রাগীব হাসানের চূর্ণসম্ভাষণ-৩

লেখকের লড়াই    সবুজ মফস্বল জীবন হারিয়ে যায় না। চিরকালের মতোই সে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। মফস্বলকে সবাই সারাজীবন বহন করে চলে। তবে যে  এই অমূল্য স্থানকে ছেড়ে কোথাও যায় না, সে ঠিক হয়তো বুঝে উঠতে পারে না মফস্বল ছাড়ার বেদনা। অনেকে আছেন রাজধানীবাসী হওয়ার পরেও তার বেড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে নিবিড় একটা সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। খবর রাখেন নিজের বেড়ে ওঠা শহরের। আসা-যাওয়া হয়। তবে এমন অনেকে হয়তো আছেন, নিজের শহরে কদাচিৎ যান। খুঁজতে থাকেন পরিচিত মুখ ও বন্ধুদের। যদি কারোর নিজের শহরে তার নিজস্ব কোনো ডেরা না থাকে, তিনি সেই ডেরা না থাকার জন্য অনুতাপ করেন। কখনও নিজের শহরে এলে ওঠেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। নিজের শহরে একটা সময় তার কাছে নিজেকে ছিন্নমূল মনে হতে পারে। নিজের শহরটিই তার কাছে ধূসর লাগতে পারে। যে বন্ধুদের সঙ্গে এক সময় বেড়ে উঠেছিলেন, সেই বন্ধুদের সবাই যে শহরে আছে, এমনও নয়, কেউ কেউ চাকরি নিয়ে দূরে চলে গেছেন। কেউ বিদেশে চলে গেছেন। যারা আছেন, তারাও চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে সদাব্যস্ত। অল্প ক-দিনের জন্য যখন তিনি নিজের শহরে আসনে, খুঁজতে থাকেন পরিচিত মুখ, আত্মীয়র মুখ, বন্ধুর মুখ। শহরে এ গলি ও গলি দিয়ে চলতে গিয়

রাগীব হাসানের চূর্ণসম্ভাষণ-৩
লেখকের লড়াই    সবুজ মফস্বল জীবন হারিয়ে যায় না। চিরকালের মতোই সে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। মফস্বলকে সবাই সারাজীবন বহন করে চলে। তবে যে  এই অমূল্য স্থানকে ছেড়ে কোথাও যায় না, সে ঠিক হয়তো বুঝে উঠতে পারে না মফস্বল ছাড়ার বেদনা। অনেকে আছেন রাজধানীবাসী হওয়ার পরেও তার বেড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে নিবিড় একটা সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। খবর রাখেন নিজের বেড়ে ওঠা শহরের। আসা-যাওয়া হয়। তবে এমন অনেকে হয়তো আছেন, নিজের শহরে কদাচিৎ যান। খুঁজতে থাকেন পরিচিত মুখ ও বন্ধুদের। যদি কারোর নিজের শহরে তার নিজস্ব কোনো ডেরা না থাকে, তিনি সেই ডেরা না থাকার জন্য অনুতাপ করেন। কখনও নিজের শহরে এলে ওঠেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। নিজের শহরে একটা সময় তার কাছে নিজেকে ছিন্নমূল মনে হতে পারে। নিজের শহরটিই তার কাছে ধূসর লাগতে পারে। যে বন্ধুদের সঙ্গে এক সময় বেড়ে উঠেছিলেন, সেই বন্ধুদের সবাই যে শহরে আছে, এমনও নয়, কেউ কেউ চাকরি নিয়ে দূরে চলে গেছেন। কেউ বিদেশে চলে গেছেন। যারা আছেন, তারাও চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে সদাব্যস্ত। অল্প ক-দিনের জন্য যখন তিনি নিজের শহরে আসনে, খুঁজতে থাকেন পরিচিত মুখ, আত্মীয়র মুখ, বন্ধুর মুখ। শহরে এ গলি ও গলি দিয়ে চলতে গিয়ে পেয়ে যান কাঙ্ক্ষিত মুখ। সে তার স্মৃতিভাস্বর স্থানগুলো স্পর্শ করতে চান, ছুটে যান হয়তো সেখানে।      ২. একজন কবিতাকর্মীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কেমন দাঁড়ায়! সে কি ইচ্ছে করেই তার সবুজ মফস্বল ছেড়েছিল? এতে অনেকগুলো কারণই তো যুক্ত থাকতে পারে। তার উচ্চাশাও তো এতে জড়িত থাকতে পারে। সেই উচ্চাশাটা কি? কবিতাকর্মীর উচ্চাশাটা কি? তাকে কেন তার নিজের শহর ছাড়তে হবে। ছোট থেকে যৌবনে পদার্পণ করেছেন যেখানে, শহরের প্রতিটি ধুলোবালি তার গায়ে লেগে আছে। যেখানে নিঃশ্বাস না নিলে তার ভালো লাগতো না। বন্ধুদের সঙ্গে কতো আড্ডা। হুল্লড় করে বেড়িয়েছেন সারাদিন। শুধু সারাদিন নয় বহু রাত পর্যন্ত। নিজের শহরেই কবিতাকর্মীর কবি হওয়ার মতো ব্যাধি পেয়ে বসেছিল। বন্ধুদের সঙ্গে কবিতা অভিযানে ছুটে বেড়িয়েছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। কিন্তু কবি হওয়ার উচ্চাশার ফাঁদে পড়ে, সে প্রিয় শহরকে ত্যাগ করলো। স্রেফ এরকম একটি কারণও মনে হয় কারোর কারোর জীবনে থাকতে পারে। অন্য আরও কারণ থাকতে পারে।      ৩. এবার যদি ভাবা হয় যে, রাজধানী ও মফস্বলে সাহিত্য চর্চার ধরণের মধ্যে কি মৌলিক কোনও পার্থক্য আছে। কোনো ভিন্নতা আছে। আর যদি থাকেই কতটুকু? রাজধানী বা মফস্বল লেখকদের মধ্যে কি একটি সীমা রেখা পরিয়ে দেওয়া হয়, এটি হতে দেখা যায়? এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অমূলক? রাজধানীতে আমরা দেখি কতো কবি-সাহিত্যিক। তাদের অনেকে সবুজ মফস্বল ছেড়ে রাজধানীতে ডেরা গেড়েছেন। তাদের সবাই কি কবি হওয়ার উচ্চাশায় রাজধানীবাসী, মনে হয় এক কথায় উত্তর সম্ভব নয়। জীবিকার তাগিদটাও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।    অনেক কবি-লেখক আছেন, লেখালেখির সূচনালগ্নেই ভাবনার কেন্দ্রে জমিয়ে রেখেছিলেন যে, রাজধানীতে থাকাটা বেছে নেবেন। যেকোনোভাবেই হোক ডেরা গাড়বেন রাজধানীতে। যত কষ্ট হোক, অনুকূল পরিবেশ পারি দিতে হয়- তা মোকাবিলা করেই রাজধানীতেই থাকবেন। আমার ধারণা লেখক ও কবি হওয়ার উচ্চাশা আঁকড়ে ধরে থেকেই রাজধানীবাসী হওয়ার পথে হেঁটেছেন তারা। এই উচ্চাশাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান দিতেই হবে। সবুজ মফস্বল ছেড়ে এসেছেন বলে তারা কি ভুল করেছেন, এমন অনুতাপ কবি-লেখকের মনে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা তো শ্রদ্ধা ও সম্মানই জানাবো।  এটা ঠিক যে মফস্বল ও রাজধানীতে টিকে থাকার মধ্যে সহিষ্ণুতার পরিচয় দেওয়ার ব্যাপারটি রয়েছে। কোথাও আসলে জীবনধারণ সহজ নয়, সে মফস্বল হোক বা রাজধানী হোক। যদি কোথাও কোনো সঠিক বৃত্তি না থাকে, তাহলে কষ্ট ভোগ করতে হয়। মফস্বলে যদি ভালো কোনো চাকরি থাকে- সেটা যে কত উপভোগ্য সবাই তা জানেন। রাজধানীতেও তাই। কিন্তু কোথাও যদি জীবনধারণ করার মতো ন্যূনতম বৃত্তি না থাকে তাহলে জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। সাহিত্যচর্চা গতিশীল রাখা, চালিয়ে যাওয়া সহজ হয় না।          ৪. রাজধানী ঢাকা, এই ঢাকায় বর্তমানে আমরা যত কবি-লেখককে দেখি, তাদের সবার জন্ম ঢাকায় এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। যারা একটু নাম করেছেন, তাদের ঘরবাড়ির খবর পর্যন্ত পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। নানা সূত্রে পাঠক তা জানতে পারেন। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সবুজ মফস্বল থেকে রাজধানীতে এসে লেখক সত্তার ক্রমশ বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে। লেখক যখন ঢাকায় আসার আগে নিজের শহর ছেড়ে আসেন, ওই পটভূমিতে তার লেখালেখির একটা ইতিহাসও আছে। প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখকের জীবনীতে এটা আমরা পাই।  মফস্বল থেকে রাজধানীর পরিসর বড়। মফস্বলের অলিগলি থেকে রাজধানীর অলিগলি-রাস্তার সংখ্যা বেশি। এখানে যত প্রথিতযশা কবি-লেখকের সাক্ষাৎ মেলে, মফস্বল শহরে তা মেলে না। সেই সঙ্গে উত্তেজনার বিষয় সম্পর্কিত। সালভার দালি তার এবহরঁং দিনলিপি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ফ্রান্স থেকে আমেরিকার নিউইয়র্কে উত্তেজনা বেশি। এখানে এসে তিনি তার শিল্পকর্মে বাঁক খুঁজে পেয়েছেন। বিখ্যাত অনেক কবি-সাহিত্যিক সারা জীবন রাজধানীবাসী হওয়ার অদম্য ইচ্ছেটা মনের কোণে পুষে রেখেছেন। বুদ্ধদেব বসুও লেখালেখির জন্য রাজধানীকে শ্রেয় মনে করেছেন। এই ভাবনা বর্তমান সময়ের লেখকের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে বলেও মনে হয়।       ৫. নিজের শহর ছেড়ে রাজধানীর পথে হাঁটা, এর সঙ্গে মানসিক গঠনও জড়িত বলে মনে হয়। অনেকের বেলাতে তো এমনও হতে পারে- রাজধানীতে তার কোনো অত্মীয়-স্বজন নেই। দূরসম্পর্কের পর্যন্ত কেউ নেই। থাকতে পারে কোনো বন্ধু। ওই বন্ধুর জোড়েই তার রাজধানীবাসী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা আরও তেজদীপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এমনও হতে পারে ঢাকায় পড়াশোনার সূত্রে আর নিজ শহরে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হলো না। চাকরিও জুটে গেল এখানে। তখন তো আর দুশ্চিন্তার কিছু থাকলো না। একজন মানুষ লেখকবৃত্তিকে শ্রেষ্ঠ মনে করে সামনে হাঁটছেন। জীবনজীবিকার বাইরে তার লেখকবৃত্তি কতটা সজিব রয়েছে, এ ভাবনা তাকে ভাবতে হয়। আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে- মফস্বল ও রাজধানী যেখানেই লেখক থাকনে না কেন-নানান কারণে তার লেখকসত্তা শুকিয়ে যেতে পারে। স্তান-কাল কি লেখকসত্তা বাঁচিয়ে রাখায় বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখে? এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। রাজধানীতে থেকেও অনেকে লেখালেখির সত্তা হারিয়ে ফেলতে পারেন। সবুজ মফস্বলেও তা হতে পারে। তার মানে লেখক যেখানেই থাকুক, তাকে একটি লড়াইয়ের মধ্যেদিয়ে যেতেই হয়, কোনো উপায় নেই। লেখকবৃত্তি এ কারণে কঠিন, অন্য আর দশটা পেশা থেকে। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow