শৈশবের চাকা ঘোরে জীবিকার টানে
বাতাস খেতে খেতে বাসায় ফিরবো। সেই ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তায়। ছোট্ট একটি ছেলে অটোরিকশা চালিয়ে সামনে এসে বললো, ‘আপা যাবেন?’ শিশুশ্রম! খানিকটা দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত উঠে পড়লাম তার রিকশায়। বললাম, ‘আস্তে চালাবে, সামনে- পেছনে দেখে যাবে।’ বাচ্চা ছেলেটা বিনয়ের সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। শহরের কোলাহল কেটে কেটে রিকশা চলতে শুরু করলো। হঠাৎ মনে হলো যে ক্লান্তি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়েছিলাম, সেটা আর নেই। কেন? অন্য কোনো কারণ নয়, রিকশার চালকের আসনে বসা ছোট্ট ছেলেটির মুখের হাসিই যেন মনটা হালকা করে দিলো। সেই হাসিতে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না ক্লান্তির ছাপ। ছিল শুধু এক ধরনের নির্ভেজাল সারল্য। ওর নাম আবু তালহা, বয়স ১৩ বছর। পড়ে ক্লাস ফাইভে। পরিবারের সদস্য ছ’জন। চার ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। ওর মা ঘরেই থাকেন, ছোটদের দেখাশোনা করেন। বাবা রিকশা চালান। কিন্তু এই শহরে একজন মানুষের আয়ে সংসার চালানো যে কতটা কঠিন, তা সেও জেনে গেছে। তাই পরিবারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে ছোট্ট কাঁধে। স্কুল শেষ করে অন্য শিশুরা যখন মাঠে ছুটে যায়, খেলাধুলায় মেতে ওঠে, আবু তালহা তখন উঠে বসে তার তিন চাকার যানে। ক্লান্তি, শখ কিছুই যেন তার জীবন
বাতাস খেতে খেতে বাসায় ফিরবো। সেই ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তায়। ছোট্ট একটি ছেলে অটোরিকশা চালিয়ে সামনে এসে বললো, ‘আপা যাবেন?’
শিশুশ্রম! খানিকটা দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত উঠে পড়লাম তার রিকশায়। বললাম, ‘আস্তে চালাবে, সামনে- পেছনে দেখে যাবে।’ বাচ্চা ছেলেটা বিনয়ের সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। শহরের কোলাহল কেটে কেটে রিকশা চলতে শুরু করলো।
হঠাৎ মনে হলো যে ক্লান্তি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়েছিলাম, সেটা আর নেই। কেন? অন্য কোনো কারণ নয়, রিকশার চালকের আসনে বসা ছোট্ট ছেলেটির মুখের হাসিই যেন মনটা হালকা করে দিলো। সেই হাসিতে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না ক্লান্তির ছাপ। ছিল শুধু এক ধরনের নির্ভেজাল সারল্য।
ওর নাম আবু তালহা, বয়স ১৩ বছর। পড়ে ক্লাস ফাইভে। পরিবারের সদস্য ছ’জন। চার ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। ওর মা ঘরেই থাকেন, ছোটদের দেখাশোনা করেন। বাবা রিকশা চালান। কিন্তু এই শহরে একজন মানুষের আয়ে সংসার চালানো যে কতটা কঠিন, তা সেও জেনে গেছে। তাই পরিবারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে ছোট্ট কাঁধে।
স্কুল শেষ করে অন্য শিশুরা যখন মাঠে ছুটে যায়, খেলাধুলায় মেতে ওঠে, আবু তালহা তখন উঠে বসে তার তিন চাকার যানে। ক্লান্তি, শখ কিছুই যেন তার জীবনে তেমন জায়গা পায় না। তবুও তার কোনো অভিযোগ নেই। বরং প্রতিটি কথায় ফুটে উঠছিল দৃঢ়তা।
আবু তালহা
এই গল্প শুধু আবু তালহার একার নয়। এটি বাংলাদেশের বহু শিশুর জীবনের গল্প, যারা জীবনের শুরুতেই বুঝে যায় দায়িত্বের ভার কী? যাদের শৈশব কেটে যায় পথে, শ্রমে, কোনো না কোনো সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। অথচ এই বয়সে তাদের থাকার কথা ছিল স্কুল ও খেলার মাঠে।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম এক নির্মম বাস্তবতা। অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, শিক্ষার সুযোগের অভাব, সব মিলিয়ে অনেক শিশুই বাধ্য হয় কাজ করতে। যদিও শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ, তবুও বাস্তবতার চাপে সেই আইন অনেক সময়ই কার্যকর হয় না। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে শিশুদের উপার্জন হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা হারিয়ে ফেলে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ। দীর্ঘ সময় কাজ করা, পড়াশোনার প্রতি অনীহা, এমনকি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, তারা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এমন এক জীবনে, যেখানে স্বপ্ন দেখার সুযোগ সীমিত।
এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও আবু তালহার মতো শিশুরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অন্যরকম শক্তির গল্প। তাদের হাসি, তাদের পরিশ্রম, তাদের দায়িত্ববোধ সবকিছুই আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। আমরা যারা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল জীবনে অভ্যস্ত, আমাদের কাছে এই গল্পগুলো শুধু আবেগের নয়, বরং দায়বদ্ধতারও।
আমাদের কি কিছুই করার নেই? নিশ্চয়ই আছে। প্রথমত, দরকার সচেতনতা। শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক হিসেবে না দেখে, একে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি দরকার এমন উদ্যোগ, যেখানে দরিদ্র পরিবারগুলো আর্থিক সহায়তা পাবে, যেন তাদের শিশুদের কাজ করতে না হয়। শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, স্কুলে টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করা এসবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জেবুন নাহার বলেন, ‘দেশে প্রতিনিয়তই বেড়ে চলছে শিশুদের মানসিক সমস্যা, যার অন্যতম একটি কারণ শিশুশ্রম। তবে সচেতনতার অভাবে আমাদের দেশে শিশুদের মানসিক অবস্থা বিষয়ে তেমন কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না। যা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি স্বরুপ। আমরা ভুলেই গেছি আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। এখনও যদি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকবে না। তাই সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিককেই সচেতন হতে হবে।’
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষেরই এখানে ভূমিকা রয়েছে। আমরা চাইলে অন্তত একজন শিশুর পাশে দাঁড়াতে পারি। তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে পারি, কিংবা তার পরিবারের জন্য কিছু সহায়তা করতে পারি। ছোট ছোট উদ্যোগই একসময় বড় পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।
সেদিন রিকশা থেকে নামার সময় ভাড়ার সঙ্গে একটু বেশি টাকা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আবু তালহা বিনয়ের সঙ্গে বললো, ‘আপা, ভাড়া যত ততই দেন, বেশি লাগবে না।’ এই কথাটুকুই যেন আমাকে আরও বেশি নাড়া দিলো। তার আত্মসম্মানবোধ, তার সরলতা সবকিছুই মনে গেঁথে রইলো।
আরও পড়ুন:
জেএস/আরএমডি
What's Your Reaction?