আমার ঈদের একাল সেকাল

আমার জীবনের পরিধিটা খুব বেশি বড় না। কিন্তু এই ছোট্ট জীবনে নানা বছর, নানা ভাবে ঈদ কেটেছে। সবটা খুব পরিষ্কার মনে নেই, তবে যতটুকু মনে পড়ে ছোটবেলায় দাদুর বাড়িতেই ঈদ করতাম। সবাই একসাথে যেতাম। কয়েকটা দিন একসাথে থাকা, হাসি-আনন্দে ভরা সময়গুলো আজও মনে পড়ে। দাদির কথা খুব স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু যতদিন তিনি ছিলেন, ততদিন সবাই মিলে ঈদটা যেন আরও পূর্ণ হতো। আকাশের ওই বাঁকা চাঁদের আলো আর খুশি যেন আমাদের মুড়িয়ে রাখত। জানেন, ছোটবেলায় সবাই যখন সেহরি খেত, আমি উঠে পড়তাম।  আবার সন্ধ্যায় ইফতার করতাম সব্বাই একসাথে। সব ভাইবোন একসাথে হতাম, চাঁদরাতে মেহেদি দিতাম। জানেন, আমার ভাইগুলো তখন কত দুষ্টু ছিল! হাতে মেহেদি দিলে নানা কথা বলে বিরক্ত করত, নষ্ট করার চেষ্টাও করত..অথচ ওরা আমার চেয়ে অনেক বড়। ঈদের সকালে আমি আর আমার চাচাতো বোন শুয়ে শুয়ে খেতাম। সেগুলো আবার ছবি তুলে রাখত ভাইয়া। তারপর গোসল করে আম্মু আমাকে সাজিয়ে দিতো। হাতে নেলপলিশ দিতাম (এখন আর দিই না)। দাদু-বাবা-চাচা-ভাইয়েরা সবাই নামাজে যেতেন। তারপর সবাই আসলে একসাথে সবাই মিলে ঘুরতাম, সালামি নিতাম, ছবি তুলতাম। আর একটু পরপর খেতাম! (নুডলস আর সুজি আমার খুব পছন্দ ছিল, সে

আমার ঈদের একাল সেকাল

আমার জীবনের পরিধিটা খুব বেশি বড় না। কিন্তু এই ছোট্ট জীবনে নানা বছর, নানা ভাবে ঈদ কেটেছে। সবটা খুব পরিষ্কার মনে নেই, তবে যতটুকু মনে পড়ে ছোটবেলায় দাদুর বাড়িতেই ঈদ করতাম। সবাই একসাথে যেতাম। কয়েকটা দিন একসাথে থাকা, হাসি-আনন্দে ভরা সময়গুলো আজও মনে পড়ে। দাদির কথা খুব স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু যতদিন তিনি ছিলেন, ততদিন সবাই মিলে ঈদটা যেন আরও পূর্ণ হতো। আকাশের ওই বাঁকা চাঁদের আলো আর খুশি যেন আমাদের মুড়িয়ে রাখত। জানেন, ছোটবেলায় সবাই যখন সেহরি খেত, আমি উঠে পড়তাম।  আবার সন্ধ্যায় ইফতার করতাম সব্বাই একসাথে। সব ভাইবোন একসাথে হতাম, চাঁদরাতে মেহেদি দিতাম। জানেন, আমার ভাইগুলো তখন কত দুষ্টু ছিল! হাতে মেহেদি দিলে নানা কথা বলে বিরক্ত করত, নষ্ট করার চেষ্টাও করত..অথচ ওরা আমার চেয়ে অনেক বড়।


ঈদের সকালে আমি আর আমার চাচাতো বোন শুয়ে শুয়ে খেতাম। সেগুলো আবার ছবি তুলে রাখত ভাইয়া। তারপর গোসল করে আম্মু আমাকে সাজিয়ে দিতো। হাতে নেলপলিশ দিতাম (এখন আর দিই না)। দাদু-বাবা-চাচা-ভাইয়েরা সবাই নামাজে যেতেন। তারপর সবাই আসলে একসাথে সবাই মিলে ঘুরতাম, সালামি নিতাম, ছবি তুলতাম। আর একটু পরপর খেতাম! (নুডলস আর সুজি আমার খুব পছন্দ ছিল, সেমাই তেমন ভালো লাগত না)। সবাই  মিলে আইসক্রিম খাওয়ার আনন্দটাই আলাদা ছিল। সত্যি বলতে এসবকিছুই আমার ছোট্টবেলার ছবির কথা;বাস্তবে এসব মনে নেই তেমন।


