শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব ঘিরে ব্যবসায়িক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মাত্র ২০ জন শ্রমিকের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ, বাধ্যতামূলকভাবে ভবিষ্যৎ তহবিলের ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু প্রস্তাবে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন শিল্প কারখানার মালিকেরা।
মালিকদের সংগঠন ফেডারেশন হিসেবে বাংলাদেশ অ্যামপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) বলছে, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার অবশ্যই সংরক্ষিত থাকা জরুরি। তবে একই সঙ্গে ব্যবসার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও অক্ষুণ্ন রাখা প্রয়োজন।
শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানী গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে বিইএফ এর নতুন কমিটির সঙ্গে সাংবাদিকদের আলাপ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই দ্বিমতের কথা জানায় ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন ১০১টি প্রস্তাবের মধ্যে ৯টি প্রস্তাবে তারা একমত হতে পারেননি। আলাপ-আলোচনা না করেই সরকার আইনটি গায়ের জোরে সংশোধন করতে চায়।
বিইএফের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গত ২৬ আগস্ট ৮৯তম ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) সভায় শ্রম আইন সংশোধনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় মালিকদের প্রতিনিধিরা সমঝোতামূলক অবস্থান নিলেও কিছু প্রস্তাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে নতুন প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাত্র ২০ জন শ্রমিকের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ তৈরি হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে একাধিক নাম সর্বস্ব ইউনিয়নের জন্ম দিতে পারে। এতে বারবার ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, বিরোধ ও বিভাজন বাড়বে এবং উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতি সুষ্ঠু শিল্প সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলেও জানান তিনি।
বিইএফ সভাপতি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া অতিরিক্ত সরল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তারা সাধারণত স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশে বিনিয়োগ করতে চান। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে।
বিইএফের সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকের অনুপাতে কমাতে চাই। কারখানার আকার যাই হোক না কেনো ২০ জন নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন করা নিয়ে আমাদের কথা আছে। কিছুটা বিশ্লেষণ করে যেমন ৩ হাজার শ্রমিক হলে কী হবে, ৫ হাজার হলে কী হবে এরকম একটা প্রস্তাব আমরা সরকারের কাছে দিয়েছি। শ্রম সংস্কার কমিশনের সভাপতির সঙ্গে আমরা বিষয়টি আলাপ করছি। গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি শ্রমিক নেতারাও ২০ জনের বিষয়টি নিয়ে একমত হননি।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ২০ হলেই ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে এমন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুৎসাহিত হবে। ভিয়েতনামে একটি মাত্র ট্রেড ইউনিয়ন, তাও এটা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত। তাহলে সেখানে কী শ্রমিকদের অধিকার নেই? নিশ্চয় আছে। তাহলে আমাদের কেন কম্বোডিয়ার মতো পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হবে। এটা কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়।
‘টিসিসির বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা একতরফাভাবেই এটা করতে চায়। আমরা বলেছি আপনারা করতে পারেন, তবে এর চরম বিরোধিতা করছি। আপত্তি জানাচ্ছি, আমাদের নোট অব ডিসেন্ট আপনারা লিখবেন’, যোগ করেন তিনি।
ব্যবসায়ী এই নেতার দাবি, দায়িত্বশীল শ্রমিক নেতৃবৃন্দও ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়টি সমর্থন করেন না। তাহলে কার প্রয়োজনে এটা করা হচ্ছে। ইইউ ও আইএলও প্রেসক্রিপশনে কী এটা করা হচ্ছে? তারা প্রেসক্রিপশন দিলেই কী সরকার এটা মেনে নেবে। দেশের কী নিজস্বতা নেই।
সরকার ভবিষ্যৎ তহবিল সোশ্যাল নেটওয়ার্কে নেবে বলছে। আইনে আছে ৭০ শতাংশ শ্রমিক যদি লিখিত আবেদন করে যে ভবিষ্যৎ তহবিল চায় তাহলে ওই শিল্পে ভবিষ্য তহবিল চালু করতে হবে। এত বছর ধরে এই আইন থাকা স্বত্বেও শ্রমিকরা আবেদন করেননি। শ্রমিকরা ভবিষ্যৎ তহবিল চান না। কারণ এটা হলে কারখানা মালিককে যা দিতে হয়, শ্রমিকদেরও তা দিতে হয়। এখানে আইনের সংশোধন করা যেতে পারে ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশ করা যেতে পারে। কিন্তু তারা চান ১০০ জন শ্রমিক হলেই সেখানে ভবিষ্য তহবিল চালু করতে হবে।
বিইএফের সেক্রেটারি জেনারেল ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা শ্রমিক কিংবা সরকারে বিপক্ষে নই। সুন্দর ও সুষ্ঠু শ্রম বাজার তৈরি হোক এটা আমরা চাই।
এসএম/এমআইএইচএস/জেআইএম