শ্রাবণের বৃষ্টিতে রুনা লায়লার সুরের বর্ষণ
বাইরে ঝরছিল শ্রাবণের বৃষ্টি। আর ভেতরে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ঝরছিল সুরের বৃষ্টি। সেই সুরের উৎসে ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। তার কণ্ঠে একের পর এক কালজয়ী গান যেন মনে করিয়ে দিল, সময়ের হিসাব বয়স দিয়ে হয়, শিল্পের নয়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু গান গেয়ে আসছেন না; প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুভূতি, প্রেম, বেদনা, দেশপ্রেম আর স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন। তাই শুক্রবারের সেই একক কনসার্ট ছিল শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, ছিল এক জীবন্ত ইতিহাসের সঙ্গে দর্শকের পুনর্মিলন। 'শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব'—অনুষ্ঠানের শিরোনামটিই যেন রুনা লায়লার শিল্পীজীবনের সারসংক্ষেপ। সত্যিই তো, এত বছর পরও তিনি সেই শিল্পী, যিনি নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য গান গেয়ে চলেছেন। মঞ্চে ওঠার পরই ভাষা আন্দোলন ও দেশের জন্য আত্মত্যাগীদের স্মরণ করে দেশাত্মবোধক গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন তিনি। এরপর একে একে শোনান তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শ্রোতাপ্রিয় গানগুলো। 'শিল্পী আমি', 'গানেরই খাতায়', 'যখন থামবে কোলাহল', 'যে জন প্রেমের ভাব জানে না', 'বন্ধু তিন দিন', 'অনেক বৃষ্টি ঝরে'—প্রতিটি গান যেন
বাইরে ঝরছিল শ্রাবণের বৃষ্টি। আর ভেতরে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ঝরছিল সুরের বৃষ্টি। সেই সুরের উৎসে ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। তার কণ্ঠে একের পর এক কালজয়ী গান যেন মনে করিয়ে দিল, সময়ের হিসাব বয়স দিয়ে হয়, শিল্পের নয়।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু গান গেয়ে আসছেন না; প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুভূতি, প্রেম, বেদনা, দেশপ্রেম আর স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন। তাই শুক্রবারের সেই একক কনসার্ট ছিল শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, ছিল এক জীবন্ত ইতিহাসের সঙ্গে দর্শকের পুনর্মিলন।
'শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব'—অনুষ্ঠানের শিরোনামটিই যেন রুনা লায়লার শিল্পীজীবনের সারসংক্ষেপ। সত্যিই তো, এত বছর পরও তিনি সেই শিল্পী, যিনি নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য গান গেয়ে চলেছেন।
মঞ্চে ওঠার পরই ভাষা আন্দোলন ও দেশের জন্য আত্মত্যাগীদের স্মরণ করে দেশাত্মবোধক গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন তিনি। এরপর একে একে শোনান তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শ্রোতাপ্রিয় গানগুলো। 'শিল্পী আমি', 'গানেরই খাতায়', 'যখন থামবে কোলাহল', 'যে জন প্রেমের ভাব জানে না', 'বন্ধু তিন দিন', 'অনেক বৃষ্টি ঝরে'—প্রতিটি গান যেন দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। আর শেষ গান 'দমাদম মাস্ত কালান্দার' পুরো মিলনায়তনকে পরিণত করেছিল এক সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে।
এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠা—রুনা লায়লার শ্রোতা শুধু তার সমসাময়িকেরা নন। মিলনায়তনে যেমন ছিলেন প্রবীণ শ্রোতা, তেমনি ছিলেন তরুণ-তরুণীও। অনেকেই হয়তো তার গান শুনে বড় হননি, কিন্তু তার গান শুনতে এসেছেন, তার কণ্ঠকে কাছ থেকে অনুভব করতে এসেছেন। এটাই একজন কিংবদন্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য—প্রজন্মের ব্যবধানকে অতিক্রম করে যাওয়া।
গানের পাশাপাশি নিজের জীবনের গল্পও শোনালেন রুনা লায়লা। বললেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে করাচিতে প্রথমবার মঞ্চে ওঠার গল্প। বড় বোন অসুস্থ হয়ে পড়ায় হঠাৎ করেই ছোট্ট রুনাকে গান গাইতে হয়েছিল। সেই আকস্মিক মুহূর্তই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রথম মঞ্চাভিষেক। কে জানত, সেই ছোট্ট মেয়েটিই একদিন বাংলা, হিন্দি, উর্দুসহ ১৮টি ভাষায় দশ সহস্রাধিক গান গেয়ে উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখবেন!
মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি দশ সহস্রাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতুসহ ১৮টি ভাষায় গান গেয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন উপমহাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে। আজ ৬২ বছর পরও তার কণ্ঠে ক্লান্তির ছাপ নেই, মঞ্চে উপস্থিতিতে নেই কোনো ভাটা। বরং সময়ের সঙ্গে তার শিল্পীসত্তা আরও পরিণত হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে এটিই ছিল তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক কনসার্ট। এই তথ্যটিও বিস্ময় জাগায়। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য দেশে, অসংখ্য মঞ্চে গান গাইলেও দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক মঞ্চে পূর্ণাঙ্গ একক আয়োজন হলো এত বছর পর। বিষয়টি নিয়ে নিজেও রসিকতা করে বললেন, 'অবশেষে ডেকেছে, এটাই তো!' কথাটির মধ্যে যেমন হাস্যরস ছিল, তেমনি ছিল এক ধরনের আক্ষেপও।
এই অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর সামাজিক বার্তা। টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। অর্থাৎ, এই আয়োজন শুধু সংগীতের উদ্যাপন নয়, মানবিক দায়বদ্ধতারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রুনা লায়লাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। এসময় দর্শকদের দীর্ঘ করতালি, দাঁড়িয়ে অভিবাদন আর প্রতিটি গানের পর উচ্ছ্বাসই হয়তো ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মাননা। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী রুনা লায়লার হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, 'আপনার কণ্ঠে প্রতিটি গান সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আপনার শিল্পসাধনা বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদা উজ্জ্বল করেছে।'
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, ‘দেশের বরেণ্য শিল্পীদের যথাযথ সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটি সেই প্রচেষ্টারই অংশ।’
আজকের ডিজিটাল যুগে, যখন সংগীতের ধারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখনও রুনা লায়লার গান একই আবেগে মানুষকে স্পর্শ করে। কারণ, ভালো গান কখনো পুরোনো হয় না; প্রকৃত শিল্পীরও অবসর হয় না।
শ্রাবণের সেই সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমেছিল, কিন্তু থামেনি সুরের বর্ষণ। জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন ছেড়ে দর্শকেরা যখন ঘরে ফিরছিলেন, তখন তাদের সঙ্গে ফিরছিল আরও একটি উপলব্ধি— কিংবদন্তিরা শুধু গান গেয়ে যান না, তারা সময়কে অতিক্রম করে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন। আর সেই কারণেই রুনা লায়লা শুধু একজন শিল্পীর নাম নন; তিনি বাংলা গানের এক চলমান ইতিহাস।
What's Your Reaction?