সীমান্তে মাদক কারবারিতে নারীর দাপট
একসময় ধানক্ষেত, আমবাগান আর শান্ত সীমান্ত জীবনের জন্য পরিচিত মেহেরপুর এখন ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে এক ভয়াবহ অন্ধকার অর্থনীতিতে। অনলাইন জুয়ার বিস্তারের পর এবার সামনে এসেছে আরও গভীর সংকট— মাদক বাণিজ্য। আর এই চক্রের বিস্তারে উঠে এসেছে এক নতুন বাস্তবতা নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন, আদালতের নথি এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে জেলায় অন্তত তিন ডজন নারী মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রশাসনের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং গড়ে উঠছে সুসংগঠিত একটি মাদক সরবরাহ চক্র, যেখানে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে তুলনামূলক নিরাপদ বাহক হিসেবে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্য গ্রেপ্তার বা পলাতক হওয়ার পর ব্যবসার দায়িত্ব নিচ্ছেন স্ত্রী, মা কিংবা বোনেরা। ফলে মাদক কারবার এখন পরিবারভিত্তিক রূপ নিচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ভারত থেকে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইনের বড় চালান সীমান্তপথে মেহেরপুরে প্রবেশ করে। প্রথমে এসব মাদক সীমান্তসংলগ্ন গ্রামগুলোতে মজুত রাখা হয়, পরে সেখান থেকে জেলার বিভিন্ন
একসময় ধানক্ষেত, আমবাগান আর শান্ত সীমান্ত জীবনের জন্য পরিচিত মেহেরপুর এখন ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে এক ভয়াবহ অন্ধকার অর্থনীতিতে। অনলাইন জুয়ার বিস্তারের পর এবার সামনে এসেছে আরও গভীর সংকট— মাদক বাণিজ্য। আর এই চক্রের বিস্তারে উঠে এসেছে এক নতুন বাস্তবতা নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন, আদালতের নথি এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে জেলায় অন্তত তিন ডজন নারী মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
প্রশাসনের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং গড়ে উঠছে সুসংগঠিত একটি মাদক সরবরাহ চক্র, যেখানে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে তুলনামূলক নিরাপদ বাহক হিসেবে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্য গ্রেপ্তার বা পলাতক হওয়ার পর ব্যবসার দায়িত্ব নিচ্ছেন স্ত্রী, মা কিংবা বোনেরা। ফলে মাদক কারবার এখন পরিবারভিত্তিক রূপ নিচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ভারত থেকে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইনের বড় চালান সীমান্তপথে মেহেরপুরে প্রবেশ করে। প্রথমে এসব মাদক সীমান্তসংলগ্ন গ্রামগুলোতে মজুত রাখা হয়, পরে সেখান থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিবহন ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গৃহস্থালির জিনিসপত্র বা পারিবারিক চলাচলের আড়ালে সহজে মাদক পরিবহন সম্ভব হওয়ায় চক্রগুলো এই কৌশল বেছে নিচ্ছে।
বর্তমানে মেহেরপুরের আদালতে প্রায় ৪ হাজার ২০০টি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে নারী আসামির সংখ্যা দুই শতাধিক। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া নারীদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও হেরোইনের বড় চালান।
গাংনী উপজেলার এক ঘটনায় হেলেনা আক্তারের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া দেড়শ বোতল ফেনসিডিল সাম্প্রতিক সময়ের বড় চালানগুলোর একটি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, ‘মাদক ব্যবসা নারী-পুরুষ কারও জন্যই সহনীয় নয়। সম্প্রতি কিছু নারী সরাসরি মাদক পরিবহন ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন, যা উদ্বেগজনক। জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।’
তিনি আরও জানান, ‘অনেক ক্ষেত্রে মূল হোতারা আড়ালে থেকে পরিবারের নারী সদস্যদের ব্যবহার করছে। আবার কেউ কেউ দ্রুত অর্থের লোভে নিজেরাই এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছেন।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক বিদ্যুৎ বিহারি বলেন, ‘গত বছরে ৩১ জন নারী মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতাদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে।’
তিনি আরও জানান, ‘নারী সদস্যের অভাবে অনেক সময় অভিযান পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণে দপ্তরে নারী সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং গভীর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দারিদ্র্য, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন এবং সীমান্ত এলাকার দীর্ঘদিনের চোরাচালান সংস্কৃতি মিলিয়ে নারীরা এই পথে জড়িয়ে পড়ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লুবনা হক বলেন, ‘গ্রামীণ নারী এখন শুধু ভুক্তভোগী নয়, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ জগতের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। আর্থিক আকর্ষণ ও সামাজিক পরিবর্তন তাদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে।’
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী দিলারা পারভীন বলেন, ‘অনেক এলাকায় এই নারীরা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। টাকা ও ভয়— এই দুইয়ে তাদের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, কিছু এলাকায় মাদক ব্যবসায় জড়িত নারীদের সন্তানরাও ধীরে ধীরে একই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
মেহেরপুর জেলা পুলিশ, ডিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিল বেশি উদ্ধার হলেও ২০২৬ সালে হেরোইনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
সব মিলিয়ে মেহেরপুরে মাদক এখন আর শুধু অপরাধ নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন চালান ঢুকছে, আর সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় নারীদের যুক্ত করে গড়ে উঠছে নতুন নেটওয়ার্ক।
একসময় শান্ত কৃষিনির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত মেহেরপুর এখন অনেকের চোখে সীমান্তভিত্তিক এক অদৃশ্য অপরাধ অর্থনীতির পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে।
প্রশাসন অভিযানে সক্রিয় থাকলেও বাস্তবতা বলছে— এই লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়, পুরো সমাজের।
What's Your Reaction?