রামিসা হত্যা: একটি অসুস্থ সমাজের বিবেকহীন আয়না
আট বছর বয়সী কন্যাশিশু রামিসার ক্ষতবিক্ষত, খণ্ডিত মরদেহ যখন প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নর্দমায় ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন আসলে কার মৃত্যু ঘটছিল? রামিসার? নাকি আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের অবশিষ্ট মনুষ্যত্বের? শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মুখে এক মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক এই তৎপরতা সান্ত্বনাকাতর শোনালেও, তা আসলে আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারে না। আট বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, এবং তারপর নির্মমভাবে তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে গুম করার চেষ্টা—এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা নয়; এটি একটি পচনশীল সমাজের গভীরতম নৈতিক অন্ধকূপের জবানবন্দি। রামিসা একা মারা যায়নি—তার সঙ্গে অপমৃত্যু ঘটেছে কোটি অভিভাবকের নিরাপত্তাবোধের, মরেছে শিশুদের নির্মল হাসির ওপর আমাদের সামষ্টিক বিশ্বাসের। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আত্মহননের জন্য দায়ী আমরা সবাই। আমরা যারা নীরব, যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে নীরবে মেনে নিই, যারা দলীয় ও গোষ্ঠীগত পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীকে আড়াল করতে ব্যস্ত থাকি, তারা প্রত্যেকেই এই রক
আট বছর বয়সী কন্যাশিশু রামিসার ক্ষতবিক্ষত, খণ্ডিত মরদেহ যখন প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নর্দমায় ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন আসলে কার মৃত্যু ঘটছিল? রামিসার? নাকি আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের অবশিষ্ট মনুষ্যত্বের?
শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মুখে এক মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক এই তৎপরতা সান্ত্বনাকাতর শোনালেও, তা আসলে আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারে না। আট বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, এবং তারপর নির্মমভাবে তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে গুম করার চেষ্টা—এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা নয়; এটি একটি পচনশীল সমাজের গভীরতম নৈতিক অন্ধকূপের জবানবন্দি। রামিসা একা মারা যায়নি—তার সঙ্গে অপমৃত্যু ঘটেছে কোটি অভিভাবকের নিরাপত্তাবোধের, মরেছে শিশুদের নির্মল হাসির ওপর আমাদের সামষ্টিক বিশ্বাসের। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আত্মহননের জন্য দায়ী আমরা সবাই। আমরা যারা নীরব, যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে নীরবে মেনে নিই, যারা দলীয় ও গোষ্ঠীগত পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীকে আড়াল করতে ব্যস্ত থাকি, তারা প্রত্যেকেই এই রক্তের ভাগীদার।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত করে দেয়। তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশে ১১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬টি শিশু। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে ধর্ষণের পর ১৪টি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, আর ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে খুন করা হয়েছে আরও ৩টি শিশুকে। লোকলজ্জা আর মানসিক ট্রমা সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ২ জন অবোধ শিশু।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ২৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর গাণিতিক অর্থ দাঁড়ায়—প্রতিদিন অন্তত একটি শিশু ধর্ষিত হচ্ছে এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি শিশু ধর্ষণের পর লাশ হয়ে ফিরছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক নিস্তব্ধতার এক একটি কালজয়ী ইশতেহার। আমরা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লাইক দিই, মোমবাতি জ্বালাই, রাজপথে র্যালি করি, আর তারপর অবধারিতভাবে পরবর্তী আরেকটি নির্মমতার জন্য অপেক্ষা করি। রামিসার ঘটনা কোনো ভিন্ন আয়োজন নয়, এটি আমাদের সামাজিক অক্ষমতা ও অভ্যস্ততার এক চক্রাকার পুনরাবৃত্তি মাত্র।
মনস্তাত্ত্বিক ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো—অপরাধীরা ভুক্তভোগী শিশুদের অতি পরিচিত, প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয়। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় লিপ্ত ছিল তার আপন আত্মীয়। আর রামিসাকে পাশবিকভাবে হত্যা করেছে তাদের ঘরের পাশের প্রতিবেশী সোহেল রানা।
যাকে বিশ্বাস করতে শেখানো হয়, যার কাছে সন্তানকে নিরাপদ রাখার নিশ্চিন্ত আশ্বাস খোঁজে মা-বাবা, সেই ঘনিষ্ঠ মানুষটিই যখন রাতের অন্ধকারে আদিম দানব হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক সম্পর্কের বুনন বা ‘সোশ্যাল ফেব্রিক’ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না; বরং একে অপরের সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, অপরাধীরা মনে করে ভুক্তভোগীকে জীবিত রাখলে প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ঝুঁকি থাকে, তাই তারা অবলীলায় হত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু রামিসার ক্ষেত্রে এই তত্ত্বও যথেষ্ট নয়। খুনি সোহেল রানা শুধু প্রমাণ লোপাট করতে দেহ টুকরো করেনি, সে তার নিজের স্ত্রীকে পর্যন্ত এই নারকীয় অপরাধের সহযোগী বানিয়েছে এবং ঘটনা গোপন রাখতে বাধ্য বা রাজি করিয়েছে। এখানে প্রশ্ন জাগে—সেই স্ত্রীর মনস্তত্ত্বে কী চলছিল? কেন সে একজন ধর্ষক ও খুনিকে ‘স্বামী’ পরিচয়ের দোহাই দিয়ে বাঁচাতে চাইল? আমাদের সমাজব্যবস্থা কি তবে এমন এক বিকৃতির স্তরে পৌঁছে গেছে যেখানে অপরাধী স্বামীকে রক্ষা করা স্ত্রীর অবশ্য পালনীয় ‘পুণ্যের কাজ’ বলে গণ্য হয়? যদি সামাজিকভাবে অপরাধীকে বাঁচানোর এই পারিবারিক ও এলাকাভিত্তিক ষড়যন্ত্র চলতে থাকে, তবে কাগজে-কলমে মৃত্যুদণ্ডের শত আইন পাস করেও কোনো সুফল মিলবে না।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে দেশে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট, কিন্তু সংকট এর প্রয়োগে। দুর্বল তদন্ত, প্রক্রিয়াগত জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে দুর্নীতির কারণে সিংহভাগ মামলার আসামি খালাস পেয়ে যায়। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি-এপ্রিল) সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৮টি। চার মাসে প্রায় ছয় হাজার মামলা! কিন্তু এর মধ্যে কয়টি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে? কতজন আসামি দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি পেয়েছে?
আমাদের সমাজে যৌন হয়রানির অভিযোগ করা মানে কাচ-ছড়ানো রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটার মতো। পা কাটলে উল্টো ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করা হয়—‘কে বলেছিল তোমায় ওই রাস্তায় হাঁটতে?’ গণপরিবহনে কোনো নারী হেনস্তার প্রতিবাদ করলে পাল্টা আক্রমণ আসে। পরিবারে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিশু বা কিশোরী অসম্মানের অভিযোগ তুললে সমাজ আগে তার পোশাক, তার চরিত্র বা তার আচরণকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। স্কুল থেকে শ্বশুরবাড়ি, থানা থেকে আদালত—সর্বত্রই ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার এক নোংরা কোরাস চলছে। ফলশ্রুতিতে, ভুক্তভোগীরা মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য হয়, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
মানুষের ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, সুস্থ বিনোদন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলো আজ সম্পূর্ণ অকার্যকর। আমরা শিশুদের ‘বড়দের কথা অন্ধভাবে শুনতে’ শেখাই, কিন্তু ‘অন্যায় দেখলে কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়’ তা শেখাই না। নৈতিকতার নামে বিকৃত ধর্মচর্চা ও অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটছে। যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, স্কুল ও কোচিং সেন্টারগুলো থেকেও আজ নিয়মিত ধর্ষণের খবর আসছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে অনলাইন কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত সহজলভ্যতা। পর্নোগ্রাফির অন্ধকার জগত এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে শিশু-কিশোরদের হাতের মুঠোয়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যৌনশিক্ষা বা সুস্থ পারিবারিক আলোচনা না থাকায়, ইন্টারনেটের বিকৃত রূপটিই অনেকে সত্য বলে ধরে নিচ্ছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বেছে নিচ্ছে সমাজের সবচেয়ে নিরীহ ও দুর্বল অংশ—শিশুদের। অপরাধীরা জানে এটি একটি ‘সেফ ক্রাইম’, কারণ শিশুরা প্রতিরোধ করতে পারে না, এবং তাদের বিচার চাওয়ার পথটি কণ্টকাকীর্ণ।
মনে রাখতে হবে যে, শিশু নিরাপদ না হলে সমাজ নিরাপদ হতে পারে না। তবে শুধু মুখের কথায় এর সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের একক অপরাধী দমনের সনাতন নীতি থেকে বেরিয়ে এসে পুরো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে:
ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মামলাগুলো ‘স্পিড ট্রাইব্যুনালে’ এনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে বিচার ও রায় কার্যকর করতে হবে। আইনের যুগোপযোগী সংশোধনও করেত হবে। মরদেহ টুকরো টুকরো করার মতো নৃশংস ও বিকৃত পাশবিকতার জন্য আইনে আলাদা ধারা যুক্ত করে কঠোরতম শাস্তির বিধান করতে হবে।
অপরাধীকে আশ্রয় দানকারী বা তথ্য গোপনকারী স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও সমপরিমাণ অপরাধে অভিযুক্ত করতে হবে। রামিসার খুনি সোহেল রানার স্ত্রীকে কেন এখনো গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হলো না, সেই জবাব প্রশাসনকে দিতে হবে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ এবং আত্মরক্ষার কৌশল সংবলিত যৌন ও নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ডিজিটাল নজরদারি এবং প্রতিটি পাড়ায় স্থানীয় প্রতিনিধি, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে ‘শিশু সুরক্ষা কমিটি’ গঠন করতে হবে।
আমাদের নৈতিক পতনের এই ক্রান্তিলগ্নে আর নিষ্ফল কান্নাকাটি বা সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকতা দেখিয়ে লাভ নেই। রামিসার দেহ যেভাবে টুকরো টুকরো হয়েছে, আমাদের জাতীয় বিবেক ও গৌরবও আজ সেভাবে খণ্ডিত। প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্রেফ ‘দ্রুত তদন্তের’ আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তির বাস্তবায়ন দেখাতে হবে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বললেও কেন এখনো সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কেন খুনি ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যাচ্ছে না—সেই জবাব জনগণকে দিতে হবে।
রামিসার রক্ত আমাদের লজ্জার উপাখ্যান। যতদিন না দেশের প্রতিটি শিশু নিরাপদে হাসতে পারছে, ততদিন এই সমাজের প্রতিটি নাগরিকই কাঠগড়ার আসামি। আইন বদলানোর পাশাপাশি আমাদের নিজেদের মনস্তত্ত্ব ও সমাজকে বদলাতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ যদি আমরা প্রতিবাদের আগুনে এই জরাজীর্ণ সমাজকে পুড়িয়ে খাঁটি না করি, তবে আগামীকালের রামিসা হয়তো আপনার বা আমার নিজের সন্তানও হতে পারে। জেগে ওঠার সময় এখনই, নয়তো ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?