স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

সাল ২০২২। জুন মাসের কোন তারিখে ঢাকার আকাশ সেদিন অদ্ভুতভাবে মেঘলা ছিল। মনে হচ্ছিল বাইরের আকাশ যেন ভেতরের আবহাওয়ারই প্রতিচ্ছবি। অফিসের ব্যস্ততা, সংবাদ সংগ্রহের চাপ আর প্রতিদিনের সময়ের ঠোকাঠুকিতে নিজের জন্য একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা যেন দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই এক সহকর্মীর কাছ থেকে প্রস্তাব এলো-তুরস্কে যাওয়া যায় কি না। আগে কখনো দেশের বাইরে যাওয়া হয়নি। তবু মনে হলো, যেন কোনো অদৃশ্য টান আমাকে ডাকছে। সেই ডাকের শহর-ইস্তাম্বুল। ভিসা প্রসেসিং, টিকিট ও হোটেল বুকিং-সবকিছুই অদ্ভুত দ্রুততায় সম্পন্ন হয়ে গেল। বুঝে ওঠার আগেই যাত্রার দিন এসে গেল। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি শহরে যাচ্ছি না; বরং নিজের ভেতরের কোনো অজানা যাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নতুন কিছু জানতে, নতুন কিছু দেখতে এক অন্যরকম শিহরণ কাজ করছিল। বিমানে ওঠার আগে পরিচয় হলো আরেক বাঙালি সাংবাদিকের সঙ্গে। প্রথম বিদেশযাত্রা আমাদের দুজনেরই। ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হওয়া আলাপ বিমানেও চলতে থাকল। ঢাকা শহর, সাংবাদিকজীবন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সব মিলিয়ে সময় যেন দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। জানালার পাশে

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

সাল ২০২২। জুন মাসের কোন তারিখে ঢাকার আকাশ সেদিন অদ্ভুতভাবে মেঘলা ছিল। মনে হচ্ছিল বাইরের আকাশ যেন ভেতরের আবহাওয়ারই প্রতিচ্ছবি। অফিসের ব্যস্ততা, সংবাদ সংগ্রহের চাপ আর প্রতিদিনের সময়ের ঠোকাঠুকিতে নিজের জন্য একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা যেন দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই এক সহকর্মীর কাছ থেকে প্রস্তাব এলো-তুরস্কে যাওয়া যায় কি না। আগে কখনো দেশের বাইরে যাওয়া হয়নি। তবু মনে হলো, যেন কোনো অদৃশ্য টান আমাকে ডাকছে। সেই ডাকের শহর-ইস্তাম্বুল।

ভিসা প্রসেসিং, টিকিট ও হোটেল বুকিং-সবকিছুই অদ্ভুত দ্রুততায় সম্পন্ন হয়ে গেল। বুঝে ওঠার আগেই যাত্রার দিন এসে গেল। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি শহরে যাচ্ছি না; বরং নিজের ভেতরের কোনো অজানা যাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নতুন কিছু জানতে, নতুন কিছু দেখতে এক অন্যরকম শিহরণ কাজ করছিল।

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

বিমানে ওঠার আগে পরিচয় হলো আরেক বাঙালি সাংবাদিকের সঙ্গে। প্রথম বিদেশযাত্রা আমাদের দুজনেরই। ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হওয়া আলাপ বিমানেও চলতে থাকল। ঢাকা শহর, সাংবাদিকজীবন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সব মিলিয়ে সময় যেন দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। জানালার পাশে বসে যখন মেঘের ওপর দিয়ে বিমান উড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল পরিচিত পৃথিবীটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। নিচে পড়ে আছে পরিচিত শহর ঢাকা, আর সামনে অপেক্ষা করছে সমৃদ্ধ ইতিহাসের শহর ইস্তাম্বুল।

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

ইস্তাম্বুলের আকাশে বিমান পৌঁছাতেই ওপর থেকে শহরটিকে স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরীর মতো মনে হচ্ছিল। দৃশ্যটি দেখেই চোখে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভূত হচ্ছিল। পরে জানতে পারি, শহরের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সড়কবাতি ও বিভিন্ন আলোর ব্যবস্থায় একই ধরনের রঙ ব্যবহার করা হয়। আর সেই কারণেই রাতের আকাশ থেকে ইস্তাম্বুলকে এমন স্বর্ণালি ও মনোমুগ্ধকর দেখায়।

ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে নেমেই অনুভূতিটি হলো — এক মোলায়েম ঠান্ডা বাতাস। জুন মাসের ঢাকার গরমের পর এই বাতাস যেন স্বস্তির ছোঁয়া। বিশাল ও আধুনিক এই বিমানবন্দর এতটাই পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল যে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হতে হয়। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে উঠে শহরের দিকে যেতে যেতে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, দূরে সমুদ্রের নীল আভা, উঁচু মিনার আর পরিপাটি সড়ক। মনে হচ্ছিল শহরটি যেন বহুদিন ধরে আমাকে চেনে।

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

আমার হোটেল ছিল বসফরাসের কাছেই। জানালা খুলতেই চোখে পড়ল নীল পানির ওপর সূর্যের আলো ঝলমল করছে। দূরে ফেরি চলাচল করছে, আকাশে উড়ছে সিগাল। সেই মুহূর্তেই বুঝলাম-ইস্তাম্বুল শুধু একটি শহর নয়, এটি এক অনুভূতির নাম।

বিকেলের দিকে বসফরাসের তীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাতাসে হালকা নোনা ঘ্রাণ, সামনে বিশাল জলরাশি। দূরে সেতুর ওপর গাড়ির আলো জ্বলছে। চারপাশে নানা দেশের মানুষ। কেউ ছবি তুলছে, কেউ হাঁটছে, কেউ চুপচাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে এখানে একই মুহূর্ত ভাগাভাগি করে নিচ্ছে।

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

সেই সন্ধ্যায় ইস্তাম্বুলে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হলো। একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাদের সঙ্গে আলাপ হলো। বিদেশের মাটিতে তাদের আন্তরিকতা যেন অচেনা শহরটিকে হঠাৎ করে পরিচিত করে দিল। আড্ডায় উঠে এলো পড়াশোনা, নতুন দেশে টিকে থাকার সংগ্রাম, ভাষা শেখা, কাজ খোঁজা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের গল্প। বুঝলাম, পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি থাকুক, তারা সহজেই একটি ছোট পরিবার তৈরি করে নিতে পারে।

পরদিন সকালে গেলাম আয়া সোফিয়া দেখতে। বিশাল গম্বুজ, দেয়ালের মোজাইক আর শতাব্দী পুরোনো স্থাপত্য যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, সময় যেন ধীর হয়ে গেছে। এই স্থাপনাটি একসময় ছিল গির্জা, পরে মসজিদ, আবার জাদুঘর, আজ আবার মসজিদ। আয়া সোফিয়া যেন ইতিহাসের বহু স্তর একসঙ্গে ধারণ করে আছে। ভেতরের আলো, বিশাল গম্বুজ আর নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কত মানুষ এখানে এসে বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে।

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

আয়া সোফিয়া থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম গ্র্যান্ড বাজারে। বলা হয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এবং বৃহৎ বাজারগুলোর একটি। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো যেন রঙ, গন্ধ আর শব্দের এক বিশাল পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি। কার্পেট, তুর্কি ল্যাম্প, মসলা, তুর্কি ডিলাইট, সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন এক জীবন্ত সংস্কৃতির মেলা।

এখানকার দোকানিরা গল্প করতে ভালোবাসে। কেউ জিজ্ঞেস করে আপনি কোন দেশ থেকে এসেছেন, কেউ আবার আপনাকে চা খাওয়াতে চায়। তাদের হাসিমুখ আর আন্তরিকতা বুঝিয়ে দেয়-ইস্তাম্বুল শুধু ব্যবসার শহর নয়, এটি মানুষের শহর।

এরপর গেলাম ইস্তিকলাল স্ট্রিটে। এটি ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত রাস্তা। রাস্তার মাঝখানে পুরোনো লাল ট্রাম চলাচল করে, দুই পাশে দোকান, ক্যাফে আর বইয়ের দোকান। রাস্তার শিল্পীরা গান গাইছে, কেউ বেহালা বাজাচ্ছে, কেউ ছবি আঁকছে। চারপাশে নানা দেশের মানুষ। কেউ পর্যটক, কেউ স্থানীয়, সবাই যেন একই ছন্দে হাঁটছে।

শহরের আরেক রূপ দেখলাম কাদিকয় এলাকায়। সেখানে বড় শহরের কোলাহল কম, জীবন যেন একটু ধীরে চলে। মাছের বাজার, ছোট চায়ের দোকান আর দেয়ালজুড়ে আঁকা গ্রাফিতি

এক সন্ধ্যায় বসফরাস ক্রুজে উঠলাম। ফেরি ধীরে ধীরে এগোতে থাকলে দুই তীরের আলো পানিতে প্রতিফলিত হয়ে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করে। দূরে বসফরাস সেতুর নীল আলো, পাশে উড়ে যাওয়া সিগাল আর সমুদ্রের নোনা বাতাস, সব মিলিয়ে মুহূর্তটি যেন স্মৃতিতে স্থির হয়ে থাকে।

ফেরির ডেকে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, এই শহর দুই মহাদেশকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে। এক পাশে ইউরোপ, অন্য পাশে এশিয়া। কিন্তু বসফরাসের পানির ওপর দাঁড়িয়ে মনে হয়, মানুষের গল্পের কোনো সীমান্ত নেই।

শহরের আরেক রূপ দেখলাম কাদিকয় এলাকায়। সেখানে বড় শহরের কোলাহল কম, জীবন যেন একটু ধীরে চলে। মাছের বাজার, ছোট চায়ের দোকান আর দেয়ালজুড়ে আঁকা গ্রাফিতি। সব মিলিয়ে জায়গাটিতে এক অন্যরকম প্রাণ আছে। মানুষজন ধীরে ধীরে হাঁটে, চা পান করে, গল্প করে। মনে হয় শহরের ব্যস্ততার ভেতরেও তারা নিজেদের জন্য কিছুটা সময় আলাদা করে রেখেছে।

স্বর্ণালি আলোয় মোড়া এক নগরী ইস্তাম্বুল

ইস্তাম্বুলে কয়েকদিন কাটিয়ে বুঝলাম, শহরটি কেবল তার স্থাপত্য বা ইতিহাসের জন্য নয়; তার মানুষগুলোর কারণেও আলাদা। ট্যাক্সিচালক থেকে শুরু করে দোকানি, সবার মধ্যেই এক ধরনের আন্তরিকতা রয়েছে। কেউ ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলে, কেউ আবার হাসি দিয়েই যোগাযোগ করে। তাদের আচরণে সৌজন্য ও অতিথিপরায়ণতা আমাকে মুগ্ধ করে।

শেষ দিনটি ছিল সবচেয়ে আবেগের। সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলাম শহরের এক উঁচু টিলায়। দূরে বসফরাস, মিনার আর সেতুগুলো একসঙ্গে দেখা যায়। সূর্য যখন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল-এই শহর আমাকে কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে।

বিমান যখন আকাশে উঠছিল, নিচে বসফরাস আর সেতুগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছিল। তখন মনে হচ্ছিল, আমি শহরটিকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি না

ইস্তাম্বুল আমাকে শিখিয়েছে ধীরে হাঁটতে, মানুষের গল্প শুনতে আর নিজের ভেতরের নীরবতাকে গুরুত্ব দিতে। এই শহর আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, এটি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করারও এক অনন্য সুযোগ।

ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফিরে এসে বুঝলাম, আমি শুধু একটি শহর দেখে ফিরিনি, বরং নিজের ভেতরের এক নতুন মানুষকে আবিষ্কার করে ফিরেছি।

বিমান যখন আকাশে উঠছিল, নিচে বসফরাস আর সেতুগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছিল। তখন মনে হচ্ছিল, আমি শহরটিকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি না; বরং শহরটি আমার ভেতরেই রয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত এটাই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় অর্জন — একটি শহর স্মৃতির অংশ হয়ে যায়, আর পর্যটক একটু অন্য মানুষ হয়ে বাড়ি ফেরে।

ইস্তাম্বুল আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক গভীর অনুভূতি, যা আমাকে নতুন করে জীবনকে দেখতে শিখিয়েছে। হয়তো আবার কোনো একদিন ফিরে যাব সেই শহরে, যেখানে ইতিহাস, সমুদ্র আর মানুষের গল্প একসঙ্গে মিশে থাকে — ইস্তাম্বুলে।

লিখেছেন: জহিরুল ইসলাম, লেখক ও সাংবাদিক

আরএমডি

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow