শরণার্থী জীবন নয়, নিজ দেশে ফেরার আকুতি রোহিঙ্গাদের

ক্যাম্পের ঝুপড়ি ঘর ছেড়ে নিজ ভিটেমাটিতে ফিরতে চান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। কিন্তু ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। বরং উল্টো নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। এসব রোহিঙ্গাদের কণ্ঠে একটাই আকুতি, ‘আমরা শরণার্থী পরিচয়ে নয়, নিজ দেশে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চাই।’ দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ক্যাম্পের সীমাবদ্ধ জীবনে তারা মানবিক সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের একটাই দাবি, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হোক। আরও পড়ুন রোহিঙ্গাদের জন্য ইইউর আরও ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো সহায়তা ঘোষণা উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রাখাইনের কুয়ার বিল এলাকার হেদায়েতুল জান্নাত (৪৫) বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব শান্তিতে দিন কাটিয়েছি। সেখানে কোনো কিছুর অভাব ছিল না, ছিল বড় বাড়ি, বিস্তৃত

শরণার্থী জীবন নয়, নিজ দেশে ফেরার আকুতি রোহিঙ্গাদের

ক্যাম্পের ঝুপড়ি ঘর ছেড়ে নিজ ভিটেমাটিতে ফিরতে চান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। কিন্তু ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। বরং উল্টো নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। এসব রোহিঙ্গাদের কণ্ঠে একটাই আকুতি, ‘আমরা শরণার্থী পরিচয়ে নয়, নিজ দেশে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চাই।’

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ক্যাম্পের সীমাবদ্ধ জীবনে তারা মানবিক সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের একটাই দাবি, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।

উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রাখাইনের কুয়ার বিল এলাকার হেদায়েতুল জান্নাত (৪৫) বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব শান্তিতে দিন কাটিয়েছি। সেখানে কোনো কিছুর অভাব ছিল না, ছিল বড় বাড়ি, বিস্তৃত ভিটেমাটি। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিজেদের সহায়-সম্পদ ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। আমরা কখনো ভাবিনি এভাবে শরণার্থী জীবন কাটাতে হবে। ক্যাম্পে খাবার পেলেও ঝুপড়ি ঘরে ৬ সন্তান নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছি। দিন দিন পরিবার বড় হচ্ছে, কিন্তু ঘর বড় করার কোনো সুযোগ নেই। তাই যেকোনোভাবে হোক, সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে মিয়ানমারে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চাই।’

শরণার্থী জীবন নয়, নিজ দেশে ফেরার আকুতি রোহিঙ্গাদের

আরেক রোহিঙ্গা নুরুল আমিন (৪৮) বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো জাতিই শরণার্থী জীবন চায় না। সবাই স্বাধীনতা, সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে বসবাস করতে চায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের কারণে আমরা নিজেদের ভিটেমাটিতে থাকতে পারিনি। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবুও বর্তমানে ক্যাম্পের জীবন আর ভালো লাগছে না। মিয়ানমারে আমাদের চিংড়ি ঘের, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই ছিল। কিন্তু আজ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে দিন কাটাতে হচ্ছে।’

আরেক রোহিঙ্গা শরণার্থী দিল বাহার (৫০) বলেন, ‘ক্যাম্পে খাবার পেলেও ঝুপড়ি ঘরের জীবন আর ভালো লাগছে না। বহু আশা নিয়ে অপেক্ষা করছি কবে আবার নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবো।’

শরণার্থী জীবন নয়, নিজ দেশে ফেরার আকুতি রোহিঙ্গাদের

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে আসা ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছে। এর পাশাপাশি নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে।

দিন দিন ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ প্রবণতা বেড়ে চলেছে, অপহরণ, খুন, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, প্রতিদিনই ক্যাম্পে শিশু জন্ম নিচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গা যুবকদের বিয়ের প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

শরণার্থী জীবন নয়, নিজ দেশে ফেরার আকুতি রোহিঙ্গাদের

স্থানীয় হোয়াইক্যংয়ের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন অত্যন্ত জরুরি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিশ্রণ ঘটছে এবং ক্যাম্পে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঝেমধ্যে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ঝগড়া ও বিবাদের ঘটনাও ঘটছে।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৭ সালে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও বর্তমানে এ সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাই দ্রুত ও কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন করে ১ লাখ ৫২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তবে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে।

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এপিবিএনের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. কাউছার সিকদার বলেন, ক্যাম্পে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধ তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিরোধকে কেন্দ্র করেই ঘটে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও অধিকাংশ রোহিঙ্গাই শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ।

জাহাঙ্গীর আলম/এফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow