২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে? 

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে একদিকে যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, অন্যদিকে বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের আশেপাশে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীরগতির এবং রাজস্ব আহরণ সীমিত, সেখানে বাজেটকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।  শিক্ষাখাত দিয়ে শুরু করলে দেখা যায়, বাজেটে এই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বরাদ্দ এখনো পর্যাপ্ত নয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও তা দেশের মোট জিডিপির তুলনায় কম। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হয় প্রাথমিক শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, দক্ষতা নির্ভর শিক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পখাতে দক্ষ কর্মীর অভাব ইতোমধ্যেই একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে? 

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে একদিকে যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, অন্যদিকে বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের আশেপাশে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীরগতির এবং রাজস্ব আহরণ সীমিত, সেখানে বাজেটকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। 

শিক্ষাখাত দিয়ে শুরু করলে দেখা যায়, বাজেটে এই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বরাদ্দ এখনো পর্যাপ্ত নয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও তা দেশের মোট জিডিপির তুলনায় কম। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হয় প্রাথমিক শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, দক্ষতা নির্ভর শিক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পখাতে দক্ষ কর্মীর অভাব ইতোমধ্যেই একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (টিভিইটি) বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বাজেটে এই খাতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক করা যায়, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। 

এছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল স্কিলের মতো বিষয়গুলো শিক্ষাব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। বাজেটে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ এখনও সীমিত। উন্নত দেশগুলোর মতো যদি শিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়া যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। সুতরাং, শুধু বাজেট বরাদ্দ নয়, বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বাস্তব দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যখাত মানবসম্পদ উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও এটি এখনও চাহিদার তুলনায় কম। বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় মোট জিডিপির তুলনায় খুবই সীমিত, যা একটি বড় দুর্বলতা। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে এগোতে পারে না। বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের মান উন্নয়ন এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হবে।

একইসাথে, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং স্বাস্থ্যবীমা চালুর মতো উদ্যোগগুলো মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। বর্তমানে অনেক মানুষ নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে। যদি স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা যায়, তাহলে এই চাপ অনেকটাই কমবে। ফলে মানুষ আরও বেশি নিরাপদ ও উৎপাদনশীল হতে পারবে, যা সরাসরি মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক।
প্রযুক্তিখাত বর্তমানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বাজেটে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্রডব্যান্ড সংযোগ বৃদ্ধি এবং আইসিটি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক। তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব। শুধু প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।

বাজেটে ৫জি প্রযুক্তি, ডাটা সেন্টার এবং ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে। তবে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল বিভাজন কমাতে হলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমানো জরুরি। এতে করে দেশের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবে এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
তবে এই তিনটি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো অর্থের অভাব। দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও ৮–৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে সরকার বড় পরিসরে বিনিয়োগ করতে পারছে না। একইসাথে, বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হওয়ায় উন্নয়ন খাতে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বাধা হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগের কার্যকারিতা। অনেক সময় দেখা যায়, বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও তা সময়মতো বাস্তবায়ন হয় না বা প্রত্যাশিত ফল দেয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুর্নীতি এবং অদক্ষতা থাকলে এই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এই ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হলে বরাদ্দ বাড়ানো, সঠিক খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি এই তিনটি খাতে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ তার বিশাল জনসংখ্যাকে একটি দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারবে। অন্যথায়, সম্ভাবনা থাকলেও তার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow