শিক্ষক সংকটে মান হারাচ্ছে তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৬২ সালে আলহাজ্ব টগরু মোহাম্মদ প্রামাণিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াকফ করেন ৩ একর ২৮ শতাংশ জমি । প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাস্টার আব্দুল জব্বার। বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এই বিদ্যালয় থেকে তৈরি হয়েছে একাধিক চিকিৎসক, সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার কৃতিমান শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালে জাতীয়করণ করা হলেও প্রায় সাত বছর ধরে তৈরি হয় শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট। ধারাবহিকভাবে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার ফলে শিক্ষার মান ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পড়েছে ঐতিহ্য হারানোর মতো ক্ষতিকর প্রভাব। গত সময়ের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল থেকে দেখা যায়, গত ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৪.৫৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে নেমে আসে ৬৪.১২ শতাংশে। ২০২৫ সালে পাসের হার কিছুটা বেড়ে ৭৭.০৮ শতাংশ হলেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেনি। চলতি বছর ১৩১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফলাফল এখ

শিক্ষক সংকটে মান হারাচ্ছে তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৬২ সালে আলহাজ্ব টগরু মোহাম্মদ প্রামাণিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াকফ করেন ৩ একর ২৮ শতাংশ জমি । প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাস্টার আব্দুল জব্বার। বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এই বিদ্যালয় থেকে তৈরি হয়েছে একাধিক চিকিৎসক, সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার কৃতিমান শিক্ষার্থী।

বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালে জাতীয়করণ করা হলেও প্রায় সাত বছর ধরে তৈরি হয় শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট। ধারাবহিকভাবে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার ফলে শিক্ষার মান ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পড়েছে ঐতিহ্য হারানোর মতো ক্ষতিকর প্রভাব।

গত সময়ের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল থেকে দেখা যায়, গত ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৪.৫৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে নেমে আসে ৬৪.১২ শতাংশে। ২০২৫ সালে পাসের হার কিছুটা বেড়ে ৭৭.০৮ শতাংশ হলেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেনি। চলতি বছর ১৩১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফলাফল এখনো হয়নি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে জেনারেল শাখায় ৩১২ জন এবং ভোকেশনাল শাখায় ১৯০ জনসহ মোট ৫০২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয়করণের পর ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যালয়টির ভোকেশনাল শাখা সহ ১৭ জন শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারীর পদ এডহক নিয়োগ অনুমোদন দেয়। পরে অবসর মৃত্যুজনিত কারণে শিক্ষকের ৫টি পদ ও কর্মচারীর ২টি পদ শূন্য হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ২৫টি সহকারী শিক্ষক পদ থাকার বিধান রয়েছে। অথচ এ বিদ্যালয়ে ভোকেশনালসহ অনুমোদিত পদই ১৭টি, যার পাঁচটি শিক্ষক পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ধারাবাহিক ভাবে নেমেছে ধস। বর্তমান এডহক নিয়োগপ্রাপ্ত ১৭টি শিক্ষক পদের বিপরীতে মৃত্যু ও অবসরজনিত কারণে প্রধান শিক্ষক, ধর্ম শিক্ষক-২ (ইসলাম ও হিন্দু), ব্যবসায় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ের মোট ৫টি শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন শিক্ষক। এছাড়া বিদ্যালয়টিতে নেই নৈশপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। অনুমোদিত ৬টি কর্মচারী পদের মধ্যেও শূন্য ২টি পদ। ফলে দেখা দিয়েছে পাঠদান ত্রুটি, প্রশাসনিক অবহেলা এবং পরিছন্নতা ও পরিবেশগত সমস্যা।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ফেরদৌস ইসলাম বলে, প্রতিদিন ঠিকভাবে সব ক্লাস হয় না, যেখানে নিয়মিত ছয় থেকে আটটি ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু অনেক দিন ধরে তিন থেকে পাঁচটি ক্লাসের বেশি হচ্ছে না। স্যার (শিক্ষক) তো নাই, তারপরও সরকারি ছুটি, পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ক্লাস স্থগিত থাকে। এতে পাঠ্যসূচি শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হিমশিম খাচ্ছি। বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ হলে নিয়মিত সবগুলো ক্লাস নিশ্চিত হবে। তাহলে আমাদের পরীক্ষার ফলাফল আগের তুলনায় আরও ভালো হবে।

একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সোহাগ ইসলাম বলে, এসএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে আমাদের প্রয়োজন নিয়মিত ও বিষয়ভিত্তিক ক্লাস। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিষয়ে ক্লাস হচ্ছে না। ফলে পাঠবইয়ের পড়াগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারি না। বাসায় ও প্রাইভেটে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ে তাড়াতাড়ি শিক্ষক নিয়োগ হলে আমাদের প্রস্তুতি আরও ভালো হবে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারবো।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক বসুদেব রায় বলে, ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের পর ২০২৩ সালে এডহক নিয়োগের ভিত্তিতে ১৭টি শিক্ষক এডহক অনুমোদন পান। পরে মৃত্যু ও অবসরজনিত কারণে পাঁচটি শিক্ষক পদ শূন্য হয়, দীর্ঘদিন এসব শূন্য পদে নতুন শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শূন্য পদগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মুসা সরকার জানান, প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় সহকারী প্রধান হিসেবে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মরত শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে চাপ বেড়েছে, ফলে শিক্ষার মান ও একাডেমিক ফলাফল আশানূরুপ হচ্ছে না। শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে, শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত ফলাফলের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি আবারো পূর্বের ন্যায় সুনাম ও ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহীনুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট রয়েছে। জাতীয়করণের পর এ ধরনের বিদ্যালয়ে বিসিএস নন-ক্যাডারের শিক্ষক পদায়ন না হওয়ায় এবং এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ না থাকায় শিক্ষক স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয়টির শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। শূন্য পদগুলোতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার পরিবেশ এবং একাডেমিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, শিক্ষক সংকট নিরসনে উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের চাহিদাপত্র ও দাপ্তরিক সুপারিশ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয়করণের পর এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক স্বল্পতার ফলে শিক্ষার্থী অনুপাতে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়ভিত্তিক পাঠদান কমে গেছে। শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় আবারও শিক্ষার মানোন্নয়ন, সুশৃঙ্খল শিক্ষা পরিবেশ এবং কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক ফলাফল অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আব্দুল হাকিম সরকার বলেন, তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় একসময় উপজেলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ও গর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারছে না। ফলে শিক্ষার মান, একাডেমিক পরিবেশ এবং পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যালয়টি আবারও তার হারানো ঐতিহ্য, সুনাম ও শিক্ষার গৌরব ফিরে পাবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow