শ্রীপুর কোয়ারিতে পাথর লুটের আড়ালে বালুও সাবাড়

5 hours ago 5

সিলেটের অধিকাংশ কোয়ারির পাথর লুটপাট প্রায় শেষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সাদা পাথরের চুরি সামনে এলেও আড়ালে থাকা অন্য কোয়ারিগুলোর অবস্থাও করুণ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে লুট। আবার চুরির আড়ালেও হচ্ছে আরেক চুরি।

সিলেটের শ্রীপুর বালু মিশ্রিত কোয়ারির পাথর লুটের পর সাবাড় করা হয়েছে বালু। স্থানীয় প্রভাবশালী আর প্রশাসনের যোগসাজশে এসব কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলছে বলে অভিযোগ। প্রায় সব পাথর আর বালু যখন শেষের পথে তখন টনক নড়ে প্রশাসনের। যদিও নামমাত্র অভিযান ছাড়া দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।

সিলেট শহর থেকে জাফলংয়ের পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় টানা দুই ঘণ্টার পথ। শ্রীপুর বাজারে পৌঁছানোর পরে মিনিট দশেক হাঁটলেই শ্রীপুর বালু মিশ্রিত পাথর কোয়ারি। পাহাড়ি পথ। পথে পথে ফেলে রাখা হয়েছে পাথর। মূলত বৃষ্টিতে পানি জমে হাঁটার উপায় থাকে না বলেই সরু রাস্তাজুড়ে ফেলে রাখা হয়েছে এসব পাথর।

শ্রীপুর কোয়ারিতে পাথর লুটের আড়ালে বালুও সাবাড়

কোয়ারিতে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় কিছু লোকজন ভুল পথ দেখিয়ে দেয়। তবে কাছে সঠিক তথ্য থাকায় স্থানীয়দের পরামর্শ উপেক্ষা করেই সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়া। পাথরে ঢাকা আঁকাবাকা পথ পেরিয়ে নদীর দেখা মিললো। মেঘালয়ের কোলঘেঁষা অপরূপ সে সৌন্দর্য।

অভিযানে আমরা বালু ও পাথর জব্দ করেছি। এর মধ্যে নিলামযোগ্য বালু নিলামে দিয়েছি। সব মিলিয়ে ২৮ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করেছি। পাথর যেগুলো পেয়েছি সেগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য রেখেছি।-সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জর্জ মিত্র চাকমা

পহাড়ি পথে প্রবেশ করা মাত্রই গাছের ফাঁক গলে দেখা গেলো, ট্রাকে বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশেই বেশ কিছু স্তূপ আকারে রাখা পাথর। মোট ৩০টির মতো ট্রাকে বালু সরিয়ে নিতে দেখা যায়। এখানে সাধারণত পর্যটক আসে না। তাই অপরিচিত লোক দেখলেই স্থানীয়ভাবে পাথর লুটের সঙ্গে জড়িতরা অস্বাভাবিক আচরণ করেন। কেন এসেছি, কী কারণে এসেছি, এখানে তেমন কিছু নেই, ফিরে যান, সামনে রাস্তা খারাপ—এমন অনেক কথা শুনতে হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদী আর পাহাড় থাকা এ এলাকায়

কাঁটাতারের বেড়া নেই। ভারত-বাংলাদেশ সীমানা পিলার নদীর ওপারে। মেঘালয়ের পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঝরনার জলধারা এসে মিশেছে নদীতে। সীমানা পিলারের ওপারে ভারতের অংশে পাথর দেখা গেলেও বাংলাদেশের অংশে পাথর নেই। স্থানীয় পাথরখেকোরা প্রথমে পাথর লুট করেছে। এরপর পাথরের নিচে থাকা বালু সরিয়ে নিয়েছে অবৈধভাবে।

যেখান থেকে পাথর আর বালু উত্তোলন করা হয়েছে তার পাশেই বিজিবি ক্যাম্প। কয়েকজন বিজিবি সদস্যকে টহল দিতে দেখা যায়। এই প্রতিবেদকসহ আরও কয়েকজনকে দেখে একজন বিজিবি সদস্য এগিয়ে আসেন।

শ্রীপুর কোয়ারিতে পাথর লুটের আড়ালে বালুও সাবাড়

টহলরত ওই বিজিবি সদস্য জানান, ভোলাগঞ্জে পাথর লুটের পর তারা এখন সতর্ক। টহল বাড়ানো হয়েছে। আগের চেয়ে এখন বেশি টহল দিতে হয়। ট্রাকে করে যেসব বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সেগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জব্দ করে নিলামে বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে এসব এলাকার ছবি তুলতে নিষেধ করেন তিনি।

শ্রীপুর পাথর কোয়ারি থেকে সংগ্রহ করা বালু লাল। বাজারে এর চাহিদাও বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব পাথর আর বালু বিক্রি করেছেন। পুলিশ-বিজিবির সামনে এসব লুটপাট হলেও প্রশাসন বাধা দেয়নি।

লুট করা বালু কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে পারায় লাভ হয়েছে বেশি। বালু ব্যবসা খুব কাছ থেকে দেখেছেন এমন একজন স্থানীয় বলেন, শ্রীপুরে যে বালু পাওয়া যায় সেটি মূলত সিলেকশন বালু। উত্তোলন ও পরিবহন খরচসহ প্রতি ফুট ১৯ থেকে ২০ টাকা খরচ পড়ে। সেই বালু বাইরে বিক্রি করা যায় ৪০ টাকা করে। দুই গুণের বেশি লাভ হওয়ায় প্রভাবশালীরা বালু লুট করছেন।

শ্রীপুর পাহাড় মৌজায় ১৬ এবং ১৮ নম্বর দাগে ১৫ দশমিক ৯ একর, শ্রীপুরের ১৮ এবং ১৯ নম্বর দাগে ১৫ দশমিক ৩৩ একর, আসামপাড়া মৌজার ১৪ এবং ১৮৮ নম্বর দাগে ২৪ দশমিক ৭৩ একর জমি রয়েছে। সব মিলিয়ে শ্রীপুর বালু মিশ্রিত পাথর কোয়ারির মোট জমির পরিমাণ ৫৫ দশমিক ৯৬ একর।

জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাসার মোহাম্মদ বদরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুলিশের সামনে পাথর লুট হওয়ার সুযোগ আছে? এসব আমার জানা নেই।’

এ এলাকার দায়িত্বে থাকা বিজিবি সিলেট-৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হককে একাধিক বার ফেন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

শ্রীপুর কোয়ারিতে পাথর লুটের আড়ালে বালুও সাবাড়

জানতে চাইলে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জর্জ মিত্র চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘অভিযানে আমরা বালু ও পাথর জব্দ করেছি। এর মধ্যে নিলামযোগ্য বালু নিলামে দিয়েছি। সব মিলিয়ে ২৮ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করেছি। পাথর যেগুলো পেয়েছি সেগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য রেখেছি। অনেকগুলো পাথর একসঙ্গে প্রতিস্থাপন করা যাবে না। এজন্য ধাপে ধাপে আমরা পাথরগুলো পানিতে এবং যেখানে যেখানে ছিল সেসব জায়গায় প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করবো।’

যেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে তার পাশেই বিজিবি ক্যাম্প। সেখানে এরকম পাথর-বালু লুটের ঘটনা কীভাবে ঘটলো — এসবের কারণ অনুসন্ধানে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘হ্যাঁ পাশেই বিজিবি ক্যাম্প। আপনি (সাংবাদিক) যেহেতু সরেজমিনে এসেছেন, নিশ্চয়ই দেখেছেন তারা যেখান থেকে পাথর নিয়ে এসেছে এটা মূলত ভারতের অংশ। ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের অংশ থেকে তারা পাথরগুলো নিয়ে আসে। আমাদের যে অংশ সেখান থেকে মূলত অত বেশি পাথর পায় না তারা। এখানে আপনি যতগুলো পাথর দেখেছেন সেগুলো ভারত থেকে নৌকাযোগে নিয়ে আসা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। এমনও হয়েছে যে রাস্তা তৈরি করেছে সেই রাস্তা আমরা তৈরি করেছি। মামলা হয়েছে, জরিমানা হয়েছে। একসময় পাথর কোয়ারি ছিল ইজারাভুক্ত। ইজারা বন্ধ হওয়ার পরে যে পাথর ছিল সেগুলো ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে। আমরা অভিযানের মধ্যেই আছি, আমাদের অভিযান নিয়মিত চলবে।’

এনএস/এএসএ/এমএফএ/এএসএম

Read Entire Article