একটা সময় পর থেকে সবকিছু বদলাতে শুরু করল। সবাই আর একসাথে হতে পারতাম না। তবুও ভালো লাগতো, কারণ কয়েকজন হলেও কিছুদিন একসাথে কাটাতে পারতাম। জানেন, ২০২০ সালে আমার ভাইয়ের বাবু হলো (কিন্তু হঠাৎ অজানা এক ঝরে প্রিয় ফুলটাও গতবছর পাঁচ বছরের অভ্যাস স্মৃতি করে চলে গেল) প্রতি ঈদে ওর সাথে কথা বলতাম। কিন্তু সেই বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে রমজানের ঈদে দেখা করতে পারিনি। দাদুকে নিয়ে আমরা আমাদের বাসায় ঈদ করলাম, আর সবাই যে যার বাসায়।


সেই ঈদটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা ছিল। খুব একা লাগছিল। ভিডিও কলে সবার সাথে কথা বললাম, আম্মু বাসায় রান্না করলো, দাদু আর আব্বু নামাজ পড়ে এলো। তারপর আমরা-আমি, আব্বু-আম্মু, আপু আর দাদু; সবাই মিলে বাসায় ছবি তুললাম, এটাই ছিল সব।


পরের ঈদে দাদু আর আমাদের সাথে ছিলেন না। সেই বাসায় আরও একা হয়ে গেল। তারপর আর দাদুর সাথে ঈদ করা হয়নি। ধীরে ধীরে অভ্যাসও বদলে গেছে। আমরা আর একসাথে রমজানে চাঁদ রাতে মেহেদি দিইনি। একসাথে ছবি তুলেনি।


আর এখন? এখন ঈদ মানেই ব্যস্ততার মাঝে কিছুটা ছুটি। এই ব্যস্ত, জঞ্জালের শহরে ঘুরে বেড়ানো। শপিং আগে যেমন করতাম, এখনও করি— হয়তো আগের মতো উত্তেজনা নেই, কিন্তু অভ্যাসটা রয়ে গেছে। বাবা-মা, আপু মিলে রাতের বেলা এই শহরটা যেন আলোয় ঝলমল করে ব্যস্ততায় আর ভিড়ে। সবাই যেন নিশাচর হয়ে ওঠে।


রোজার ঈদের কথা উঠলেই এখনো নজরুলের সেই গানটা শুনি-“রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”… গানটা না শুনলে যেন ঈদটাই অপূর্ণ লাগে। এর সাথে এখন নতুন করে যোগ হয়েছে টিভিতে বা অনলাইনে বাংলাদেশের কালচারাল প্রোগ্রাম দেখা-নাটক, গান, বিশেষ অনুষ্ঠান… এসব দেখতেই সময় কেটে যায়।


চাঁদ রাতে আমি, আপু আর আমার বন্ধুরা একসাথে মেহেদি দিই, ছবি তুলে আপলোড দিই। অনলাইনে সবার কাছ থেকে সালামি নিই। ঈদের দিনগুলো এখন আর আগের মতো না হলেও… এই ছোট ছোট জিনিসগুলোতেই ঈদের অনুভূতি খুঁজে পাই। ঈদের সকালে সবাইকে ভিডিও কল দিই। আমাকে নিয়ে আপু ঘুরতে যায়। এই শহরের অলিগলিতে নিজেকে সাজিয়ে তুলি।


তারপরও কেমন যেন একটা জায়গায় শূন্যতা থেকে যায়। মনে কিছুর আক্ষেপ থেকে যায়। ঈদের দিনটা এখনো আসে… কিন্তু আগের সেই হারিয়ে যাওয়া একসাথে থাকার আনন্দটা কোথায় যেন বারবার স্মৃতিতে ভেসে আসে। জানি না, আবার কবে ফিরবে সেদিন! আদৌ ফিরবে কিনা। তবু প্রিয় মুখগুলো ভালে থাকুক আজীবন।

লেখক পরিচিতি : জন্ম : ২৬ মে, ২০০৯ জামালপুরে। বর্তমানে একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন। বই পড়তে পছন্দ করেন। অবসরে গল্প-কবিতা লিখেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow