হোলি আর্টিসান হামলার ১০ বছর: চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা

রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারের অপেক্ষায়  রয়েছে। ঘটনার ১০ বছরের মাথায় আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার নৃশংস ঘটনায় সর্বশেষ ধাপের বিচারের অপেক্ষায় পুরো জাতি। হোলি আর্টিসান বেকারিতে আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বুধবার (১ জুলাই)। ২০১৬ সালের এ হামলার ঘটনায় করা মামলা বিচারের দুই ধাপ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষায় রয়েছে শেষ ধাপের বিচার। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিচারটির সঙ্গে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর গুরুত্ব আছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির (আত্মঘাতী) সদস্যরা। দে‌শের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস এ হামলায় ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, এক ভারতীয়, এক বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক ও দুজন বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেডের আঘাতে প্রাণ হারান বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম। হামলার পর জিম্মি অবস্থার

হোলি আর্টিসান হামলার ১০ বছর: চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা

রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারের অপেক্ষায়  রয়েছে। ঘটনার ১০ বছরের মাথায় আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার নৃশংস ঘটনায় সর্বশেষ ধাপের বিচারের অপেক্ষায় পুরো জাতি।

হোলি আর্টিসান বেকারিতে আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বুধবার (১ জুলাই)। ২০১৬ সালের এ হামলার ঘটনায় করা মামলা বিচারের দুই ধাপ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষায় রয়েছে শেষ ধাপের বিচার।

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিচারটির সঙ্গে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর গুরুত্ব আছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির (আত্মঘাতী) সদস্যরা। দে‌শের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস এ হামলায় ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, এক ভারতীয়, এক বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক ও দুজন বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেডের আঘাতে প্রাণ হারান বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম।

হামলার পর জিম্মি অবস্থার অবসানে কমান্ডো অভিযানে নিহত হন পাঁচ জন। তারা হলেন- মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন নব্য জেএমবির আরও ৮ সদস্য। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

এ ঘটনার মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান একজনকে খালাস দিয়ে সাতজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসা‌মিরা হ‌লেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ। খালাস পেয়েছেন মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান। পরে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। আর কারাবন্দি আসামিরা আপিল আবেদন করেন।

২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশের পরিবর্তে সাতজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। দেওয়া সেই রায়ের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ২০২৫ সালের ১৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। যেটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জাগো নিউজকে বলেন, মামলাটি আপিল বিভাগে পেন্ডিং আছে। ইদানিং লক্ষ্য করছেন আপিল বিভাগে মামলার শুনানি ও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকি। এ ক্ষেত্রেও আমাদের উদ্যোগের ঘাটতি হবে না। তবে কিছু প্র্যাকটিকাল ডিফিকাল্টি আছে। আপিল বিভাগে মাত্র ৫ জন বিচারপতি আছেন। মামলার অনেক চাপ। প্রত্যেকের কাছে তার মামলা গুরুত্বপূর্ণ।

রায়ে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার বক্তব্য পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে বলেন, কেউ যদি (অ) উপদফা অনুসারে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা করার চেষ্টা গ্রহণ করে সে ক্ষেত্রে ৬(২)(অ) মতে সে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।

আদালত আরও বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুসারে কেউ যদি ওই অপরাধের সহায়তা বা প্ররোচিত করে কোনো অপরাধ সংঘটন করে এবং ওই অপরাধের শাস্তি যদি মৃত্যুদণ্ড হয় সে ক্ষেত্রে আইনের ৬(২)(আ) তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১৪ (চৌদ্দ) বছর ও অন্যূন ৪ (চার) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটা স্বীকৃত যে ঘটনার তারিখ ও সময়ে ঘটনাস্থলে ঘটনাটি ঘটানোর উদ্দেশ্যে এই আপিলকারীদের কেউ উপস্থিত ছিল না কিংবা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ঘটনাটি ঘটানোর জন্য কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অভিযোগ এই আসামিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এখানে ৬(১)(ক)(অ) এবং আ উপ দফায় উল্লেখিত অপরাধ দুটি পৃথক অপরাধ।

রায়ে আরও বলা হয়, মামলাটি সন্ত্রাস বিরোধী আইনে রজু হওয়া, অভিযোগপত্র দাখিল করা, অভিযোগ গঠন এবং বিচার শেষে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে বিচার শেষ হওয়ায় এখানে পেনাল কোডের বিধান প্রয়োগের সুযোগ নেই। বিচারিক একই অভিপ্রায় উল্লেখ করে (কমন ইনটেনশন) আপিলকারীদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আইনের ৬(২) (অ) ধারার বর্ণিত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তা সঠিক নয় বলে আমরা মনে করি।

‘আপিলকারী আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ঘটনানোর জন্য পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ করা, নিহত ৫ সন্ত্রাসীকে বাছাই, নিয়োগ এবং তাদের দীর্ঘদিন গোপন স্থানে রেখে শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করার কারণে ওই ৫ সন্ত্রাসী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আপিলকারী আসামিদের অপরাধের ক্ষেত্রে ৬(১)(ক)(আ) ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে বলে আমরা মনে করি।’

আদালত বলেন, আপিলকারীদের আইনজীবী আসামিদের বেকসুর খালাস প্রার্থনা করেন। এছাড়া পুনরায় বলেন, যদি ‘আ’ ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয় সে ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ বছর কারাবাসের প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মৃত্যুদণ্ড শ্রেয় ছিল বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু ‘আ’ ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে।

রায়ে সব কিছু বিবেচনা করে আদালত বলেন, আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আইনের ৬(২)(আ) ধারায় বর্ণিত শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। এ ক্ষেত্রে আলোচ্য হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, নৃশংসতা, ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে সন্ত্রাসীদের সামগ্রিক নিষ্ঠুর আচরণ এবং এ ঘটনার ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বিবেচনায় নিয়ে আপিলকারী আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে আমরা মনে করি।

ওই রায়ের আদেশ অংশে বলা হয়, ডেথ রেফারেন্স রিজেক্ট করা হলো। আপিলকারী আসামিদের ধারা ৬ (২) (অ) অনুসারে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ রদ ও রহিত করে ৬(২)(আ) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।

এফএইচ/এমআইএইচএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow