তীব্র গরমের মধ্যে আবারও বেড়েছে সিলেটের বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সিলেটে নগর থেকে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামে দিন-রাতজুড়ে একের পর এক লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কয়েক মিনিট থেকে কোথাও এক-দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা।
পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, অনলাইনভিত্তিক কাজ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলছেন, সাময়িক সমাধান নয়, সিলেটের বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সিলেটে বিদ্যুতের বরাদ্দ কম এসেছে। তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে বিভাগে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ না থাকলে সেটি মূলত স্থানীয় কারিগরি ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে।
নগর থেকে গ্রাম-সবখানেই একই চিত্র
নগরীর পাঠানটুলা, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, দাঁড়িয়াপাড়া, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেট, শেখঘাট, উপশহর, কুমারপাড়া, মীরাবাজার ও টিলাগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই অবস্থা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও। গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো পূর্বঘোষণা বা নির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়া যখন-তখন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ থাকছে না। ফলে গরমের পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও বাড়িয়ে তুলছে মানুষের ভোগান্তি।
পড়াশোনা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার প্রস্তুতি ও নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার ডেভেলপার, কলসেন্টার কর্মীসহ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নিয়োজিতদের কাজও বিঘ্নিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে রাউটার বন্ধ হয়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, মাঝপথে থেমে যাচ্ছে অনলাইন মিটিং ও বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ। এতে অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ব্যবসায় বাড়ছে লোকসান
বিদ্যুৎ সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। ছোট শিল্পকারখানা, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, সেলুন, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফটোকপি ও প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানসহ নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আবার জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।
নগরীর লামাবাজারের ব্যবসায়ী নাসিম হোসেন বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিন জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচ বাড়ছে। অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতারা দোকান ছেড়ে চলে যান। এতে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
গৃহস্থালি ও স্বাস্থ্যসেবায়ও দুর্ভোগ
লোডশেডিংয়ের কারণে গৃহিণীদের রান্না, পানি উত্তোলন, খাবার সংরক্ষণসহ নিত্যদিনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বড় হাসপাতালগুলো জেনারেটরের মাধ্যমে সেবা চালিয়ে নিলেও ছোট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগীসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য, দুই ধরনের চিত্র
পিডিবি সূত্র জানায়, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সিলেটে বিদ্যুতের বরাদ্দ কম এসেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার হিসাবে পিডিবির আওতাধীন এলাকায় চাহিদা ছিল ২১১ মেগাওয়াট। বিপরীতে ৫৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। তীব্র গরমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, বর্তমানে সিলেট বিভাগে ৫৯৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। তাই বিভাগজুড়ে কোনো পরিকল্পিত লোডশেডিং নেই। কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে তা মূলত স্থানীয় ফিডারের কারিগরি ত্রুটি, খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে হচ্ছে।
ক্ষোভে সাধারণ মানুষ
নগরীর পাঠানটুলার বাসিন্দা রাসেল আহমদ বলেন, দিনে-রাতে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে। কোনো সময়সূচি না থাকায় কখন বিদ্যুৎ থাকবে, আর কখন যাবে তা বোঝা যাচ্ছে না। দ্রুত সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান তিনি।
গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাট আরও বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রৌয়াইল গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বাছিদ সজলু বলেন, পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক হওয়াই আমাদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে করে মানুষের জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার স্কুল শিক্ষক জাহাঙ্গীর জয়েস কালবেলাকে বলেন, বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
এ ব্যাপারে সমাজ অনুশীলন সিলেটের সদস্যসচিব মুক্তাদীর আহমদ বলেন, বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ সংক্ষুব্ধ। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে জনঅসন্তোষে তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
ব্যবসায়ীদের দাবি বিল ঠিকই নেয় বিদ্যুৎ অফিস, সেবা নেই
সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন কালবেলাকে বলেন, গত দুই সপ্তাহ থেকে এক মাস ধরে সিলেটে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নগরবাসীর দুর্ভোগও চরমে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটে লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি মনে হচ্ছে। অথচ মাস শেষে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও বিলের কোনো কমতি থাকে না। সিলেটের বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদারকি কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও নগরবাসীকে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিহার করে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক নেতাদেরও একই দাবি
ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও সিলেটের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান দাবি করেছেন। তাদের মতে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন বৃদ্ধি, সিলেট অঞ্চলের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লোডশেডিং পরিচালনা এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের তথ্য দ্রুত জানাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সিলেট জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরেশ চন্দ্র মন্ডল কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে সিলেট বিভাগে বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বিভাগের ৫৯৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, ফলে কোথাও লোডশেডিং নেই। কোথাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে সেটি মূলত স্থানীয় ফিডারের কারিগরি ত্রুটি, খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় জাতীয় পর্যায়ে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হলেও সেগুলো পুনরায় চালু হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ফিডারের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিলে সেই বরাদ্দের মধ্যেই সরবরাহ সমন্বয় করতে হয়। গ্রাহকদের দ্রুত তথ্য দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কারিগরি কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে মাইকিংয়ের মাধ্যমেও জানানো হবে।
প্রকৌশলী পরেশ চন্দ্র মন্ডল বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন এবং গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে পল্লী বিদ্যুৎ বদ্ধপরিকর।
বিতরণ অঞ্চল, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন কালবেলাকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেড়ে গেলেই জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ কম আসে, ফলে লোডশেডিং করতে হয়। এনএলডিসি থেকে বিভিন্ন গ্রিডে বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সেই বরাদ্দ নির্ধারিত মেগাওয়াট অনুযায়ী বিভিন্ন সাবস্টেশনের মাধ্যমে গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার হিসাবে সিলেট পিডিবির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২১১ মেগাওয়াট, বিপরীতে ৫৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। তীব্র গরমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ সংকট শুধু সিলেটে নয়, সারা দেশেই রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঝড়-বৃষ্টি বা কারিগরি ত্রুটিতে কোথাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে দ্রুত তা সচল করতে প্রকৌশলী ও কর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানান।