৪ হাজার বছর আগেও ছিল তরমুজ, ফেরাউনের সমাধিতে মিলেছে প্রমাণ

আমাদের দেশে তরমুজ গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও এখন সারাবছর কমবেশি এটি পাওয়া যায়। গরমের দিনে এক টুকরো ঠান্ডা তরমুজ মানেই যেন প্রশান্তির অনুভূতি। রসালো, মিষ্টি ও পানিতে ভরপুর এই ফল এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফল হিসেবে পরিচিত। নানান আকৃতির, রঙের তরমুজ এখন চাষ হচ্ছে। তবে শুরুতে তরমুজ কিন্তু এখনকার সময়র মতো ছিল না। তরমুজের ইতিহাস যে হাজার হাজার বছরের পুরোনো, তা অনেকেরই অজানা। প্রায় ৪ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরেও তরমুজের চাষ হতো। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে কিছু প্রাচীন মিশরীয় সমাধিতে তরমুজের বীজ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, পরকালীন জীবনে খাবারের প্রয়োজন হবে এই বিশ্বাস থেকেই ফেরাউন ও অভিজাতদের সমাধিতে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে তরমুজের বীজ রাখা হতো। প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকেও জানা যায়, তরমুজ তখন শুধু খাবার হিসেবেই নয়, বিশেষ গুরুত্বের একটি ফল হিসেবেও বিবেচিত ছিল। তবে সেই সময়কার তরমুজ আজকের মতো উজ্জ্বল লাল, মিষ্টি ও রসালো ছিল না। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মানুষের চাষাবাদ, নির্বাচন ও উন্নত জাত তৈরির মাধ্যমে তরমুজের বর্তমান রূপ তৈরি হয়েছে। তবে গবেষকদের মনে তরমুজের পূর্বপুরুষে

৪ হাজার বছর আগেও ছিল তরমুজ, ফেরাউনের সমাধিতে মিলেছে প্রমাণ

আমাদের দেশে তরমুজ গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও এখন সারাবছর কমবেশি এটি পাওয়া যায়। গরমের দিনে এক টুকরো ঠান্ডা তরমুজ মানেই যেন প্রশান্তির অনুভূতি। রসালো, মিষ্টি ও পানিতে ভরপুর এই ফল এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফল হিসেবে পরিচিত। নানান আকৃতির, রঙের তরমুজ এখন চাষ হচ্ছে। তবে শুরুতে তরমুজ কিন্তু এখনকার সময়র মতো ছিল না।

তরমুজের ইতিহাস যে হাজার হাজার বছরের পুরোনো, তা অনেকেরই অজানা। প্রায় ৪ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরেও তরমুজের চাষ হতো। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে কিছু প্রাচীন মিশরীয় সমাধিতে তরমুজের বীজ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, পরকালীন জীবনে খাবারের প্রয়োজন হবে এই বিশ্বাস থেকেই ফেরাউন ও অভিজাতদের সমাধিতে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে তরমুজের বীজ রাখা হতো।

jago

প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকেও জানা যায়, তরমুজ তখন শুধু খাবার হিসেবেই নয়, বিশেষ গুরুত্বের একটি ফল হিসেবেও বিবেচিত ছিল। তবে সেই সময়কার তরমুজ আজকের মতো উজ্জ্বল লাল, মিষ্টি ও রসালো ছিল না। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মানুষের চাষাবাদ, নির্বাচন ও উন্নত জাত তৈরির মাধ্যমে তরমুজের বর্তমান রূপ তৈরি হয়েছে।

তবে গবেষকদের মনে তরমুজের পূর্বপুরুষের জন্ম আফ্রিকায়। ৫ হাজার বছর আগেই আফ্রিকায় চাষ করা হতো তরমুজ, যা পরে উত্তরে ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে এবং পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাচীন তরমুজ ছিল ভিন্ন রকম

বর্তমানের তরমুজ দেখলে অনেকেই অবাক হতে পারেন যে কয়েকশ বছর আগের তরমুজও আজকের মতো ছিল না। ১৭শ শতকের ইতালীয় শিল্পী জিওভান্নি স্টাঞ্চি-এর আঁকা একটি স্থিরচিত্রে সেই সময়কার তরমুজের একটি ছবি দেখা যায়। ছবিতে দেখা যায়, তরমুজের ভেতরের অংশ আজকের মতো সম্পূর্ণ লাল ও মাংসল ছিল না। বরং এতে ছিল ফাঁকা অংশ এবং কম পরিমাণে রসালো শাঁস।

গবেষকদের মতে, এই ধরনের ঐতিহাসিক চিত্র তরমুজের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের পছন্দ অনুযায়ী ধীরে ধীরে এমন জাত তৈরি করা হয়েছে, যার ভেতরে বেশি মিষ্টি শাঁস, কম বীজ এবং আকর্ষণীয় রং রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক তরমুজ প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের কৃষি গবেষণার ফলও।

jago

মরুভূমির যাত্রীদের পানির ভরসা ছিল তরমুজ

তরমুজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে। এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকেই শুষ্ক ও মরুভূমি অঞ্চলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া যাত্রীরা অনেক সময় তরমুজ সঙ্গে রাখতেন, কারণ এটি একদিকে খাবারের চাহিদা পূরণ করত, অন্যদিকে শরীরে পানির ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করত।

বিশেষ করে আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে তরমুজের বুনো জাতগুলো টিকে থাকার একটি বড় কারণ ছিল এর পানিধারণ ক্ষমতা। অনেক গবেষকের মতে, তরমুজের প্রাথমিক ব্যবহার শুধু মিষ্টি ফল হিসেবে ছিল না, বরং পানির বিকল্প উৎস হিসেবেও মানুষ এটি ব্যবহার করত।

jago

তাহলে তরমুজের আদি নিবাস কোথায়?

তরমুজের উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অধিকাংশ গবেষণায় বলা হয়, আফ্রিকাই তরমুজের আদি উৎস। প্রাচীনকালে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মানো বুনো তরমুজ ধীরে ধীরে মানুষের চাষের আওতায় আসে। পরে এটি মিশর থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

মানুষ যখন বুঝতে পারে তরমুজ সহজে চাষ করা যায় এবং এতে প্রচুর পানি থাকে, তখন এটি বিভিন্ন সভ্যতার খাদ্য তালিকায় জায়গা করে নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা বড়, মিষ্টি ও সুস্বাদু জাত তৈরির চেষ্টা করেন।

jago

চারকোণা বা ত্রিভুজ আকৃতি তরমুজের অদ্ভুত গল্প

তরমুজের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আধুনিক উদ্ভাবনগুলোর একটি হলো চৌকো তরমুজ। ১৯৭০-এর দশকে জাপানে প্রথম চৌকো আকৃতির তরমুজ তৈরি করা হয়। এর পেছনে ছিল একটি ব্যবহারিক চিন্তা। জাপানের ছোট আকারের ফ্রিজে গোলাকার বড় তরমুজ রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ত। তাই কৃষকরা তরমুজকে নির্দিষ্ট আকৃতির বাক্সের মধ্যে বড় করে চারকোণা বা ত্রিভুজ আকৃতি দেওয়ার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

এই তরমুজ সাধারণত স্বাভাবিক জাতের মতোই হয়, তবে এর আকৃতি তৈরি হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। ছোট জায়গায় রাখা সহজ হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে চারকোণা বা ত্রিভুজ আকৃতি তরমুজ সাধারণ ফলের বদলে বিলাসবহুল উপহার হিসেবে পরিচিতি পায়। জাপানে বিশেষ উপলক্ষে এটি উপহার দেওয়ার চল তৈরি হয় এবং এর দামও সাধারণ তরমুজের তুলনায় অনেক বেশি হয়।

jago

তরমুজের পরিবর্তনের দীর্ঘ যাত্রা

প্রাচীন মিশরের ছোট ও কম মিষ্টি তরমুজ থেকে আজকের বড়, রসালো ও মিষ্টি তরমুজ এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। হাজার বছরের কৃষি চর্চা, মানুষের প্রয়োজন এবং স্বাদের পরিবর্তনের মাধ্যমে তরমুজের বিবর্তন ঘটেছে।

একসময় যে ফল মরুভূমির যাত্রীদের জন্য পানির উৎস ছিল, সেটিই আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রীষ্মের জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হয়েছে। আবার একই ফলের বিশেষ আকৃতি তৈরি করে মানুষ এটিকে বিলাসবহুল পণ্যেও রূপ দিয়েছে।

তরমুজের ইতিহাস আসলে শুধু একটি ফলের ইতিহাস নয়, এটি মানুষের কৃষি জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং প্রকৃতিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ। প্রায় ৪ হাজার বছর আগে ফেরাউনের সমাধিতে রাখা সেই তরমুজের বীজ থেকে শুরু করে আজকের চারকোণা বা ত্রিভুজ আকৃতি তরমুজ এই দীর্ঘ যাত্রা দেখায়, সময়ের সঙ্গে একটি সাধারণ ফলও কতটা অসাধারণ গল্পের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: হিস্টোরি ডটকম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow