শেষ ঠিকানা   

আজকাল চোখে বড্ড কম দেখছে নিহার বানু। হাঁটতে গিয়ে কোথায় যেন ধাক্কা লেগে প্রচণ্ড ব্যথা পেল পায়ে। বয়সটা তো আর কম হলো না। এসব এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। সে যথাসম্ভব উঁচু গলায় বুনিকে ডাকলো, “কই রে বুনি; আমার চশমা টা তো পাচ্ছি না রে। শিগগির একটু দিয়ে যা না বাপ। আর কতবার যে তোদের বলতে হবে।" কথাটা বলে সে চেয়ারে বসল। এই বাড়িতেই একদিন বাতাসের বেগে দৌড়ে বেড়াতো সে। একবার এদিকে তো আর একবার সেদিকে। ছুটতে ছুটতে আজ কতটা পথ পাড়ি দিয়ে চলে এসেছে; ভাবতেই অবাক লাগে। চোখ বন্ধ করলেই যেন লজ্জা মুখের কিশোরী নিহার বানুকে দেখতে পায় সে। কতই বা আর বয়স হবে তখন তার; ১৪ কি ১৫ হয়তো। হঠাৎই একদিন নিজেকে আবিষ্কার করলো সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশে। কিছু না বুঝতে পারা মেয়েটা শুধু যেন এটাই বুঝতে পারলো, এই বাড়ি থেকে, এই সংসার থেকে তার আর মুক্তি নেই। এখানকার প্রত্যেকটা মানুষ, প্রত্যেকটা বস্তুই হতে চলেছে তার শেষ ঠিকানা। সংসারটা ছিল বড় অভাবের। অসুস্থ শ্বশুর, শাশুড়ির জ্বালাময় মুখ, কষ্টে মানুষ হওয়া করুণ মুখের ছোট্টো দেবর আর স্বামীহারা ননদের চেহারা দেখে বুঝতে তার এতটুকু সময় লাগে নি—যুদ্ধের তো কেবল শুরু মাত্র

শেষ ঠিকানা   
আজকাল চোখে বড্ড কম দেখছে নিহার বানু। হাঁটতে গিয়ে কোথায় যেন ধাক্কা লেগে প্রচণ্ড ব্যথা পেল পায়ে। বয়সটা তো আর কম হলো না। এসব এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। সে যথাসম্ভব উঁচু গলায় বুনিকে ডাকলো, “কই রে বুনি; আমার চশমা টা তো পাচ্ছি না রে। শিগগির একটু দিয়ে যা না বাপ। আর কতবার যে তোদের বলতে হবে।" কথাটা বলে সে চেয়ারে বসল। এই বাড়িতেই একদিন বাতাসের বেগে দৌড়ে বেড়াতো সে। একবার এদিকে তো আর একবার সেদিকে। ছুটতে ছুটতে আজ কতটা পথ পাড়ি দিয়ে চলে এসেছে; ভাবতেই অবাক লাগে। চোখ বন্ধ করলেই যেন লজ্জা মুখের কিশোরী নিহার বানুকে দেখতে পায় সে। কতই বা আর বয়স হবে তখন তার; ১৪ কি ১৫ হয়তো। হঠাৎই একদিন নিজেকে আবিষ্কার করলো সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশে। কিছু না বুঝতে পারা মেয়েটা শুধু যেন এটাই বুঝতে পারলো, এই বাড়ি থেকে, এই সংসার থেকে তার আর মুক্তি নেই। এখানকার প্রত্যেকটা মানুষ, প্রত্যেকটা বস্তুই হতে চলেছে তার শেষ ঠিকানা। সংসারটা ছিল বড় অভাবের। অসুস্থ শ্বশুর, শাশুড়ির জ্বালাময় মুখ, কষ্টে মানুষ হওয়া করুণ মুখের ছোট্টো দেবর আর স্বামীহারা ননদের চেহারা দেখে বুঝতে তার এতটুকু সময় লাগে নি—যুদ্ধের তো কেবল শুরু মাত্র। এত অনিশ্চয়তার মাঝেও যেন সব উদ্বেগ এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল ওই রাতটাতে। যখন সুজন এর মুখটা চাদের আলোতে প্রথম দেখেছিল সে। ১৫ বছরের নিহার ভালোবাসার অর্থ বুঝতো কি না কে জানে, যদি না-ই বুঝতো তাহলে আজও ওই মুখটা কিভাবে পরিষ্কার মনে আছে তার। সুন্দর সরল সাবলীল মুখটা তার দিকে কী অবাক চোখেই না তাকিয়ে ছিল। কতক্ষণ দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল আজ আর তা বলা সম্ভব না! সুজন ই  প্রথম কথা বলেছিল, থেমে থেমে, নরম গলায়, “তোমারে দেখলে বুকের মধ্যে ব্যথা করে গো নিহার।” নিহারের পুরো শরীরটা যেন কেঁপে উঠেছিল এই একটি বাক্যে। লজ্জা তখনও এক বিন্দু কমে নি তার। অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলো সে, “কেনো?” সুজনের সেই নরম সুর, “এতো সুন্দর, এতো স্বপ্নের মতো যে ভয় হয় তোমারে আমি ভালো রাখতে পারবো কি?” কেমন করে এতো মন্ত্রমুগ্ধ একটা বাক্য সুজন  সেদিন বলেছিল আজও নিহার ভেবে পায় না। ঠিক সেই মুহূর্তেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিল সে—জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন এই মানুষটাকে ছেড়ে সে কখনো, কোনোদিন কোথাও যাবে না। ছেলে মেয়েগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল। একে একে শ্বশুর শাশুড়ির মৃত্যু যেন আরো পরিণত,আরো শক্ত বানিয়ে দিলো নিহারকে। অভাবের সংসারে অভাবটা অবশ্য কোনোদিন গেল না। বাচ্চারা বড় হলো, তাদের খরচ আরো বাড়লো। মানুষের বাড়ি কাজ করে, সবজি বেচে তাদের চাওয়া পূরণ করতে লাগলো নিহার। সবুজের পড়াশোনা হলো না। শ্যামল কোন রকম  পড়াশোনা করে শহরে চলে গেল। মেয়েটাকে বিয়ে দিলো নিহার। আর সজল? কলেজ পাশ করে একদিন নিহারের কাছে এসে বসে ছিল নিচু হয়ে। নিহার তার পিঠে হাত দিয়ে বলেছিল, —“কি হয়েছে বাপ আমার?” কান্না জড়ানো গলায় সজল বলেছিল, —“ইউরোপে স্কলারশিপ হয়েছে আমার। ওখানেই যেতে চাই আমি।” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সে ছেলের দিকে। এই কি তার সেই ছোট্ট সজল? অনেক বছর আগে নদীর ধারে বসে অভিমানে চলে যেতে চেয়েছিল যে?  বুনি এসে জোরে একটা ডাক দিলো, —“দাদি, তোমার চশমা। সেই কখন থেকে ডাকছি তোমায়। কি এত ভাবছো তুমি?” নিহার চোখ তুলে বুনির দিকে তাকালো। তারপর হাত বাড়িয়ে চশমাটা নিলো। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো, —“কিছু না রে।” —“তোমার নামে খাম এসেছে আবার। এ ঘরে দিয়ে যাবো?” নিহার একটু হাসলো। —“আবার? এই মাসেই না একবার এলো?” বিনু মাথাটা সামান্য নেড়ে বললো, —“কি আর বলবো, তোমার পাগল ছেলে, মা বলতে অন্ধ।” নিহার হাসতে হাসতে ঘড়ির দিকে তাকালো। ১০টা বাজতে যাচ্ছে। এখনই ফোন আসবে।  ফোন ধরেই ধমকের সুরে বললো নিহার, —“তুই আবার টাকা পাঠিয়েছিস? করবো কি আমি এত টাকা নিয়ে? বাড়িটার ও তো ৩ তালা অব্ধি হয়ে গেলো, তুই কি পাগল রে বাপ?” সজল হাসলো। লজ্জিত সুরে বললো, —“তোমার যা ইচ্ছে করো মা। যতই বকো আমাকে তুমি,আমি শুনবো না। বলেছিলে বুনির বিয়ের কথা ভাবছো, তখনও তো লাগতে পারে। শ্যামল ভাই অসুস্থ বলেছিলে, যদি তার কিছু লাগে?”  নিহারের চোখে পানি। আজকাল শুধু চোখে পানি আসে। চোখ মুছে বললো, —“কবে কবে এত বড় হয়ে গেলি রে?” —“তুমি-ই তো বড় করলে মা…তুমি ই জানো"  নিহার শব্দ করে হাসলো। কয়জন ছেলে-ই বা মনে রাখে, মায়েরাই তো সন্তানকে বড় করে…

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow