রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগসহ দেশের মোট ৩৯টি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বইছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ পরিস্থিতি আরও দুই-একদিন থাকবে।
এদিকে চলতি মাস থেকে আগস্টের মধ্যে তাপমাত্রা বাড়ানোর জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ তৈরি হওয়ার ৮০ শতাংশ আশঙ্কা আছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
মঙ্গলবার (০২ জুন) এমন পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহিনুল ইসলাম জানান, চলমান তাপপ্রবাহ আগামী দু-একদিন অব্যাহত থাকবে, তা আরও কয়েকটি জেলায় বিস্তৃত হতে পারে। এর মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। বৃষ্টিপাত হলে তাপপ্রবাহ কমে আসবে।
তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ ধরা হয়। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে বলা হয় মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। আর তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির উপরে উঠলে তাকে বলা হয় অতি তীব্র তাপপ্রবাহ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেওয়া আগামী ৫ দিনের পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। এদিন সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরণের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণ হতে পারে। এদিন সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর সৈয়দপুরে। সেখানে তাপমাত্রার পারদ ওঠে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এ সময়ে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল সিলেটে, ২৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
জুন-আগস্টের মধ্যে এল নিনো তৈরির আশঙ্কা : জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমও জানিয়েছে, উষ্ণমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়মে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
জুন থেকে আগস্ট মাসের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে সংস্থাটি জানায়, বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বজায় থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে।
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। এর ফলে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় রেখায় অবস্থিত প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর এল নিনো ফিরে আসে। এটি প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
প্রকৃতিতে সাধারণত এল নিনো এবং এর বিপরীত শীতল পরিস্থিতি ‘লা নিনা’ চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এই দুই পরিস্থিতির মধ্যবর্তী সময়টাতে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ত্রৈমাসিক তথ্য অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যে এল নিনো পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি। বেশিরভাগ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো মাঝারি বা বেশ শক্তিশালী রূপ নিতে পারে।
ডব্লিউএমও-এর প্রধান চেলেন্তে সাউলো বলেন, বিশ্বের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এল নিনোর প্রভাবে খরা ও ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে স্থলভাগ ও মহাসাগর- উভয় অঞ্চলেই তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি তৈরি হবে।
এর আগের এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সালের উষ্ণতার রেকর্ড ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পরের বছর (২০২৪) সালে গড় তাপমাত্রা বাড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতে ২০২৪ সাল উষ্ণতার সব রেকর্ড ভেঙে দেয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, এল নিনো দোরগোড়ায় চলে এসেছে। বিশ্বের উচিত এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করা। এল নিনো পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকা পৃথিবীতে ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো কাজ করবে।