৩৬ কোটি টাকা খরচের হিসাব দিতে পারছে না রেলওয়ে

1 day ago 7

ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন রেলপথ তৈরিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের খরচ এক হাজার ৭১৪ কোটি টাকার বেশি। ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথটি শতভাগ সরকারি অর্থায়নে নির্মিত। কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের জুনে। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ৩৬ কোটি টাকা খরচে অনিয়মের হিসাব দিতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এ নির্মাণ প্রকল্পটি নিয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রকল্পের আওতায় ১০টি অডিট আপত্তি দেওয়া হয়েছে, যার মোট টাকার পরিমাণ ৩৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৫ হাজার ৩২৮ টাকা। অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য প্রতিবেদনে মতামত তুলে ধরেছে আইএমইডি। আইএমইডির প্রতিবেদন হাতে পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানায় রেলপথ মন্ত্রণালয়।

আইএমইডি প্রতিবেদন ও অডিট আপত্তির কপি আমাদের হাতে এখনো আসেনি। হাতে এলে আমরা অবশ্যই প্রতিবেদন দেখে ব্যবস্থা নেবো। অডিট নিষ্পত্তি করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আইএমইডির মতামত যেভাবে আছে সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা নেবো।- রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অডিট ও আইসিটি) আ স ম আশরাফুল আলম

ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে অডিট আপত্তি প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অডিট ও আইসিটি) আ স ম আশরাফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইএমইডি প্রতিবেদন ও অডিট আপত্তির কপি আমাদের হাতে এখনো আসেনি। হাতে এলে আমরা অবশ্যই প্রতিবেদন দেখে ব্যবস্থা নেবো। অডিট নিষ্পত্তি করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আইএমইডির মতামত যেভাবে আছে সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা নেবো।’

৩৬ কোটি টাকা খরচের হিসাব দিতে পারছে না রেলওয়ে

অডিটে যত আপত্তি

আএইমইডি জানায়, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য দেওয়া অর্থ থেকে উৎসে কর কাটা হয়নি। এ খাতে অর্থের পরিমাণ সাড়ে চার কোটি টাকা। মালামাল উৎপাদন করলেও নির্মাণ সংস্থা হিসেবে ভ্যাট কাটায় সরকারের পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৮৮০ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকার পরও ঠিকাদারের চাহিদা মতে কাজ সমাপ্তির মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন করা হয়।

অননুমোদিত বিলম্বকালের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ঠিকাদারের কাছে সাড়ে সাত কোটি আদায় করতে হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও বিধি বহির্ভূতভাবে মেসার্স রোজলীন ট্রেডার্সের সঙ্গে এক কোটি ৩৯ লাখ ৯ হাজার ৮শ টাকা চুক্তি সম্পাদন ও ঠিকাদার নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম। প্রকল্প থেকে দুই কোটি ৬৬ লাখ টাকা রেল রাজস্ব খাতে অনিয়ম করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে লং ওয়েলডেড রেল না করে শর্ট ওয়েলডেড রেল করায় সরকারের ক্ষতি দুই কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় ৬৭৬ ঘনমিটার পাথর অতিরিক্ত কেনায় সরকারের ৪৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৯ টাকা অপচয় হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে পরামর্শক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে তিন কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অনিয়মিতভাবে ১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ভাউচার ছাড়াই জেনারেল রিকয়ারমেন্টস নামে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে অনিয়মিতভাবে দুই কোটি ৮৩ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ডাব্লিউ ডি-৬ নম্বর প্যাকেজে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করায় সরকারের ক্ষতি ২৩ লাখ ১০ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। ডাব্লিউডি-২ নম্বর প্যাকেজের মাধ্যমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রেল কেনায় সরকারের এক কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।

প্রভাব মূল্যায়নে যা পাওয়া যায়

আইএমইডি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাবনা জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে ঈশ্বরদী-পাবনা- ঢালারচর হয়ে রাজবাড়ী থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা পর্যন্ত রেলওয়ে সংযোগ স্থাপনে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য অর্জন এবং বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আলোচ্য এ প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে।

প্রভাব মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি উৎস থেকে। প্রাইমারি তথ্যের উৎস প্রকল্প এলাকার উপকারভোগীরা। সেকেন্ডারি তথ্য বিভিন্ন উৎস যেমন, ডিপিপি, প্রকল্প পরিদর্শন প্রতিবেদন, আইএমইডি ও প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

৩৬ কোটি টাকা খরচের হিসাব দিতে পারছে না রেলওয়ে

প্রভাব মূল্যায়নে দেখা যায়, বর্তমান অ্যালাইনমেন্ট ঈশ্বরদী-মাঝগ্রাম-পাবনা-তাঁতীবান্ধা-কাশীনাথপুর-ঢালারচর ৭৮ দশমিক ৯০ কিলোমিটারের পরিবর্তে ঈশ্বরদী-মাঝগ্রাম-পাবনা-তাঁতীবান্ধা-ঢালারচর (প্রায় ৬৫ কিমি) সরাসরি রেললাইন নির্মাণ করা হলে প্রায় ১৪ কিমি দূরত্ব কমানো যেত।

আবার মাঝগ্রাম হয়ে পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রকল্পে মাঝগ্রাম স্টেশনে ইঞ্জিন ঘোরানোর জন্য সৃষ্ট স্থায়ী অপারেশনাল সমস্যার কারণে ঢাকা-পাবনা অথবা পাবনা-ঢাকা ট্রেন পরিচালনায় প্রতিবার ইঞ্জিন ঘোরানোর জন্য ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হবে। এটা পরিহার করতে মাঝগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সরাসরি যমুনা ব্রিজ অভিমুখী রেল সংযোগ করা যেত। লেভেল ক্রসিংয়ে রেল লেভেলের উভয় পাশের সড়ক বা মহাসড়ক ন্যূনতম ৫০ ফুট একই লেভেলে থাকার কথা থাকলেও প্রকল্প এলাকায় রেল লেভেল ও সড়ক লেভেলের মধ্যে উক্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ রোড লেভেলে রাখা হয়নি।

এমতাবস্থায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে রেল ক্রসিংয়ের উভয় পাশে ৫০ ফুট পর্যন্ত সড়ক একই লেভেলে রাখার পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া সোজা পথের রেল অ্যামব্যাংকমেন্টের উভয় পাশে বৃক্ষরোপণ করা প্রয়োজন। ক্রয় কাজ সম্পাদনের জন্য ক্রয়পরিকল্পনা প্রণয়ন যথাযথ হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প প্রণয়নকালে ক্রয়পরিকল্পনার প্যাকেজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও সচেতন ও বাস্তবমুখী হওয়া প্রয়োজন।

৩৬ কোটি টাকা খরচের হিসাব দিতে পারছে না রেলওয়ে

১৭শ কোটি টাকার রেলপথে চলে একটি ট্রেন

বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা এ রেলপথে বর্তমানে চলাচল করছে দিনে একটি ট্রেন। রেলওয়ের তথ্য বলছে, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন লাইন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। শুরুতে রেলপথটির নির্মাণব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ৯৮৩ কোটি টাকা। মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে একাধিকবার মেয়াদ ও ব্যয় সংশোধন করা হয়। প্রকল্পটি শেষ করতে রেলওয়ের সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে এক হাজার ৭১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে আগামী নভেম্বরে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে।

একইভাবে রাজশাহী থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করা মধুমতী এক্সপ্রেস ট্রেনটি পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা পর্যন্ত চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে রেল। যদিও কবে নাগাদ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

এমওএস/এএসএ/এএসএম

Read Entire Article