আমাদের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাত, অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার এক কঠিন অঙ্গন। ক্ষমতার পালাবদল মানেই যেন প্রশাসনিক রদবদল, ভাষার উত্তাপ, আর পারস্পরিক দোষারোপের নতুন অধ্যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে—সংযম, সৌজন্য এবং সহনশীলতার সুর।
প্রশ্ন উঠছে, সরকার যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তনের হাত বাড়ায়, তবে বিরোধী দল কী করবে? তারা কি একই পথে হাঁটবে, নাকি পুরোনো ধারার সংঘাতমুখী রাজনীতিতেই অনড় থাকবে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘এক-এগারো’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৭ সালের সেই অস্থির সময়ে বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মতোই কঠিন নির্যাতন ও চাপে পড়েছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রবাসজীবন, মামলা-হামলা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তার অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার পরও প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কটু ভাষা ব্যবহার না করা, সংযম বজায় রাখা এবং সহিষ্ণু রাজনীতির বার্তা দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা তিনি দেখিয়েছেন, তা তাকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সূচনা যদি নেতৃত্বের মানসিকতা থেকে হয়, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের চরিত্রকেও প্রভাবিত করতে পারে।
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি একটি ‘বিশ্বমানের রাষ্ট্র’ গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেছে। বিশ্বমানের রাষ্ট্র মানে শুধু সেতু, সড়ক বা উঁচু অট্টালিকা নয়; বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, আইনের সমতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব। ইতিহাস বলে—বক্তৃতা মানুষের কানে পৌঁছায়, কিন্তু আচরণ পৌঁছায় হৃদয়ে। একজন রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত জীবনযাপন, সময়ানুবর্তিতা, বিনয় ও দায়িত্ববোধ নাগরিকদের জন্য এক নীরব পাঠ্যপুস্তক হয়ে ওঠে।
শীর্ষ নেতৃত্ব যদি দেখায় যে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য, তবে প্রশাসনের নিচের স্তরেও সেই বার্তা পৌঁছায়।
সম্প্রতি বনানীতে প্রাণীদের জন্য একটি হাসপাতাল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা প্রতীকী হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মানবিকতা কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণিকুলের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে।
মানবিক রাষ্ট্র মানে—আইনের শাসন থাকবে, কিন্তু তা হবে সহানুভূতিশীল; উন্নয়ন হবে, কিন্তু তা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক; অর্থনীতি বাড়বে, কিন্তু তা হবে বৈষম্যহীন। তবে স্বীকার করতে হবে যে, গুণগত পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। এটি ধারাবাহিকতা, নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সমন্বিত ফল। দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রেই যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে, তবে পরিবর্তন টেকসই হবে। পরিবর্তনের শুরু যদি শীর্ষ থেকে হয়, তবে তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে—এ বিষয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
কয়েকদিন আগে সচিবালয়ে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, তা এক ধরনের ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে সংযম ও সচেতনতার ছাপ লক্ষণীয়। মনে হয়েছে, শীর্ষ নেতৃত্বের যে বিনয়, সৌজন্য ও নিয়মানুবর্তিতা জাতি প্রত্যক্ষ করছে, তার প্রভাব প্রশাসনের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ছে। প্রবাদ আছে—‘মর্নিং শোজ দ্য ডে।’ শুরুটা যদি শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে হয়, তবে ভবিষ্যৎ পথচলার ব্যাপারে আশাবাদ জন্মায়।
এই ধারাবাহিকতার শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় জিয়াউর রহমানের দিকে। স্বনির্ভর বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা ছিল আত্মমর্যাদাশীল ও কর্মমুখী রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। তার উত্তরাধিকার বহন করার দাবি নিয়ে তারেক রহমান যদি আধুনিক বাস্তবতায় সেই স্বপ্নকে রূপ দিতে পারেন, তবে তা শুধু একটি দলের সাফল্য হবে না—এটি হবে জাতীয় অগ্রযাত্রার নতুন অধ্যায়।
তবে এখানে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে পথ সহজ নয়। তবুও যদি নৈতিক নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একসঙ্গে এগোয়, তবে পরিবর্তন বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।
এবার আসি বিরোধী দলের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। গণতন্ত্রে বিরোধী দল কোনো শত্রু নয়; তারা হলো জবাবদিহিতার প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকারে সঙ্গে সৌজন্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখছে। ইফতারের দাওয়াত, পারস্পরিক অংশগ্রহণ—এসব দৃশ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। কিন্তু মাঠের ভাষা যদি ভিন্ন হয়, যদি জনসভায় উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য ও অযথা হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়, তবে সেই সৌজন্যের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিরোধী দলের প্রধান কাজ হলো গঠনমূলক সমালোচনা করা। সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা এবং জনগণের সমস্যাগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা—এগুলোই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি বা সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি সত্যিই ইতিবাচক পরিবর্তন কাম্য হয়, তবে সমালোচনা হবে তথ্যভিত্তিক, ভাষা হবে সংযত এবং উদ্দেশ্য হবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা।
রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি ব্যক্তিগত আক্রমণের ভিত্তিতে না হয়ে নীতির ভিত্তিতে হয়, তবে রাজনীতি সভ্যতার পথে এগোতে পারে। সরকার যদি সহনশীলতার বার্তা দেয়, বিরোধী দলও যদি সমান সংযম প্রদর্শন করে, তবে পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে। আর আস্থা ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ক্ষমতার প্রদর্শনী দেখেছে। এখন সময় এসেছে দায়িত্ববোধের প্রদর্শনী দেখার। কথার চেয়ে কাজের মূল্য বেশি—এই বার্তা যদি ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হয়, তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আসতে পারে। সরকার এক ধাপ এগোলে বিরোধী দলকেও এক ধাপ এগোতে হবে। কারণ গণতন্ত্র একপাক্ষিক যাত্রা নয়; এটি সমান্তরাল অগ্রযাত্রা।
গুণগত পরিবর্তন কোনো ব্যক্তির একক কৃতিত্ব নয়; এটি সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। প্রধানমন্ত্রী যদি নৈতিক নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, আর বিরোধী দল যদি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে, তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দায়িত্বশীল ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
সুতরাং অহেতুক বিতর্ক নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল সহমর্মিতা। যার যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সরকার পরিবর্তনের হাত বাড়িয়েছে—এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, বিরোধী দল সেই হাত কতটা আন্তরিকভাবে ধরতে পারে। দিনশেষে জনগণই সব কিছু মূল্যায়ন করবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল:
[email protected]