সীমিত জনবলে মাঠে হিমশিম দশা, ব্যারাকে গাদাগাদি করে বাস

রাজধানীর পল্লবী থানা। ১৬টি বিহারি ক্যাম্প এবং ১৯টি বস্তি থাকা এলাকাটিতে প্রায় ৯ লাখ মানুষের বসবাস। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৫০ জনের মতো পুলিশ সদস্য। সীমিত এ জনবল নিয়েই নিয়মিত গ্রেফতার অভিযানসহ নানা ধরনের পুলিশি সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দায়িত্ব পালন শেষে সদস্যদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নেই পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা। থানার ব্যারাকে ছোট খাট ও অপ্রতুল জায়গায় তাদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে পল্লবী থানায় এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রধান সড়কসংলগ্ন থানার ভবন দেখে বাইরে থেকে আধুনিক ও গোছানো পরিবেশের ধারণা পাওয়া গেলেও ভেতরের আবাসন ব্যবস্থার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এছাড়া, থানার সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে সারি সারি পড়ে থাকতে দেখা যায় মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা পুরোনো যানবাহন। ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্লবী থানা ভবন/ছবি: জাগো নিউজ তৈরি হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক চাপ সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য, অপরাধ দমনে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর পর্যাপ্ত জায়গা ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

সীমিত জনবলে মাঠে হিমশিম দশা, ব্যারাকে গাদাগাদি করে বাস

রাজধানীর পল্লবী থানা। ১৬টি বিহারি ক্যাম্প এবং ১৯টি বস্তি থাকা এলাকাটিতে প্রায় ৯ লাখ মানুষের বসবাস। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৫০ জনের মতো পুলিশ সদস্য।

সীমিত এ জনবল নিয়েই নিয়মিত গ্রেফতার অভিযানসহ নানা ধরনের পুলিশি সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দায়িত্ব পালন শেষে সদস্যদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নেই পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা। থানার ব্যারাকে ছোট খাট ও অপ্রতুল জায়গায় তাদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে পল্লবী থানায় এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রধান সড়কসংলগ্ন থানার ভবন দেখে বাইরে থেকে আধুনিক ও গোছানো পরিবেশের ধারণা পাওয়া গেলেও ভেতরের আবাসন ব্যবস্থার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এছাড়া, থানার সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে সারি সারি পড়ে থাকতে দেখা যায় মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা পুরোনো যানবাহন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্লবী থানা ভবন/ছবি: জাগো নিউজ

তৈরি হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক চাপ

সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য, অপরাধ দমনে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর পর্যাপ্ত জায়গা ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘একজন ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। অপরাধ দমনে কঠোর পরিশ্রম করার পর যদি ব্যারাকে ছোট একটি খাটে অল্প জায়গায় বিশ্রাম বা ঘুমাতে বাধ্য হন, তাহলে তার কাছ থেকে ভালো কাজ আশা করা কঠিন।’ আবাসন সমস্যার দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন বলে ওই পুলিশ সদস্য মন্তব্য করেন।

তবে মিরপুর এলাকার অন্য থানাগুলোর তুলনায় পল্লবীর স্থাপনা ও সার্বিক অবকাঠামো তুলনামূলক ভালো বলেও জানান পুলিশ সদস্যরা।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির বলেন, ‘৯ লাখ লোকের বসবাস এই পল্লবীতে। সেখানে আমাদের জনবল মাত্র ১৫০ জনের মতো। সীমিত জনবল নিয়েই নিয়মিত অভিযান, গ্রেফতার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’

একজন ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। অপরাধ দমনে কঠোর পরিশ্রম করার পর যদি ব্যারাকে ছোট একটি খাটে অল্প জায়গায় বিশ্রাম বা ঘুমাতে বাধ্য হন, তাহলে তার কাছ থেকে ভালো কাজ আশা করা কঠিন।- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সদস্য 

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক বাস্তবতা

পল্লবীতে জনবল সংকটের পাশাপাশি থানার আওতাধীন এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ।

বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পল্লবী থানা এলাকায় ১৬টি বিহারি ক্যাম্প ও প্রায় ১৯টি বস্তি রয়েছে। থানার এক কর্মকর্তার দাবি, এসব ক্যাম্প ও বস্তির বাসিন্দাদের বড় অংশ নিম্ন আয়ের এবং তাদের অনেকের শিক্ষার সুযোগ সীমিত। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারত্বও রয়েছে। যে কারণে একটি অংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

পল্লবীতে মাদক ও কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট আসামির সংখ্যাই বেশি/ছবি: জাগো নিউজ

ওসি হাসান বাসিরও একই প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এলাকার লোকজনের একটি বড় অংশ বিহারি ক্যাম্প ও বস্তির বাসিন্দা। তাদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা তুলনামূলক কম বলে তিনি জানান।

তবে শুধু গ্রেফতার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় উল্লেখ করে ওসি বলেন, অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে একই ধরনের অপরাধে জড়িতরা বারবার ফিরে আসবে।

সম্প্রতি স্থানীয় ‘আশিক গ্যাং’ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর ১৫ থেকে ১৬ জনকে গ্রেফতার এবং অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানান ওসি। তার দাবি, অভিযানের পর গ্যাংটির হোতা আশিক এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।

প্রতিদিন গড়ে ৩০ আসামি গ্রেফতার

সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে ১০ থেকে ১২ জনকে নিয়ে একটি পুলিশ ভ্যান থানায় ঢুকতে দেখা যায়। সন্ধ্যা ৭টা ৬ মিনিটে আরও একজনকে টানতে টানতে থানার ভেতরে নেওয়া হয়।

পুলিশ সদস্যরা জানান, বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার এসব আসামিকে রাতে থানার সেলে রেখে পরদিন আদালতে পাঠানো হবে। এক কর্মকর্তা বলেন, পল্লবী এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে মাদক ও কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট আসামির সংখ্যাই বেশি।

থানার সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে পড়ে আছে মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা পুরোনো যানবাহন/ছবি: জাগো নিউজ

এত বিপুলসংখ্যক অভিযুক্ত গ্রেফতারের পরও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রশ্ন উঠছে- শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানই কি সমস্যার সমাধান করতে পারবে? পুলিশের দাবি, গ্রেফতারের পর অভিযুক্তদের দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসাও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যে আসামির ছয় মাসেও জামিন পাওয়ার কথা নয়, সেও ১৫ দিনের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আসছে। আইনগতভাবে জামিন-অযোগ্য আসামিরাও বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। বড় আসামিদের জামিন ঠেকাতে তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির এবং সেখানে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।’

তার ভাষায়, আসামি যেমনই হোক, আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আসে।

আমাদের ভবন সম্প্রসারণের কাজ শুরু হবে শিগগিরই। তখন পুলিশ সদস্যদের থাকার ব্যবস্থাটা উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।- ওসি হাসান বাসির 

সেবাপ্রার্থীদের বড় অংশই থানায় এসে সন্তুষ্ট

কথা হয় থানায় আসা একাধিক সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে। ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বিরোধের জেরে আহত হয়ে মামলা করতে আসা শাবানা বেগম জানান, মামলা ও অভিযোগের পার্থক্য নিয়ে তিনি দ্বিধায় ছিলেন। পুলিশ তাকে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

রিকশাচালক সুরুজ জামান কারখানায় কর্মরত ছেলেকে ছাড়াতে থানায় এসেছিলেন। তার দাবি, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে একটি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে তার ছেলেকে আটক করা হয়েছে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির 

ভাগনির নিখোঁজ স্বামীর বিষয়ে থানায় জানাতে আসা এক নারী বলেন, পুলিশ তার অভিযোগ গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিদর্শকের (এসআই) যোগাযোগ নম্বর দিয়েছে। বিদেশযাত্রার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে আসা শাবাব বিন আজাদ জানান, অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করার পর শুধু সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য থানায় এসেছেন।

মোবাইল হারিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে আসা মো. আকুল আহমেদও প্রত্যাশিত সেবা পাওয়ার কথা জানান। অর্থাৎ, সেবাপ্রার্থীদের বড় অংশ থানার সেবায় সন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করেন।

ভবন সম্প্রসারণ হলে কাটবে আবাসন সংকট

পুলিশ সদস্যদের আবাসন সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি হাসান বাসির বলেন, ‘আমাদের ভবন সম্প্রসারণের কাজ শুরু হবে শিগগিরই। তখন পুলিশ সদস্যদের থাকার ব্যবস্থাটা উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।’

তবে সম্প্রসারণের কাজ কবে শুরু এবং কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

কেআর/একিউএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow