বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রান্নাকে শুধুমাত্র গৃহস্থালির কাজ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ রান্নাঘর শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। এটি একটি সম্মানজনক, সৃজনশীল এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশা। আর সেই পরিবর্তনের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে আছেন সাহসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশি নারী শেফ মেহেরুন আক্তার মেরি।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত এই পেস্ট্রি শেফ বর্তমানে ঢাকার খালিল কুলিনারি আর্টস সেন্টার (KCAC)-এ কুলিনারি কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । কিন্তু তার এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি তার দক্ষতা শাণিত করেছেন বিশ্বখ্যাত উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও তিনি বাংলাদেশকে গর্বিত করেছেন।
মালয়েশিয়া কুলিনারি ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৩-এ (ইন্ডিয়ান কারি ক্যাটাগরি) তিনি অর্জন করেছেন সিলভার মেডেল। সাউথ এশিয়া ইন্টারন্যাশনাল কুলিনারি কম্পিটিশন কলকাতা ২০২৩-এ জিতেছেন বেস্ট কনফেকশনারি অ্যাওয়ার্ড। ২০২৪ সালে পেয়েছেন বেস্ট প্রফেশনাল পেস্ট্রি শেফ অ্যাওয়ার্ড এবং ভারতবর্ষে আন্তর্জাতিক বিচারক হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এ ছাড়া তিনি তুরস্কের ৭ম ইন্টারন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোআফিয়ন ট্যুরিজম এন্ড টেস্টি ফেস্টিভ্যালে আফিয়নকারাহিসার, বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক শক্ত বার্তা।
নারীদের জন্য কুলিনারি পেশা কেমন? এ প্রশ্নের জবাবে মেহেরুন আক্তার মেরি বলেন, 'বাংলাদেশে অনেক মেয়ে রান্না ভালোবাসেন, কিন্তু পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস পান না। সামাজিক বাঁধা, পারিবারিক চাপ, নিরাপত্তা, রাতের শিফট— এসব বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু আজকের বিশ্বে কুলিনারি আর্ট একটি শক্তিশালী, সম্মানজনক এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।'
বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক মানের নারী শেফ এই পেশায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জানিয়ে মেরি বলেন, "ডমিনিক ক্রেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নারী শেফ যিনি তিনটি মিশেলিন তারকা অর্জন করেন। পুরুষ-প্রধান এই ইন্ডাস্ট্রিতে অসংখ্য বাঁধা পেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রম লিঙ্গভেদ মানে না। বিশ্বখ্যাত দ্য ওয়ার্ল্ড'স বেস্ট ফিমেল শেফ পুরস্কারপ্রাপ্ত আনা রোশ (স্লোভেনিয়া) নিজ দেশের ছোট্ট শহর থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছেন। তার গল্প প্রমাণ করে ছোট দেশ বা সীমিত সুযোগ কখনও সাফল্যের বাধা নয়। ভারতের গারিমা অরোরা থাইল্যান্ডে নিজের রেস্টুরেন্ট 'Gaa' দিয়ে মিশেলিন স্টার অর্জন করেন এবং এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নারী শেফ হিসেবে স্বীকৃতি পান। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে তার সাফল্য আমাদের জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা।"
শেফ মেহেরুন আক্তার বিশ্বাস করেন, 'রান্না শুধু প্রতিদিনের প্রয়োজন নয়, এটি একটি শিল্প। আর শিল্পের কোনো লিঙ্গ নেই।' বাংলাদেশের মেয়েরা আজ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট— সব পেশাতেই এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কুলিনারি আর্টসে রয়েছে আন্তর্জাতিক সুযোগ, সৃজনশীল স্বাধীনতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা, সম্মান ও আর্থিক স্বনির্ভরতা। তবে এই পেশায়ও রয়েছে চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চ্যালেঞ্জই একজন মানুষকে শক্তিশালী করে। সামাজিক বাঁধা, শারীরিক পরিশ্রম সবকিছু পেরিয়েই আজ অনেক নারী বিশ্বমানের শেফ হয়েছেন।
শেফ মেহেরুন আক্তার চান, তিনি শুধু একজন সফল শেফ নন; বাংলাদেশি মেয়েদের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকতে। তিনি চান গ্রামের মেয়েরা, শহরের মেয়েরা— যারা রান্নাকে ভালোবাসে, তারা যেন স্বপ্ন দেখতে শেখে।
কুলিনারি পেশায় আগ্রহী নিয়ে শেফ মেহেরুন আক্তার মেরি বলেন, 'বাংলাদেশে এখন কুলিনারি ইনস্টিটিউট, হোটেল ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা,আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেয়েদের উচিত নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন করা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। বিশ্বমঞ্চ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের নারীদের জন্য। সময় এসেছে রান্নাঘরকে শুধু চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাওয়ার। আজ সময় এসেছে বাংলাদেশি মেয়েদের বলার 'আমরাও পারি বিশ্বমানের শেফ হতে'। স্বপ্ন দেখলে, পরিশ্রম করলে, বাঁধা পেরিয়ে এগোলে—বাংলাদেশের মেয়েরাও বিশ্ব জয়ের ক্ষমতা রাখে।