লেবাননকে কেন্দ্র করে ইরান-ইসরায়েল কী সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াবে

লেবাননে হামলার জেরে ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা পাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সম্ভাব্য একটি শান্তিচুক্তি হুমকির মুখে পড়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপেক্ষা করে ইসরায়েল কি সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাবে?  ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরুকে এপ্রিলে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, উভয় পক্ষই আরও বেশি সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতিকে তার শেষ সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। ইসরায়েল রোববার (৭ জুন) রাতভর ইরানজুড়ে হামলা চালিয়েছে। উত্তর ইসরায়েলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কয়েক ঘণ্টা পরেই এই হামলা চালানো হয়। ইরান অভিযোগ করেছে, লেবাননে চলমান সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। তবে ইসরায়েলের দাবি, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো দেশটিতে তেহরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। দুপক্ষে হামলা পাল্টা হামলা চলতে থাকার পর সোমবার (৮ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে একে অপরের ওপর আক্রমণ

লেবাননকে কেন্দ্র করে ইরান-ইসরায়েল কী সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াবে

লেবাননে হামলার জেরে ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা পাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সম্ভাব্য একটি শান্তিচুক্তি হুমকির মুখে পড়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপেক্ষা করে ইসরায়েল কি সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাবে? 

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরুকে এপ্রিলে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, উভয় পক্ষই আরও বেশি সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতিকে তার শেষ সীমায় ঠেলে দিচ্ছে।

ইসরায়েল রোববার (৭ জুন) রাতভর ইরানজুড়ে হামলা চালিয়েছে। উত্তর ইসরায়েলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কয়েক ঘণ্টা পরেই এই হামলা চালানো হয়। ইরান অভিযোগ করেছে, লেবাননে চলমান সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। তবে ইসরায়েলের দাবি, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো দেশটিতে তেহরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।

দুপক্ষে হামলা পাল্টা হামলা চলতে থাকার পর সোমবার (৮ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে একে অপরের ওপর আক্রমণ বন্ধ করার আহ্বান জানান।

ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ইসরায়েল ও ইরানকে অবিলম্বে গুলি চালানো বন্ধ করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা কীভাবে এগোবে, কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।

কীভাবে কী ঘটল?

কয়েকদিন ধরেই লেবাননে হামলা নিয়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল। ৪ জুন ইসরায়েল ও লেবাননের যৌথভাবে ঘোষিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন আরেকটি যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও, রোববার ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে হামলা চালায়। এতে অন্তত দুইজন নিহত এবং ২০ জন আহত হন।

ওই হামলাগুলোর কয়েক ঘণ্টা পর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান উত্তর ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যেমনটি তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়।

এর জবাবে ইসরায়েল মধ্য ও পশ্চিম ইরানে রাতভর হামলা চালিয়েছে। এরপর তেহরান দ্বিতীয় দফা হামলা শুরু করে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের তথ্যমতে, ইরান রোববার রাত থেকে অন্তত ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরায়েলের ওপর এটিই প্রথম সরাসরি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। মার্চের শুরু থেকে লেবাননে প্রায় প্রতিদিন ইসরায়েলি হামলা চলার পর, এই প্রথম তেহরান সরাসরি ইরানের ভূখণ্ড থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তার প্রতিশোধ নিল। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলা হলে তার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে ইরানের বারবার সতর্কবার্তার পরেই এই হামলাটি চালানো হয়।

এদিকে ইয়েমেন থেকেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। সোমবার হুথিরা এর দায় স্বীকার করে ইসরায়েলের জন্য বাব আল-প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

তেহরান বারবার জোর দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি নির্ভর করছে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধের ওপর। ইসরায়েলি বাহিনী দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ দখল করে রেখেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সর্বশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধি যুদ্ধবিরতির পর থেকে চলমান সংঘাতের ধরনকে নতুন রূপ দিতে পারে। একই সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সীমা কঠিন পরীক্ষায় পড়তে পারে। 

ইসরায়েল কি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেছে?

রোববার গভীর রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় হওয়া যেকোনো চুক্তি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে মেনে নিতেই হবে। কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকে।

ট্রাম্প ফিনান্সিয়াল টাইমসকে একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, তার কোনো উপায় থাকবে না। সবকিছু আমিই নিয়ন্ত্রণ করি। সে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।

রোববার রাতে ইসরায়েলের দিকে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পরপরই ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। কিন্তু তার মন্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই এবং ওয়াশিংটন সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল।

ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের মধ্যে এই আপাত ব্যবধানটি কোনো প্রকৃত মতবিরোধের প্রতিফলন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনার খবর বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ইসরায়েলের প্রতি তার অবিচল সমর্থনের কথা জানিয়েছে।

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এই অঞ্চলে ট্রাম্পের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, ট্রাম্পকে অগ্রাহ্য করে ইসরায়েল শুধু ইরানের নতুন সমীকরণকেই চ্যালেঞ্জ করেনি, বরং ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষুণ্ণ করেছে।

যদি ইসরায়েলের এই অবাধ্যতার কোনো পরিণতি না হয়, তবে তা ইরানে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করবে যে ট্রাম্প হয় ইসরায়েলকে সংযত করতে পারেন না অথবা করবেন না, যোগ করেন তিনি।

ইসরায়েল হামলা চালানোর পর মার্কিন ডেমোক্রেট সিনেটর ক্রিস মরফি ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে ইসরায়েল ট্রাম্পকে অপমান করেছে।

তিনি এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ট্রাম্প অনেক আগেই এই যুদ্ধের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। যখন মর্মান্তিকভাবে আবার পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, তখন তার চরম অযোগ্যতাকে খাটো করে দেখানো কঠিন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সংযমের আহ্বান এবং ইসরায়েলের সংঘাত বাড়ানোর ইচ্ছার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানটি এই সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়কে রূপদানকারী অন্যতম প্রধান বিভাজন রেখা হয়ে উঠতে পারে।

উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে লেবানন

নতুন এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেবানন। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে পৃথক ভাবে দেখতে চাইলে তেহরান তা মানতে নারাজ। ইরান এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির প্রথম থেকেই বলে আসছিল, লেবাননকে অবশ্যই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিচুক্তির মধ্যস্ততা করে যুক্তরাষ্ট্র, যদিও তা পুরোপুরি মেনে চলেনি ইসরায়েল।

১৬ই এপ্রিল মার্কিন মধ্যস্থতায় প্রথম যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পরও ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের আগ্রাসন ও দখল অব্যাহত রাখে। এই মাধ্যমে গত পঁচিশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সবচেয়ে গভীর অনুপ্রবেশ ঘটে। ইসরায়েলি সেনারা এখন লেবাননের প্রায় ২,০০০ বর্গকিলোমিটার (৭৭০ বর্গমাইল) ভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে; যা দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

মার্চের শুরু থেকে লেবাননে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দক্ষিণাঞ্চলে দশ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতেও নিয়মিত হামলা অব্যাহত রেখেছে, যেগুলোকে তারা হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি বলে দাবি করে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে লেবাননে ছয় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেক নারী-শিশু রয়েছেন।

এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে গত সপ্তাহে, যখন ইসরায়েল দক্ষিণ বৈরুতের উপশহর দাহিয়েহ-তে হামলার হুমকি দেয় এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সতর্কতা জারি করে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেন, এই হুমকিটি উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপটিকে সংঘাতের সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য ইসরায়েলের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন। বিষয়টি এমন যে, ইসরায়েল একটি বোঝাপড়া তৈরি করছে যেখানে তারা বলতে চায়, তাদের ওপর যেকোনো হামলা হলে বৈরুতেও হামলা চালানো হবে।

কিন্তু এই নতুন সংঘাত-নীতিগুলো কখনওই বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছিল যে দাহিয়েহ-তে যেকোনো ইসরায়েলি হামলার পরিণতি লেবাননের সীমানা ছাড়িয়ে যাবে এবং বৈরুতের ওপর হামলা হলে ইরান সরাসরি পাল্টা জবাব দিতে পারে।

সেই সতর্কবার্তার জেরে ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। তিনি জানান, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে এমন খবরও প্রকাশিত হয় যে, ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে আরও বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চাপ দিচ্ছে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওয়াশিংটন এই গোষ্ঠীটিকে তথাকথিত “সন্ত্রাসী” সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কখনও এই গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখার প্রেক্ষাপটে এই দাবিটি ছিল অভূতপূর্ব ঘটনা।

ট্রাম্প প্রশাসন ৩ জুন ঘোষণা করে, ইসরায়েল ও লেবানন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর উত্তর থেকে সরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো অনুরূপ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। ফলে হিজবুল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সেখানে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার ওপর জোর দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল লেবানন সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর আলোচনা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছিল। তেহরানের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপ সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স-এর ইরানি পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ডক্টর হামিদরেজা আজিজি বলেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বারবার যুক্তি দিয়েছেন যুদ্ধবিরতি অবশ্যই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে প্রযোজ্য হতে হবে। একটি ফ্রন্টে এর লঙ্ঘন মানেই সর্বত্র লঙ্ঘন। এখন পর্যন্ত, এই অবস্থানটি মূলত কথার কথাই ছিল, কিন্তু সোমবারের ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় হয়তো সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।

এর মানে কি সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাওয়া?

লেবাননের সংঘাতটি এখন ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত বলে মনে হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযান এবং দাহিয়েহতে বারবার হামলার ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা ক্রমশ একটি নতুন আঞ্চলিক রেড লাইন বলে মনে হচ্ছে।

আজিজি বলেন, লেবাননের ওপর হামলার জবাবে নিজেদের মাটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের তেহরানের সিদ্ধান্তই এখানকার মূল ঘটনা।

এই সিদ্ধান্তটি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির পূর্বের সেই বক্তব্যকে বাস্তব রূপ দিয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি সব রণাঙ্গনে প্রযোজ্য। এক রণাঙ্গনে এর লঙ্ঘন মানেই সব রণাঙ্গনে লঙ্ঘন।

আজিজির মতে, হিজবুল্লাহ বা ইরানের তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষ-এর অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি জবাব দেওয়ার ইরানের সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের প্রতিক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। এটি ছিল সীমিত পরিসরের, মূলত প্রতিহত করা হয়েছিল এবং এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, বলেন তিনি।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না। আপাতত এর সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। কারণ ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলছেন একটি বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি এখনও অর্জনযোগ্য। ওয়াশিংটনও আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে চাইছে। বিশেষ করে এর কারণ হলো, মার্কিন বাজারের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

ইরানেরও যথেষ্ট দর কষাকষির ক্ষমতা রয়েছে। উত্তেজনা বৃদ্ধি সত্ত্বেও, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর কোনো নিশ্চিত হামলার ঘটনা ঘটেনি। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সরাসরি হস্তক্ষেপ আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর ওপর ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ওয়াশিংটন এবং তার উপসাগরীয় মিত্ররা এড়াতে চায়। 

তবে আজিজি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইরানের এই বিশ্বাসকেই প্রমাণ করে যে, শুধু কূটনীতি নয়, সামরিক চাপই দর কষাকষির সুযোগ তৈরি করবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow