১৮ দিনে তিন জাহাজে জলদস্যুদের হামলা, লুট ১০ কোটি টাকার সামগ্রী

বঙ্গোপসাগরে ১৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালপত্র, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট করেছে জলদস্যুরা। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা। জলদস্যুতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে গত ২২ জুলাই নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। চিঠিতে বলা হয়, বহির্নোঙরে জাহাজে একের পর এক দস্যুতার ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মালপত্র ও সরঞ্জাম লুটের পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভুক্তভোগী ও চট্টগ্রাম চেম্বার সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা বিদেশি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় জলদস্যুরা। সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য হংকং থেকে আমদানি করা জাহাজটিতে প্রায় ২০ জন সশস্ত্র দস্যু পাঁচটি কাঠের নৌকায় এসে হামলা চালায়। আরও পড়ুন বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুতা ঠেকাতে মন্ত্রীকে চিঠি চট্টগ্রাম চেম্বারের জাহাজটি শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশা

১৮ দিনে তিন জাহাজে জলদস্যুদের হামলা, লুট ১০ কোটি টাকার সামগ্রী

বঙ্গোপসাগরে ১৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালপত্র, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট করেছে জলদস্যুরা। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা।

জলদস্যুতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে গত ২২ জুলাই নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। চিঠিতে বলা হয়, বহির্নোঙরে জাহাজে একের পর এক দস্যুতার ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মালপত্র ও সরঞ্জাম লুটের পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ভুক্তভোগী ও চট্টগ্রাম চেম্বার সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা বিদেশি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় জলদস্যুরা। সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য হংকং থেকে আমদানি করা জাহাজটিতে প্রায় ২০ জন সশস্ত্র দস্যু পাঁচটি কাঠের নৌকায় এসে হামলা চালায়।

জাহাজটি শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, নোঙর ফেলার সময় হামলাকারীদের একটি দল নাবিকদের অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ব্যস্ত রাখে এবং অন্য দল ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিও বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দস্যুরা পালিয়ে যায়।

এর আগে ৩০ জুন স্ক্র্যাপিংয়েল জন্য আমদানি করা ‘এমটি আইআরওএস’ নামের আরেক জাহাজে লুটপাট চালায় জলদস্যুরা। জাহাজটি থেকে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম লুট করা হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালপত্র উদ্ধার করে। এর আগের দিন ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা ‘এমভি হাই জু’ নামের জাহাজে হামলা চালায় অস্ত্রধারী জলদস্যুরা। ২০ জনের অধিক দস্যু জাহাজে উঠে প্রথমে নাবিকদের জিম্মি করে। পরে জাহাজ থেকে মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট করে। স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য আনা জাহাজটির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, জাহাজ থেকে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে গেছে জলদস্যুরা।

এদিকে, তিনটি জলদস্যুতার ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের চিঠিতেও লুট করা পণ্যের বেশির ভাগ উদ্ধার করা যায়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও তাৎক্ষণিক কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবেরি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) কোনো প্রকার দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। তবে হঠাৎ করে একের পর এক ঘটনায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরসহ বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা।

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ খালাস হয় বহির্নোঙরে। নাব্য সংকটে জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারে না। ছোট আকারের (লাইটার) জাহাজে বেশির ভাগ আমদানি পণ্য খালাস করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করা থাকে সেখানে। এসব জাহাজ থেকে গড়ে দৈনিক দেড় লাখ টন পণ্য খালাস করা হয় লাইটার জাহাজে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগ পরিচালিত হয়। এটির বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়বে, বিমা ব্যয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বেড়ে যাবে। তাই জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি আমরা।’

এদিকে, বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙরে কয়েকটি জাহাজে চুরির অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষ তৎপরতা শুরু করে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে যৌথ সভায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতে চুরি প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ করা হয়। সভায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বহির্নোঙরে নজরদারি বাড়ানো, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত, জাহাজের আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলক সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, ‘বহির্নোঙরে জাহাজে অপরাধমূলক ঘটনা বন্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। টানা অভিযান চালাচ্ছে কোস্টগার্ড। সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

এমডিআইএইচ/এমএএইচ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow