হাওরের বোরো ধানে ত্রিমুখী আঘাত
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে এসে নেমেছে একসঙ্গে তিন ধরনের আঘাত। অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বাজারে ধানের অস্বাভাবিক দরপতন। রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেল থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতের ফলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে পাকা ধান পানির নিচে প্রায় তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের ঘরে ওঠার আগেই হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের হাওরগুলোতে কয়েকদিন আগেও যেখানে পাকা ধানের ঢেউ দুলছিল, সেখানে এখন থইথই পানি। কৃষকেরা কোমরপানিতে নেমে, কখনো নৌকায়, কখনো ডুব দিয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেতেই তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ধান পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর হাওরের কৃষক রতন মিয়া ১০ একর জমিতে ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টিতে সব ধান তলিয়ে যাওয়ায় এখন তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হওয়ার মুখে। তিনি বলেন, আর চার-পাঁচ দিন সময় পেলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন কিছুই রইল না। ঋণ শোধ করব কীভাবে বুঝতে পারছি না। একই এলাকার কৃষক নজরুল ইসলামের ৯ একরের মধ্যে ৭ একরই ইতোমধ্যে পানির নিচে। কৃষকদের অভিয
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে এসে নেমেছে একসঙ্গে তিন ধরনের আঘাত। অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বাজারে ধানের অস্বাভাবিক দরপতন।
রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেল থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতের ফলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে পাকা ধান পানির নিচে প্রায় তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের ঘরে ওঠার আগেই হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের হাওরগুলোতে কয়েকদিন আগেও যেখানে পাকা ধানের ঢেউ দুলছিল, সেখানে এখন থইথই পানি। কৃষকেরা কোমরপানিতে নেমে, কখনো নৌকায়, কখনো ডুব দিয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেতেই তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ধান পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর হাওরের কৃষক রতন মিয়া ১০ একর জমিতে ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টিতে সব ধান তলিয়ে যাওয়ায় এখন তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হওয়ার মুখে। তিনি বলেন, আর চার-পাঁচ দিন সময় পেলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন কিছুই রইল না। ঋণ শোধ করব কীভাবে বুঝতে পারছি না।
একই এলাকার কৃষক নজরুল ইসলামের ৯ একরের মধ্যে ৭ একরই ইতোমধ্যে পানির নিচে। কৃষকদের অভিযোগ, উজানের পানি দ্রুত হাওরে ঢুকে পড়া, নদী ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে প্রতিবছরই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই আঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধানের কম দাম। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচই প্রায় ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়।
নিকলীর কৃষক আব্বাস আলী বলেন, দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে। এভাবে কৃষি করে টিকে থাকা সম্ভব না। তাই ছেলেদের বিদেশে পাঠানোর চিন্তা করছি। কৃষানি হালিমা খাতুনের কণ্ঠেও হতাশা, ঋণ নিয়ে চাষ করেও লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াই এখন অনিশ্চিত। অনেকেই ইতোমধ্যে গবাদিপশু বিক্রি করে ঋণ শোধের কথা ভাবছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় বাজার পুরোপুরি মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ভৈরব ও করিমগঞ্জের বিভিন্ন নৌবন্দরে কম দামে ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন আড়তদাররা।
নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিনও ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে খোয়াই নদীর পানি ঢুকে অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। অনেক জায়গায় পানি কমার বদলে বাড়ছে, ফলে যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ হাওরাঞ্চলে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন ধান। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ধান ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। তাই ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। শিগ্গিরই সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজারে ধানের দাম বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
What's Your Reaction?