চট্টগ্রামের আদালত প্রাঙ্গণে সংঘর্ষের মধ্যে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর দুই মাস পর বিচারিক ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে মামলাটি। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) অভিযোগ গঠনের শুনানির মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বহুল আলোচিত এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা জজ মো. জাহিদুল হক অভিযোগ গঠনের এই দিন নির্ধারণ করেন। মামলাটি আগামীকালের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এদিন আসামিদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ গঠনসংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। মামলায় সাবেক ইসকন সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ মোট ৩৯ জন আসামি রয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগপত্রে উল্লিখিত অভিযোগ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
চট্টগ্রাম আদালতের প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, দেশ-বিদেশে বহুল আলোচিত এ মামলার গুরুত্ব, আসামিদের নিরাপত্তা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত প্রাঙ্গনে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তা বলয় কার্যকর থাকবে। এ সময় আদালত এলাকায় প্রবেশ সীমিত থাকবে। আইডি কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে প্রবেশের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনুরোধ জানিয়েছে। আদালতের কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ১০টায়।
আদালত সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও ইসকনের সাবেক সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় সংঘর্ষের একপর্যায়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে।
এ ঘটনায় নিহত আইনজীবীর বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে আরও পাঁচটি মামলা হয়।
পুলিশ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১ জুলাই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের উসকানি ও নির্দেশেই আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে হত্যা করা হয়। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, রিপন দাস বঁটি দিয়ে আলিফের ঘাড়ে দুটি কোপ দেন এবং চন্দন দাস কিরিচ দিয়ে আঘাত করেন। পরে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা আলিফকে লাঠি, বাটাম, ইট, কিরিচ ও বঁটি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করা হয়।
গত ২৫ আগস্ট আদালত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান কোতোয়ালি থানায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে ওই মামলার বাদী ফিরোজ খানকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গত ২৫ নভেম্বর ঢাকার একটি এলাকা থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চিন্ময়ের জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করেই আদালত চত্বরে সংঘর্ষের মধ্যে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে এ মামলায় চিন্ময়সহ ২২ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন। শুভ কান্তি দাশ, রিপন দাশ, পপি দাশ, সকু দাশ, শিবা দাশ ও দ্বীপ দাশসহ ১৭ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।
উল্লেখ্য, নিহত আইনজীবীর পরিবার গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবরে আবেদন করে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ওই আবেদন পাঠানো হয়।