শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার

বগুড়া শহরের ব্যস্ত দুই বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১২৭ বছরের পুরোনো চেলোপাড়া রেলসেতু। তবে শুধু একটি রেলপথ নয়, হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ এটি। কিন্তু শতবর্ষী এই রেলসেতুর বিভিন্ন অংশে এখন ক্ষয় ও দুর্বলতার চিহ্ন স্পষ্ট। এরপরও প্রতিদিন এর ওপর দিয়ে চলাচল করছে ১৬ ট্রেন। ফলে জননিরাপত্তার প্রশ্নে শতবর্ষী এ অবকাঠামোকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ। সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর লোহার বিভিন্ন অংশে মরিচা, গার্ডারে ক্ষয়ের চিহ্ন এবং ফুটব্রিজের বহু স্থানে ভাঙাচোরা স্পষ্ট। ট্রেন চলাচলের সময় কম্পন এতটাই দৃশ্যমান যে আশপাশের ব্যবসায়ী ও পথচারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয়রা জানান, ট্রেন সেতুতে উঠলেই পুরো কাঠামো কেঁপে ওঠে। বিকট শব্দে কাঁপতে থাকে গার্ডার। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত এই সেতু আর কতদিন এভাবে থাকে কেউ জানে না। এদিকে চেলোপাড়া রেলসেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ঘনবসতি, অস্থায়ী দোকানপাট এবং ব্যস্ত জনসমাগম। এক পাশে চাষিবাজার, অন্য পাশে রাজাবাজার থাকায় প্রতিদিন শত শত ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ক্রেতা ও পথচারীর চলাচলে এলাকা সরগরম থাকে। এই ব্যস্ততার মধ্যেই সেতুর দুই পাশে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। ‘চেলোপাড়া রেলসেতু ও এ

শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার

বগুড়া শহরের ব্যস্ত দুই বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১২৭ বছরের পুরোনো চেলোপাড়া রেলসেতু। তবে শুধু একটি রেলপথ নয়, হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ এটি। কিন্তু শতবর্ষী এই রেলসেতুর বিভিন্ন অংশে এখন ক্ষয় ও দুর্বলতার চিহ্ন স্পষ্ট। এরপরও প্রতিদিন এর ওপর দিয়ে চলাচল করছে ১৬ ট্রেন। ফলে জননিরাপত্তার প্রশ্নে শতবর্ষী এ অবকাঠামোকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর লোহার বিভিন্ন অংশে মরিচা, গার্ডারে ক্ষয়ের চিহ্ন এবং ফুটব্রিজের বহু স্থানে ভাঙাচোরা স্পষ্ট। ট্রেন চলাচলের সময় কম্পন এতটাই দৃশ্যমান যে আশপাশের ব্যবসায়ী ও পথচারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

স্থানীয়রা জানান, ট্রেন সেতুতে উঠলেই পুরো কাঠামো কেঁপে ওঠে। বিকট শব্দে কাঁপতে থাকে গার্ডার। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত এই সেতু আর কতদিন এভাবে থাকে কেউ জানে না।

এদিকে চেলোপাড়া রেলসেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ঘনবসতি, অস্থায়ী দোকানপাট এবং ব্যস্ত জনসমাগম। এক পাশে চাষিবাজার, অন্য পাশে রাজাবাজার থাকায় প্রতিদিন শত শত ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ক্রেতা ও পথচারীর চলাচলে এলাকা সরগরম থাকে। এই ব্যস্ততার মধ্যেই সেতুর দুই পাশে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।

‘চেলোপাড়া রেলসেতু ও এর আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ নজরে রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিশেষ করে সেতুর দুই প্রান্তের বাজার, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে’

বাজারে দেখা যায়, সময় বাঁচাতে অনেকেই রেল স্লিপারের ওপর দিয়েই যাতায়াত করছেন। আবার কেউ কেউ ট্রেনের কোল ঘেঁষেও চলাচল করছেন, যা পুরো এলাকাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার

শতবর্ষী রেলসেতুর দু’পাশে বসেছে বাজার/ ছবি/ জাগো নিউজ

চাষিবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রেন চলাচলের সময় সেতুর বিভিন্ন অংশে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। অনেক সময় মরিচা ধরা লোহার ছোট টুকরো কিংবা ইটের অংশ খসে পড়তেও দেখা যায়। এছাড়া কোনো কারণে ট্রেন লাইনচ্যুত হলে বা সেতুর বড় ধরনের ক্ষতি হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে।

জানা গেছে, চুন-সুরকি ও ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত এই কাঠামোর বয়স ১২৭ বছর হলেও এটির সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল ছিল প্রায় ৬০ বছর।

এদিকে মূল সেতুর সঙ্গে লাগানো পথচারীদের জন্য নির্মিত ফুটব্রিজটির অবস্থাও ভালো না। বেশ কয়েকটি স্থানে লোহার পাত ভেঙে গেছে। স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে বাঁশের চরাট বসিয়ে কোনোমতে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু বৃষ্টি ও রোদে সেই বাঁশও এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

প্রবীণ বাসিন্দা শেখ সিরাজ উদ্দিন বলেন, মানুষের কথা চিন্তা করে রেলওয়ে এই ফুটব্রিজ বানানো হয়েছিল। এখন সেটাও ভাঙাচোরা। অনেক জায়গায় বাঁশ দিয়ে চলতে হচ্ছে। এটা ভেঙে গেলে পূর্ব বগুড়ার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

উত্তর চেলোপাড়ার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে মুক্তিযোদ্ধারা সেতুর একটি অংশ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার

রেলসেতুর পাশের স্থানীয়দের চলাচলের জন্য বাঁশের সেতু/ জাগো নিউজ

তিনি আরও বলেন, এটা শুধু একটা ব্রিজ না, ইতিহাসের অংশও বটে। কিন্তু এখন যে অবস্থা, ইতিহাস রক্ষা তো দূরের কথা, ঝুঁকিতে আছে পথচারীরা।

‘সেতুটি তিন গার্ডারবিশিষ্ট একটি স্টিল গার্ডারের তৈরি। বাজারসংলগ্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক জমার কারণে একটি গার্ডারে ক্ষয় হয়েছে। তবে কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে সেতুটি এখনো ট্রেন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা পরিত্যক্ত হয়ে যায়নি’

চাষিবাজারে ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, প্রতিনিয়ত আমাদের যাতায়াত করতে হয়। বিশেষ করে রাজাবাজার থেকে ভারি মালামাল নিয়ে বহন করলে ব্রিজের ঝাঁকুনির কারণে মালামাল হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

বগুড়ার রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নারায়ন প্রসাদ সরকার বলেন, সেতুটি তিন গার্ডারবিশিষ্ট একটি স্টিল গার্ডারের তৈরি। বাজারসংলগ্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক জমার কারণে একটি গার্ডারে ক্ষয় হয়েছে। তবে কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে সেতুটি এখনো ট্রেন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা পরিত্যক্ত হয়ে যায়নি।

তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গার্ডার প্রতিস্থাপন এবং অন্যান্য অংশ সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে।

শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার

মরিচা ও গার্ডারে ক্ষয় ধরেছে শতবর্ষী চেলোপাড়া রেলসেতুতে/ জাগো নিউজ

একই সঙ্গে নারায়ন প্রসাদ সরকার বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে সেতুটির বড় ধরনের সংস্কার হয়েছিল এবং রেলওয়ে নিয়মিত এটি মনিটরিং করছে।

‘মানুষের কথা চিন্তা করে রেলওয়ে এই ফুটব্রিজ বানানো হয়েছিল। এখন সেটাও ভাঙাচোরা। অনেক জায়গায় বাঁশ দিয়ে চলতে হচ্ছে। এটা ভেঙে গেলে পূর্ব বগুড়ার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে’

বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, চেলোপাড়া রেলসেতু ও এর আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ নজরে রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিশেষ করে সেতুর দুই প্রান্তের বাজার, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

সেতুর গার্ডারে বর্জ্যের কারণে ক্ষয় সৃষ্টি হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, বাজারসংলগ্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা রোধে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে জনসচেতনতার অভাব এবং অসচেতনভাবে বর্জ্য ফেলার প্রবণতার কারণে সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সেতুর আশপাশের এলাকা আরও পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চাষিবাজার ও রাজাবাজারের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের পক্ষে আমিরুল ইসলাম বলছেন, প্রতিদিন কয়েকশ ব্যবসায়ী এবং হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতা এই এলাকায় যাতায়াত করেন। দুই বাজারের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেলসেতু ও সংলগ্ন পথের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে ফুটব্রিজ সংস্কার এবং সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসলেও কার্যকর অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। যেকোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগেই স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

এনএইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow