সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছে

তাদের কাছে কোনো নথি নেই। প্রমাণিত নয় যে তারা ভারতীয় নাকি বাংলাদেশি নাগরিক। দলে থাকছে বৃদ্ধ-শিশু কিংবা গর্ভবতী নারী। তাদের ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত। এ পারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাধা। অগত্যা সীমান্তের শূন্যরেখায় রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশ হয়ে উঠছে তাদের ঠিকানা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ-ইন প্রচেষ্টা বিজিবি রুখে দিলে শূন্যরেখায় আটকা পড়া ছাড়া উপায় থাকছে না এসব মানুষের। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন একটি ঘটনা মানুষের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। গত ৫ জুন গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে ঠেলে দেওয়া হয়। ওপারে ভারতের পাকুড় ও মালদাহ। বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় তারা টানা দুদিন শূন্যরেখায় পড়েছিলেন। পরে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। আরও পড়ুন ‘পুশ-ইনের শিকার’ ভারতীয় সেই রেশমা এখন আদালতে সীমান্ত এলাকায় গত বেশ কিছুদিন ধরেই পুশ-ইন নিয়ে এমন উত্তেজনা চলছে। বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে বারবার পতাকা বৈঠক, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা তো ঘটছেই। এমনকি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ মিলে বিএসএফ সদস্যদের ধাও

সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছে

তাদের কাছে কোনো নথি নেই। প্রমাণিত নয় যে তারা ভারতীয় নাকি বাংলাদেশি নাগরিক। দলে থাকছে বৃদ্ধ-শিশু কিংবা গর্ভবতী নারী। তাদের ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত। এ পারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাধা। অগত্যা সীমান্তের শূন্যরেখায় রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশ হয়ে উঠছে তাদের ঠিকানা।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ-ইন প্রচেষ্টা বিজিবি রুখে দিলে শূন্যরেখায় আটকা পড়া ছাড়া উপায় থাকছে না এসব মানুষের।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন একটি ঘটনা মানুষের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। গত ৫ জুন গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে ঠেলে দেওয়া হয়। ওপারে ভারতের পাকুড় ও মালদাহ। বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় তারা টানা দুদিন শূন্যরেখায় পড়েছিলেন। পরে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

সীমান্ত এলাকায় গত বেশ কিছুদিন ধরেই পুশ-ইন নিয়ে এমন উত্তেজনা চলছে। বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে বারবার পতাকা বৈঠক, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা তো ঘটছেই। এমনকি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ মিলে বিএসএফ সদস্যদের ধাওয়া করেছে- এমন ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।

সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছেশূন্যরেখায় নারী-শিশুসহ ছয়জন

চলতি বছর বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে প্রায় ১২০টি পুশ-ইন চেষ্টা ঠেকিয়েছে বিজিবি। এভাবে মানুষকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা আইনের চোখ কি বৈধ? কাগজপত্র না থাকা মানুষকে এভাবে শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কী? আর আন্তর্জাতিক আইনই বা কী বলছে?

পুশ-ইনকে অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসহ এ সংক্রান্ত সব ধরনের আইনে অবৈধ বলছেন বাংলাদেশ ও ভারতের মানবাধিকার কর্মীরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরাও দিয়েছেন একই মত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে এক দফা পুশ-ইনের ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক সরকার এলে বিষয়টি ঠিক হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও তা থামেনি। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনার মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই আবার ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে মানুষজনকে গোপনে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। কেন হঠাৎ ভারত এই পথে হাঁটছে?

কত মানুষকে পুশ-ইন

চলতি বছরের ৮ জুন কলকাতায় এক দলীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, মে মাসে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮শ জন লোককে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছে

এসব মানুষকে বাংলাদেশি ও অনুপ্রবেশকারী উল্লেখ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, বর্তমানে ৮৩৬ জন ওই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে আছেন।

তবে শুভেন্দুর এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে বিজিবি। বিজিবির দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিজিবি মোট ১২০টি পুশ-ইন প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে। যার মাধ্যমে প্রায় ৯শ মানুষকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানো হচ্ছিল।

৮ মাসে ২৩৫৬ জনকে পুশ-ইন

২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএসএফ পুশ-ইন করা ১ হাজার ৯৯৬ জন বাংলাদেশি, ১৩৪ জন ভারতীয় এবং ২২৬ জন বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকসহ (এফডিএমএন) মোট ২ হাজার ৩৫৬ জনকে বিজিবি আটক করে। পরবর্তীসময়ে তাদের মধ্যে ২ হাজার ১৬৫ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়।

২০২৫ সালে জেলাভিত্তিক পুশ-ইনের পরিসংখ্যান

চুয়াডাঙ্গা-৬২ জন, মেহেরপুর-১১৬ জন, সাতক্ষীরা-৩২ জন, কুষ্টিয়া-৯ জন, ঝিনাইদহ-২৬ জন, ফেনী-৬৯ জন, মৌলভীবাজার-৫৮০ জন, ময়মনসিংহ-৩৩ জন, নেত্রকোণা-৭৬ জন, পঞ্চগড়-১৯৬ জন, লালমনিরহাট-১৫০ জন, কুড়িগ্রাম-৯১ জন, খাগড়াছড়ি-১৫৩ জন, ঠাকুরগাঁও-১০২ জন, দিনাজপুর-৫২ জন, জয়পুরহাট-৪ জন, কুমিল্লা-১৩ জন, সিলেট-২৮৯ জন, হবিগঞ্জ-৪১ জন, সুনামগঞ্জ-৭৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৯২ জন, নওগাঁ-৪৬ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৭ জন ও শেরপুর-৩১।

পুশ-ইনের পর আবার ফেরতও নিচ্ছে ভারত

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর পুশ-ইনের শিকার মানুষের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিল। ওই বছর জুনে সোনা বানু নামে আসামের এক নারীকে বন্দুকের মুখে বিএসএফ ঠেলে পাঠালে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হন।

সোনা বানুর মতোই পুশ-ইনের শিকার হয়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবি ও তার পরিবারের ছয় সদস্য। কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ২০ অগাস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আলীনগর মহল্লা থেকে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে সীমান্ত অনুপ্রবেশ আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সোনালীকে ভারতে ফেরত পাঠায় বিজিবি।

সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছেসীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানরত কয়েকজন

সবশেষ গত ৮ জুলাই দীর্ঘ এক বছর পর কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন হওয়া শিশুসহ চার নাগরিককে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ফেরত নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গ্রামবাসী সহযোগিতা না করলে পুশ-ইন ঠেকানো সম্ভব হতো না

গত মে মাসের শেষ দিকে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলা সংলগ্ন সীমান্তের ভারত অংশে কয়েকশ মানুষ জড়ো হওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী সব জায়গায় নজরদারি বাড়ায় বিজিবি। এরপর থেকেই ঝিনাইদহ, যশোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলার সীমান্তে এই পুশ-ইন করা মানুষ থামাতে থাকে তারা।

বিজিবি জানায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিএসএফের এই পুশ-ইন করার প্যাটার্ন বা ঘটনাপ্রবাহটা প্রায় একই ধরনের।

বিজিবির নিজেদের নজরদারি, সামরিক ও বেসামরিক সূত্র আর গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বিজিবির একজন কর্মকর্তা জানান, কোনো সীমান্ত দিয়ে মানুষ প্রবেশ করানোর আগে বিএসএফ কিছু সিগন্যাল দেয়। সীমান্তের কাছের গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষ এই নজরদারি আর টহলের কাজে বিজিবিকে সহায়তা না করলে পুশ-ইন ঠেকানো সম্ভব হতো না।

নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকেও পুশ-ইন নিয়ে আলোচনা

গত মাসের শুরুতে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে পুশ-ইনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বৈঠকে বিজিবি ও বিএসএফের প্রধানরা তাদের বক্তৃতায় পুশ-ইন নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের নাগরিকসহ অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে দেশের আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর ভারতের নিজস্ব আইনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান যে প্রক্রিয়া আছে, সেটা অনুসরণ করে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ লোকজনকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

পুশ-ইন কেন অবৈধ সে বিষয়ে বিজিবি বক্তব্য তুলে ধরে সম্মেলনে। মানবাধিকার ও মানবিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করা হয় না বলে বাংলাদেশ জোরালোভাবে জানায়।

সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছেঝড়-বৃষ্টিতেও মানবেতর সময় কাটাতে হয় নাগরিকদের

বাংলাদেশ বলছে, ভারতসহ যে কোনো দেশ থেকে লোকজনকে ফেরত আনতে হলে তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর। কাজেই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মানবাধিকার এবং মানবিক প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক আইন মেনেই সেটা করতে হবে। তাই একতরফাভাবে লোকজনকে সীমান্তের ভেতরে জোর করে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। এটা করা অবৈধ। পাশাপাশি বাংলাদেশ রাতের অন্ধকারে সীমান্তে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর অপপ্রয়াস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

পুশ-ইন সংকটের সূত্রপাত

গত মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যে বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেয় বিজেপি। ২০১৯ সালের সংশোধিত এ আইনটি ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে কার্যকর করা হয়।

ওই আইন ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নথিহীন অমুসলিম অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে দেয়। সংশোধিত আইন অনুযায়ী একজন আবেদনকারীকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারি কর্তৃপক্ষের একটি নথি দিতে হবে, যাতে তার শিকড় বা উৎস প্রমাণিত হয়।

ওই আইনে স্থানীয় পুরোহিত বা স্থানীয় খ্যাতিসম্পন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে আবেদনকারীর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ারও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় পত্রিকা দ্য হিন্দু লিখেছে, যদিও নথিহীন অভিবাসীদের জন্য এ আইনটি আনা হয়েছিল, তবু বিধিমালায় আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে বেশকিছু নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার আগে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকত্ব আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গত ৯ মে চেয়ারে বসেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যারা সিএএ অন্তর্ভুক্ত নন, তাদের গ্রেফতার করে সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে। এভাবেই পুশ-ইন সংকটের সূত্রপাত।

সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুকে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, আইন কী বলছেআন্তর্জাতিক আইনে এভাবে পুশ-ইনের সুযোগ নেই

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুভেন্দুর কথার সরাসরি প্রতিবাদ না করলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কথা বলে আসছে বারবার।

গত ২৬ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অব্যাহত পুশ-ইনের বিষয়ে বলেন, আমরা পুশ-ইন ঠেকানোর জন্য সতর্ক আছি, আমাদের বিজিবি খুব প্রশংসনীয় কাজ করছে। প্রতিটি বর্ডারে যেখানে যেখানে পুশ-ইনের চেষ্টা হচ্ছে সেখানে তারা বাধা দিচ্ছে।

একই সঙ্গে সেখানে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক থাকলে সেই তালিকা দিতে কূটনৈতিকভাবে ভারতকে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা তাদের ন্যাশনালিটি ভেরিফাই করবো, ন্যাশনালিটি ভেরিফাই করার পর ডিপ্লোমেটিক চ্যানেলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আইনিভাবে আমরা তাদের ফেরত নিতে পারি। সেরকম কিছু ভারতীয় নাগরিক আমাদের এখানে পুশ-ইন হয়ে এসেছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের যথাযথ জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

বর্ডার ইস্যুটা দুই দেশের মধ্যে সব সময় একই রকম অবস্থায় থাকে তেমন নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে একটা নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচন পরবর্তী ওখানে স্টেট গভর্নমেন্ট আসীন হয়েছে। তাদের হয়তো কিছু নির্বাচনি এজেন্ডা ছিল। সে হিসেবে হয়তো তারা এটা প্রদর্শন করতে পারে যে, বিদেশি নাগরিক থাকলে ফেরত পাঠাবে। বাট এ প্রক্রিয়াটি (ঠেলে পাঠানো) যথাযথ নয়।

কী আছে আন্তর্জাতিক আইনে

আন্তর্জাতিক আইনে পুশ-ইন বা পুশব্যাকের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে এটি সাধারণত নন-রিফাউলমেন্ট বা অ-প্রত্যর্পণ নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩(১) ধারা অনুযায়ী নন-রিফাউলমেন্ট নীতি প্রযোজ্য। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে পাঠানো যাবে না যেখানে তার প্রাণ বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। এই নীতি অন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত।

পুশ-ইন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ফেরত পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থি। বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান পুশ-ইন নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই আইনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন।

তাদের অভিযোগ, নতুন আইনটি যথাযথ যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সীমান্তে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

তারা বলেন, এ ধরনের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর) এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে খামখেয়ালি বা বেআইনি আটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটকের কারণ জানানো ও দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্তে ফেরত পাঠানো বা পুশ-ইন করলে এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস, ১৯৬৩ (ভিসিসিআর) এর পক্ষভুক্ত। এর ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাকে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনকে অবহিত করতে হবে।

পুশ-ইনপুশ-ইন ঠেকাতে সোচ্চার বিজিবি

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

এছাড়া কনভেনশন অন দ্য রিডাকশন অব স্টেটলেসনেস ১৯৬১-এ রাষ্ট্রহীনতা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য হলো, রাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে কোনো ব্যক্তি যেন রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন।

বন্দুক দেখিয়ে নারী-শিশুদের বাংলাদেশে ঢোকানো হচ্ছে

বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর)। সংগঠনটির দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে বহু মানুষ দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবেতর অবস্থায় আটকা পড়েছেন।

এ ঘটনাকে গভীর উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করে এপিডিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিএসএফ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে, বিশেষত নারী ও শিশুদের, বিভিন্ন জেলার সীমান্তে নিয়ে গিয়ে জোর করে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বিজিবি তাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না।

সংগঠনটি বলেছে, এর ফলে সীমান্তের বহু জায়গায় ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ দিনের পর দিন এই মানুষেরা পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এদের মধ্যে গর্ভধারিণী নারী ও শিশুও আছে। তারা খাবার, পানি পাচ্ছে না। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় জলে এক ভয়ংকর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে তারা।

ভারতকে অবশ্যই আগে সঠিক নথিপত্র দিতে হবে

নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার যৌথ উদ্যোগে ‘সীমান্তে পুশ-ইন: বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নীতিগত বিকল্প’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনার হয়। এতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের নীতিকে আধিপত্যবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, একতরফা পুশ-ইন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। এমন কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে যাকে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা যাবে, তবে ভারতকে অবশ্যই আগে সঠিক নথিপত্র দিতে হবে এবং সম্মত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

বৃহৎ পরিসরে পুশ-ইন বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানান। ভারতীয় মুসলমানদের প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্তে পুশ করা উচিত নয়।

পুশ-ইন কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক আইনসম্মত প্রক্রিয়া নয়

পুশ-ইনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুশ-ইন কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক আইনসম্মত বা গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নয়। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হলে যথাযথ যাচাই শেষে বাংলাদেশ সরকারেরই তাকে ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা দায়িত্ব।’

‘ভারত যদি প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা দিয়ে ফেরত পাঠাতে চায়, তাহলে তা দুই দেশের স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত, সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন কোনো সমাধান নয়,’ বলেন এই আইনজীবী।

তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশের নাগরিক নন, তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে তারা বিদেশের কারাগারে বা অনিশ্চয়তায় না থাকেন। পুশ-ইন অবৈধ, তবে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের যাচাই করে দেশে ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

বলপূর্বক পুশ-ইন আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী আসিফ মুনির জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন অনুযায়ী যে কোনো দেশের সীমান্ত দিয়ে অন্য কোনো দেশে জোরপূর্বক কাউকে ঠেলে দেওয়া বা পুশ-ইন করার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই সুনির্দিষ্ট সীমান্তরেখা রয়েছে এবং তা অতিক্রম করার জন্য পাসপোর্ট ও ভিসার মতো আইনি প্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। এর বাইরে গিয়ে যে কোনো ধরনের বলপূর্বক পুশ-ইন আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’

যে কোনো সীমান্ত দিয়েই কেউ অনুপ্রবেশ করলে বা কাউকে পুশ-ইন করতে চাওয়া হলে, প্রথমে তার জাতীয়তা ভেরিফিকেশনের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর পতাকা বৈঠক ও যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে এবং প্রয়োজনীয় দলিলাদি (যেমন পাসপোর্ট, ভিসা, এনআইডি বা আধার কার্ড) পরীক্ষার মাধ্যমে কেবল দ্বিপাক্ষিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই ফেরত পাঠানোর আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, ‘কোনো দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনা কিংবা প্রমাণ ছাড়া একতরফাভাবে পুশ-ইন করার ঘটনা ঘটলে শুরুতেই আমাদের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর উচিত সরাসরি বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিক কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।’

‘একই সঙ্গে কূটনৈতিক মাধ্যমে বিষয়টি দেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো উচিত। যাতে তারা দিল্লির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে এর প্রতিকার চাইতে পারে,’ বলেন তিনি।

বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে সীমান্তে আমাদের নমনীয় অবস্থান নেওয়া উচিত নয় দাবি করে আসিফ বলেন, ‘বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বা যে কোনো সময়ে যখন দুই দেশের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে মানুষকে নো ম্যানস ল্যান্ডে মানবেতর পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হয়, তা চরম অমানবিক। দুই দেশের সরকারেরই উচিত এ সংকটের একটি স্থায়ী ও মানবিক আইনি সমাধান নিশ্চিত করা।’

বিজিবি যা বলছে

সীমান্তে পুশ-ইন ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বিজিবি। এ বিষয়ে বিজিবির উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিজিবির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অননুমোদিত বা একতরফা অনুপ্রবেশ/পুশ-ইন গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের যে কোনো প্রচেষ্টা বিজিবি আইনানুগভাবে প্রতিহত করে।’

কর্নেল আবুল হাসনাত বলেন, ‘বিজিবি একটি পেশাদার, দায়িত্বশীল ও মানবিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে দেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

টিটি/এএসএ/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow