রাস্তার ইট তুলে নিয়ে বিক্রি করে দিল প্রতারক চক্র
ইটের রাস্তা পাকা হবে, পুরোনো ইট তুলে নেওয়া হবে। রাস্তার দুই মাথায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এক পাশে জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি এবং ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী, অন্যপ্রান্তে উপস্থিত হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য। জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট তাপসের পক্ষ থেকে ২০ কেজি জিলাপি বিতরণ করা হয়। সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে উন্নয়নকাজ ‘শুরু’ করা হয়। পরদিন থেকেই একে একে সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তার সব ইট তুলে ফেলা হয়। এরপর ইটের রাস্তা হয়ে যায় মাটির রাস্তা। জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে গত মে মাসে এ ঘটনা ঘটে। টানা বৃষ্টিতে চরম ভোগান্তির শিকার ভ্যানগাড়ি চালক আনিসুর বলেন, ‘তাপস উকিল জিলাপি খাওয়াইছে নিজে উপস্থিত থাইকা। অনেক লোকজন ইট তুলে নিল, এরপর থেকে ইটের রাস্তা মাটির রাস্তা হয়ে গেল আর আমাদের দুর্দশা বাইড়া গ্যাছে। এমপি এবং উকিল থাইকা উদ্বোধন করে গেছে আমরা সাধারণ মানুষ ভাবছি তাড়াতাড়ি পাকা হয়ে যাবে। এখন তো খুব খারাপ অবস্থা।’ ইট তুলে নিয়ে বিক্রি করে দেযয়ার পর ঠিকাদার ও তার লোকজনকেও এলাকায় দেখা যায়নি। পরে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন, পাকা রাস্তা নির্মাণের নামে আয়োজনটি ছি
ইটের রাস্তা পাকা হবে, পুরোনো ইট তুলে নেওয়া হবে। রাস্তার দুই মাথায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এক পাশে জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি এবং ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী, অন্যপ্রান্তে উপস্থিত হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য।
জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট তাপসের পক্ষ থেকে ২০ কেজি জিলাপি বিতরণ করা হয়। সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে উন্নয়নকাজ ‘শুরু’ করা হয়। পরদিন থেকেই একে একে সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তার সব ইট তুলে ফেলা হয়। এরপর ইটের রাস্তা হয়ে যায় মাটির রাস্তা।
জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে গত মে মাসে এ ঘটনা ঘটে।
টানা বৃষ্টিতে চরম ভোগান্তির শিকার ভ্যানগাড়ি চালক আনিসুর বলেন, ‘তাপস উকিল জিলাপি খাওয়াইছে নিজে উপস্থিত থাইকা। অনেক লোকজন ইট তুলে নিল, এরপর থেকে ইটের রাস্তা মাটির রাস্তা হয়ে গেল আর আমাদের দুর্দশা বাইড়া গ্যাছে। এমপি এবং উকিল থাইকা উদ্বোধন করে গেছে আমরা সাধারণ মানুষ ভাবছি তাড়াতাড়ি পাকা হয়ে যাবে। এখন তো খুব খারাপ অবস্থা।’
ইট তুলে নিয়ে বিক্রি করে দেযয়ার পর ঠিকাদার ও তার লোকজনকেও এলাকায় দেখা যায়নি। পরে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন, পাকা রাস্তা নির্মাণের নামে আয়োজনটি ছিল সাজানো; উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো রাস্তার ইট নিয়ে যাওয়া।
পরের মাসে অর্থাৎ ১৬ জুন একই কায়দায় আরেকটি সড়কের ইট চুরির চেষ্টার সময় ওই চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সংসদ সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সড়কের কাজের উদ্বোধন করায় ইট খুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ হয়নি। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সড়কের উন্নয়নকাজের কোনো দরপত্র হয়নি।
জানা গেছে, গ্রেপ্তার চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান (৫০) উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আমেছ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন।
ওই ঘটনার কয়েক দিন আগে এলাকায় ফিরে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি একজন প্রতারক বলে জানিয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি তিনি জামিনে কারামুক্ত হয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।
সরেজমিনে কথা হয় স্থানীয় হোসেন আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এই রাস্তার ইট তুলে আশপাশেই অনেকের কাছে বিক্রি করেছে। আর বাকি ইট নিয়ে গেছে। রাস্তা পাকা হলে ইট তুলে খোয়া বানাবে, সব বিক্রি কিংবা নিয়ে যাবে কেন? এটা বলতেই আমার উপর ক্ষেপে যায় হবদেশের ওই লোক।
জামালপুর সদর থানা সূত্রে জানা গেছে, গজারিআটা গ্রামের ঘটনায় মামলা হয়নি। তবে একই কায়দায় চাঁদপুর এলাকায় ইট ওঠানোর সময় চক্রটির ১১ জনকে আটক করেন এলাকাবাসী। তাদের সবার বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তারা সবাই এখন জামিনে আছেন।
সড়ক পাকা করার কাজের ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে’ ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন)। শুরুর দিকে কথিত ঠিকাদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেননি দাবি করে বলেন, রাস্তার উন্নয়নকাজের বিষয়টি এলাকাবাসী তাকে প্রথমে জানান। তারা সেখানে থাকতে বলায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
ওই রাস্তার ময়নার মোড় নামক স্থানে সংসদ সদস্য উপস্থিত হয়, অন্যপ্রান্তে আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি তাপস উপস্থিত ছিলেন।
তাপস জানান, স্থানীয় এক সাংবাদিক তাকে রাস্তার কাজের বিষয়টি জানান। তিনি জিলাপি বিতরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাস্তার কাজের জন্য জিলাপি বিতরণ করা হয়নি, ওটা একটা ব্রিজের কাজের জন্য করা হয়েছে।
কথার একপর্যায়ে আইনজীবী তাপস বলেন, এ ঘটনা খুবই দুঃখজনক। রাস্তার সমস্যার সমাধানে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কটি পাকাকরণের জন্য গত ১২ মে ময়নার মোড় এলাকায় উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় ঠিকাদার হিসেবে কাজটি করবেন আবদুল মান্নান। পরদিন থেকেই মান্নানের লোকজন সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিভিন্ন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। কিন্তু সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। পরে তারা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
এ ঘটনার পর একই কৌশলে উপজেলার চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় চক্রটি। আগের মতো স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে সড়কের উন্নয়নকাজের উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। এরপর সেখানেও পুরোনো ইট খুলে নেওয়ার কাজ শুরু করেন মান্নান ও তার লোকজন। এর মধ্যে গজারিআটা গ্রামের খবর চাঁদপুর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী মান্নানের কাছে প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু তিনি কোনো বৈধ নথি দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মান্নান ও তার লোকজনকে ধরে পুলিশে দেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলী আকরাম হোসেন তালুকদার বলেন, ওই রাস্তায় কোনো উন্নয়নকাজের দরপত্র হয়নি। তিনি বলেন, ইট না থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। তারা দ্রুত সময়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
What's Your Reaction?