রুহুল আমীন রাজুর গুচ্ছ কবিতা 

পা      পৃথিবীর কোনো নারীর পায়ে প্রথম চুমু আঁকা মানুষটি ‘জন পপ পোল’  ‘মাদার তেরেসা’র পায়ে এঁকে ছিলেন সেই চুমু । আর দ্বিতীয় মানুষটি বোধহয় আমি এঁকে ছিলাম, সুলক্ষ্মীর পায়ে। কখনো চঞ্চল কখনো শান্ত সে পা স্পর্শ করে মেঠো পথ শিশির ভেজা কোমল ঘাস কুয়াশায় একাকী লুকোচুরি খেলা উদাস দুপুরে কাশ বনে ছুটে চলা নীল আকাশে লাল ঘুড়ি উড়ানো চাঁদনী রাতের আলোকিত রুপোর মাটি অসহায় নিরন্ন মানুষের আঙিনা । তার পা স্পর্শ করার স্বপ্নে বিভোর আকাশ হিমালয় এমনকি শপ্তর্ষি পর্যন্ত কথা ছিলো, সেই পায়ের নুপূরের ঝংকার শোনাবে একমাত্র আমাকে’ই । যার পা - গহিন তথ্যের মানচিত্র । জানি না, কোন ভুলে সেই পা আজ অদৃশ্য পথে যাত্রা করার মহড়া দিচ্ছে.... আমি সূর্য-সপ্তর্ষিকে স্বাক্ষী রেখে বলছি- এই মহড়া একদিন ব্যর্থ হবে । হবে’ই । কেন না, সেই চুমুটা ছিলো’ অঞ্জলি’ যা সুলক্ষীর পা’ই এই অধিকার অর্জন করেছিলো । হতে পারি আমি অভিযুক্ত অভিশপ্ত ঘৃণীত আচ্ছা, ভুলতো মানুষই করে শয়তান কখনো ভুল করে না । আজ আবারো প্রমান হলো- আমি মানুষ মানুষের কাছেই তো ছুটে আসে মানুষ ভুল থেকেই যে হয় নির্ভুল ভুল থেকেই যে ফুটে ফুল ।     পরাধীনতাই কি স্বাধীনতা?  রাস্

রুহুল আমীন রাজুর গুচ্ছ কবিতা 

পা 
 

 

পৃথিবীর কোনো নারীর পায়ে
প্রথম চুমু আঁকা মানুষটি ‘জন পপ পোল’ 
‘মাদার তেরেসা’র পায়ে
এঁকে ছিলেন সেই চুমু ।


আর দ্বিতীয় মানুষটি বোধহয় আমি
এঁকে ছিলাম, সুলক্ষ্মীর পায়ে।
কখনো চঞ্চল কখনো শান্ত
সে পা স্পর্শ করে মেঠো পথ
শিশির ভেজা কোমল ঘাস
কুয়াশায় একাকী লুকোচুরি খেলা
উদাস দুপুরে কাশ বনে ছুটে চলা
নীল আকাশে লাল ঘুড়ি উড়ানো
চাঁদনী রাতের আলোকিত রুপোর মাটি
অসহায় নিরন্ন মানুষের আঙিনা ।


তার পা স্পর্শ করার স্বপ্নে বিভোর
আকাশ হিমালয় এমনকি শপ্তর্ষি পর্যন্ত
কথা ছিলো,
সেই পায়ের নুপূরের ঝংকার
শোনাবে একমাত্র আমাকে’ই ।
যার পা - গহিন তথ্যের মানচিত্র ।


জানি না, কোন ভুলে সেই পা আজ
অদৃশ্য পথে যাত্রা করার মহড়া দিচ্ছে....
আমি সূর্য-সপ্তর্ষিকে স্বাক্ষী রেখে বলছি-
এই মহড়া একদিন ব্যর্থ হবে । হবে’ই ।
কেন না, সেই চুমুটা ছিলো’ অঞ্জলি’
যা সুলক্ষীর পা’ই
এই অধিকার অর্জন করেছিলো ।


হতে পারি আমি অভিযুক্ত অভিশপ্ত ঘৃণীত
আচ্ছা, ভুলতো মানুষই করে
শয়তান কখনো ভুল করে না ।
আজ আবারো প্রমান হলো-
আমি মানুষ
মানুষের কাছেই তো ছুটে আসে মানুষ
ভুল থেকেই যে হয় নির্ভুল
ভুল থেকেই যে ফুটে ফুল ।

 

 


পরাধীনতাই কি স্বাধীনতা? 

রাস্তার পাশে এখনও মানুষের সাথে কুকুর ঘুমায়,
নাকি কুকুরের সাথে মানুষ ঘুমায়-আমি বুঝি না।
ডাষ্টবিনের উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে,
মানুষ ও কুকুর।


এক সাগর রক্ত আর ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ,
স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বয়সেও সভা সেমিনার ছাড়া স্বাধীনতার অর্থ আমি বুঝিনি।
স্মৃতিসৌধে সারাদিন শিয়াল-কুকুরের বিচরণ,
আর বছরে তিনদিন ফুলের মেলা।


সত্য বললে পুলিশের লাঠিপেটা, মিথ্যা বললে বুদ্ধিজিবী।
যাদের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভুক্ত কর্মচারি-কর্মকর্তার আহার জুটে,
সেই কর্মচরিকেই স্যার সম্ভোধন করতে হয়!
জনসাধারনের ভোটে নির্বাচিত সেবক বনে যান শাসকে।
জলজ্যান্ত মুক্তিযোদ্ধাকে এক মুঠো ভাতের জন্য
ভিক্ষার থালা নিয়ে ঘুরতে হয় দ্বারে দ্বারে,
অথচ সেই লাশ মুক্তিযোদ্ধাকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সন্মান !
দেহে নখের আঁচড়ে একফোটা রক্ত ঝরলে মামলা করা যায়,
আর হৃদয়ে রক্তের বন্যা বইলেও মামলা করার অধিকার নেই।
তবে কি পরাধীনতাই স্বাধীনতা ?
না, এ হতে পারে না ...
এর উত্তরণ একদিন হবে। হবে’ই।

 

 


চোখের জলে নৈশভোজ 


একদিন এক গৃহে তুমি আর আমি।
আমাকে আমার একটি প্রিয় খাবার
তুমি নিজ হাতে খাওয়ার আয়োজন করলে।
দুধ ভাত দেশী শবরি কলা সাথে আম।
আমি তোমার কোলে মাথা রেখে
খাচ্ছিলাম আমার প্রিয় খাবার।


তুমি পরম মমতায় নলা তুলে দিচ্ছিলে...
তুমি বললে, কেমন লাগছে –...?
আমি কোনো উত্তর দেইনি।
শুধু অপলক দৃষ্টিতে দেখছিলাম তোমাকে।
হয়তো বুঝতে পেরেছিলে আমার আবেগ,
ফের আর জানতে চাওনি।
হ্যাঁ, লবণ বড্ড কম ছিলো
আমি সেই কথা বলতে পারিনি।


হঠাৎ লবণের ঘাটতি পূরণ হলো ,
আবিস্কার হলো লবণ রহস্যের ।
তোমার চোখে ছিলো জল ,
সেই জল পড়েছিলো আমার থালায় ।
চোখের জল যে লবণাক্ত সেদিন বুঝলাম ।
আরো বুঝলাম , নারীও এক সাগর –
লবণাক্ত জলের শ্রোতধারা ।


খুব ইচ্ছে হলো এই সাগরে সাঁতার কাটতে ...
তুমি বারণ করলে , যদি ভেসে যাই হারিয়ে যাই ...
আমি থেমে গেলাম ।
আবার তোমার আহ্বান- – দিলে সাঁতারের অনুমতি
আমি সেই নোনা সাগরে সাঁতার কাটলাম...
ভেসে যাইনি হারিয়েও যাইনি ।


কিন্তু , ভাসলাম পরে- তোমার হৃদয়ের মরুভূমিতে,
হারিয়ে গেলাম খড়ের মতো ...
এ কেমন নিষ্ঠুরতা করলে সুলক্ষী ... ?

 

 


সুলক্ষ্মী সেতু 

সেদিন আকাশ ছিলো মেঘলা, ছিলো ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি
অচেনা এক গ্রামের চেনা নদীর তীরে আমার সাথে সুলক্ষ্মী
ভেজা ঘাসে বসে স্রোতধারা জল, দূর আকাশে শালিকের ডানা ঝাঁপটানো..
আমরা ভিজে একাকার.. কথায় কথায় বেলা গড়িয়ে যায়
তবুও যেনো আরো কি কথা বাকী রয়ে যায়...


হঠাৎ সুলক্ষ্মীর চোখ পড়লো পাশের ছোট্ট একটি ডোবার দিকে
রাঙ্গা পায়ের জল ভাঙ্গার শব্দে কিশোরীর দূরন্তপনা.....
আর সাথে এক বৃদ্বার আর্তনাদ !


সুলক্ষ্মী বলে উঠলো- আহা এখানে যদি একটি সেতু হতো....
আমি কিছুটা অবাক সুরে বললাম, তিনটা বাড়ীর জন্যে সেতু...?
আমার সাথে সুর মিলিয়ে সেও বললো- হ্যাঁ, তাইতো.....
ফের ও চিৎকার করে বলে উঠলো- কেন হতে পারে না ?
ওরা ওতো মানুষ...!


ওর এই দীর্ঘনিঃশ্বস নিয়েই যার যার নীড়ে ফিরে আসি।
পরে এইতো সেদিন সেই গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম একা
আমি অবাক ! কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না ...
ওখানে সত্যি সত্যিই ছোট একটি সেতু তৈরী হয়েছে,
আমি আনন্দাশ্রুতে মনে মনে সেতুটির নাম দিলাম- ‘সুলক্ষ্মী সেতু’ ।

 

 


ঐশ্বরিক 


সুলক্ষ্মী ও শুভ’র সম্পর্ক ঈশ্বর প্রদত্ত- ‘ঐশ্বরিক’
কথাটির ঘোষণাকারী স্বয়ং সুলক্ষ্মী ...
এরপরও কেন প্রশ্ন... ? কেন ভয়াবহ ঘৃণা...???
যে ঘৃণার শ্রোতে খড়ের মতো ভাসছে শুভ...


তার ভেতরে এখন কেবলি -
জাহাজ ভাঙার শব্দ...
পাথর ভাঙার শব্দ...
পাহাড় ভাঙার শব্দ...
হৃদয় ভাঙার শব্দ... 
সুনামীর গর্জন...


অথচ এই সুলক্ষ্মী একদিন বৃষ্টির শব্দ তৈরি করেছিলো
এসেছিলো আলোক বার্তিকা বাহক হয়ে ...
... অপরাধ ক্ষমা করে সুলক্ষ্মী  বুকে টেনে নিলো
অঝরে কাঁদলো... কাঁদালো...


সেদিন তাদের কান্নায় প্রকৃতিও তো সামিল ছিলো ।
বৃষ্টি ভেজা রাতে সুলক্ষ্মী এক ইমারতের কার্নিশে
দাঁড়িয়ে ছিলো শুভ’র অপেক্ষায়...
দূর থেকে তা অবলোকন করছিলো- শুভ ।


সুলক্ষ্মীর গায়ের রং পরিধান আর ইমারতের টাইলস্’র রঙ
ঐদিন অদ্ভ’তভাবে একাকার হয়ে উঠেছিলো..!!
আচ্ছা, দ্বিতীয়বার কি আর সেই... পুনরাবৃত্তি ঘটেছিলো ??
ক্ষমা মানে- মহত্বের শ্রেষ্ঠ মানবিকতা
এ থেকে হঠাৎ ফিরে যাওয়ার রহস্য কি...???


ফিরে আসি সুলক্ষ্মীর কথায়- ’ঐশ্বরিক’
এই ঐশ্বরিকতায় কি এক মায়াময়, প্রেমময়, বন্ধুত্বের
সূচনা রচিত হলো...

 


সুলক্ষ্মীকে মনে হয়- পৃথিবীর সব সম্পর্কের অদৃশ্য সেতু ।
শুভ’র সাহিত্যাকাশে নতুন এক গ্রহ- ’সুলক্ষ্মী’। 
আমি চিৎকার করে বলবো ... যা হয়েছে সবই ‘ঐশ্বরিক’
মানুষের জীবনতো পার্থিব ও ঐশ্বরিক,
এ দু’য়ের মাঝেই ...
সব সব ছিন্ন করে হঠাৎ কোথায় হারালো সুলক্ষ্মী
কেন হারালো?
উত্তরের অপেক্ষায়...


কবি পরিচিতি : রুহুল আমীন রাজু, জন্ম- ১১ জানুয়ারি /১৯৭১, পিতার নাম - মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ আবুল হাসেম, মাতার নাম - মরহুমা রেহেনা হাসেম। গ্রাম + ডাকঘর - কটিয়াদি, জেলা - কিশোরগঞ্জ। শিক্ষাগত যোগ্যতা - বিএ। 


লেখালেখি- ১৯৮৬ থেকে। প্রথম উপন্যাস- ‘হৃদয় যদি দেখা যেত’,  /১৯৯৭ খ্রি. ২য় গল্পগ্রন্থ প্রকাশ - ‘কাচ ভাঙার শব্দ’ /২০২০ খ্রি.
সাহিত্য পুরস্কার - গল্প-কবিতা অন্যপ্রকাশ - ২০১৮ খ্রি. (বাংলাদেশ),  আনন্দ আশ্রম /২০১৯ খ্রি. (কলিকাতা, ভারত), বিজয় সন্মমনা স্বারক/ ২০১৮ খ্রি.(কুয়েত)।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow