।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
[email protected]

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow