রেকর্ড পরিমাণ জাল জব্দই কি বিপদের কারণ?
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগে আলোচিত হচ্ছে। অবৈধ জাল ব্যবহার, মাছের পোনা নিধন, বিল দখল ও জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনা ছিল তুমুল আলোচিত। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাম্প্রতিক তৎপরতার মধ্যেই এবার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান। তাকে ঘিরে এখন উপজেলাজুড়ে চলছে তীব্র বিতর্ক— একপক্ষের চোখে তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তা, অন্যপক্ষের কাছে তিনি হাওর রক্ষার কঠোর প্রশাসক। গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে কাদির মিয়া নামে এক ব্যক্তি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে অবৈধ মাছ শিকার, পোনা নিধন, বিল সেচ দিয়ে মাছ ধরা এবং প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। তবে অভিযোগের পেছনের প্রেক্ষাপট ঘেঁটে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। প্রশাসনিক সূত্র ও মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান চাঁদাবাজির অভিযোগে হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে আদালত
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগে আলোচিত হচ্ছে। অবৈধ জাল ব্যবহার, মাছের পোনা নিধন, বিল দখল ও জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনা ছিল তুমুল আলোচিত। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাম্প্রতিক তৎপরতার মধ্যেই এবার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান। তাকে ঘিরে এখন উপজেলাজুড়ে চলছে তীব্র বিতর্ক— একপক্ষের চোখে তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তা, অন্যপক্ষের কাছে তিনি হাওর রক্ষার কঠোর প্রশাসক।
গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে কাদির মিয়া নামে এক ব্যক্তি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে অবৈধ মাছ শিকার, পোনা নিধন, বিল সেচ দিয়ে মাছ ধরা এবং প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।
তবে অভিযোগের পেছনের প্রেক্ষাপট ঘেঁটে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। প্রশাসনিক সূত্র ও মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান চাঁদাবাজির অভিযোগে হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। হেলাল মিয়া অভিযোগকারী কাদির মিয়ার শ্যালক। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই মামলার পর থেকেই একটি পক্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, জুড়ীর বিভিন্ন ইজারাকৃত বিল ও হাওরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার নিয়ে কয়েকটি শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে নীরব দ্বন্দ্ব চলে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব জলমহাল নিয়ন্ত্রণকে ঘিরেই বর্তমান বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
হাওরপাড়ের কয়েকজন জেলের ভাষ্য, একসময় মাছ ধরতে গেলেই প্রভাবশালী চক্রকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো। মৌসুমভিত্তিক মাছ শিকারের সময় সাধারণ জেলেদের ওপর চাপ আরও বেড়ে যেত। তাদের অভিযোগ, হেলাল মিয়া ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন জেলের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। এমনকি স্থানীয় একটি দোকানে সেই অর্থ জমা রাখার বিষয়েও তথ্য উঠে এসেছে।
গত বছরের ১৪ আগস্ট স্থানীয় জেলেদের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন সময় জেলেদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। পরে ১৩৮ জেলের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে জমা পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মামলাটি তুলে নিতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার ওপর স্থানীয়ভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হয়েছিল। আব্দুর রব নামে এক ব্যক্তি সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে মনিরুজ্জামান আপস না করায় পরবর্তীতে তাকে ঘিরে বিরূপ প্রচারণা শুরু হয় বলে দাবি তার ঘনিষ্ঠদের।
যদিও অভিযোগকারী কাদির মিয়া এসব দাবি অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, ‘আমি হাওরে গিয়ে দেখি ম্যাজিক জাল দিয়ে বোয়াল মাছের পোনা ধরা হচ্ছে। বিষয়টি মৎস্য কর্মকর্তাকে জানালে তিনি উল্টো আমাকে ধমক দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েই অভিযোগ করেছি।'
তবে অভিযোগে উল্লেখ করা কয়েকটি তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, কিছু ঘটনার স্থান জুড়ী উপজেলার বাইরে। বিল সেচ দিয়ে মাছ নিধনের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার একটি অংশ বড়লেখা উপজেলার পিংলা ও পরতি বিল এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোনা নিধনের ভিডিওটি গোলাপগঞ্জ উপজেলার বলে প্রশাসনিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নাগুয়া বিলে নদীর একাংশ দখল করে মাছ ধরার অভিযোগ প্রসঙ্গে জুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিনা আক্তার বলেন, ‘অভিযোগ ওঠার পর আমরা সার্ভেয়ার দিয়ে জায়গাটির সীমানা নির্ধারণ করেছি। সেটি ইজারাকৃত বিলের অংশ।’
এদিকে স্থানীয় জেলেদের একটি বড় অংশ বলছে, মনিরুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর হাওরাঞ্চলে নিয়মিত অভিযান, অবৈধ জাল জব্দ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে আগের তুলনায় অনিয়ম কমেছে। জেলে ইউসুফ মিয়া, নজরুল ইসলাম ও বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আগে মাছ ধরতে গেলেই চাঁদা দিতে হতো। এখন অভিযান বাড়ায় সাধারণ জেলেরা কিছুটা স্বস্তিতে আছে। এজন্যই একটি পক্ষ কর্মকর্তাকে সরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১০ মে জুড়ীতে ৪০ থেকে ৫০ জনের অংশগ্রহণে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন এবং দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
মানববন্ধনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় জনমনে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, “জুড়ীর হাওর এখন প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের কেন্দ্রে।” আবার কেউ মনে করছেন, “মৎস্য কর্মকর্তাকে ঘিরে এই দ্বন্দ্ব মূলত হাওর নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত।”
সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জুড়ীতে রেকর্ড পরিমাণ অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও হাওর রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণেই একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে। তারা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অসহায় জেলেদের কাছ থেকে যারা দীর্ঘদিন চাঁদা আদায় করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। এখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাকে বদলি ও সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দায়িত্ব পালনে আমি আপসহীন থাকব।’
What's Your Reaction?