ইতিকাফে মুমিনের অভাবিত প্রাপ্তি

ইতিকাফ আরবি শব্দ। এর অর্থ, ‘আবদ্ধ করা, আবদ্ধ রাখা ও অবস্থান করা’। ইতিকাফের পারিভাষিক অর্থ, ‘ইতিকাফের নিয়তে নিজেকে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবদ্ধ রাখা’। রমজানের শেষ দশক তথা ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগ থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাওয়া বা ৩০ রোজা পূর্ণ হয়ে ওইদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়া। মহল্লার কয়েকজন পুরুষ ইতিকাফের নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করবেন। কয়েকজন আদায় করলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। কেউ গুনাহগার হবে না। তবে যারা এ ইবাদত (ইতিকাফ) করবেন তারা বিশেষ সওয়াবের অধিকারী হবেন। আর যদি কেউই ইতিকাফ না করে, পাড়া-মহল্লার সবাই গুনাহগার হবে। শবেকদর প্রাপ্তির সুযোগ: ইতিকাফের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো শবেকদর প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।’ (বুখারি: ২০১৭)। যেহেতু ইতিকাফকারীরা রমজানের শেষ দশকে মসজিদেই অবস্থান করেন এবং সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে নিজেদের মগ্ন রাখেন, নিয়োজিত রাখেন নিজেদের আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে, বিধায় আশা করা যায় তারা শবেকদর পেয়ে যাবেন। এই ম

ইতিকাফে মুমিনের অভাবিত প্রাপ্তি
ইতিকাফ আরবি শব্দ। এর অর্থ, ‘আবদ্ধ করা, আবদ্ধ রাখা ও অবস্থান করা’। ইতিকাফের পারিভাষিক অর্থ, ‘ইতিকাফের নিয়তে নিজেকে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবদ্ধ রাখা’। রমজানের শেষ দশক তথা ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগ থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাওয়া বা ৩০ রোজা পূর্ণ হয়ে ওইদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়া। মহল্লার কয়েকজন পুরুষ ইতিকাফের নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করবেন। কয়েকজন আদায় করলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। কেউ গুনাহগার হবে না। তবে যারা এ ইবাদত (ইতিকাফ) করবেন তারা বিশেষ সওয়াবের অধিকারী হবেন। আর যদি কেউই ইতিকাফ না করে, পাড়া-মহল্লার সবাই গুনাহগার হবে। শবেকদর প্রাপ্তির সুযোগ: ইতিকাফের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো শবেকদর প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।’ (বুখারি: ২০১৭)। যেহেতু ইতিকাফকারীরা রমজানের শেষ দশকে মসজিদেই অবস্থান করেন এবং সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে নিজেদের মগ্ন রাখেন, নিয়োজিত রাখেন নিজেদের আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে, বিধায় আশা করা যায় তারা শবেকদর পেয়ে যাবেন। এই মহান বরকতময় রাতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগি ও তওবা-ইস্তিগফাররত থাকা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো নামাজ। এরপর কোরআন তেলাওয়াত, তসবিহ-তাহলিল ও তওবা-ইসতিগফার। শবেকদরে ফেরেশতারা দুনিয়ায় আসেন এবং ইবাদতরত বান্দাদের জন্য দোয়া করেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, ‘শবেকদরে হজরত জিবরাইল (আ.) এক দল ফেরেশতাসহ অবতীর্ণ হন এবং দাঁড়িয়ে বা বসে আল্লাহকে স্মরণরত প্রত্যেক বান্দার জন্য দোয়া করেন।’ (মেশকাত)। শবেকদরে ইবাদতের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি শবেকদরের পূর্ণ ইমান-বিশ্বাস ও সওয়াবের নিয়তে কিয়াম করে (অর্থাৎ নামাজে রত থাকে) তার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।’ (বুখারি, মুসলিম)। আর এ শবেকদরের রাতে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ একটি দোয়া রয়েছে তা হলো—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউবুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি, অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিজি: ৩৫১৩)। এ দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা। মসজিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা: ইতিকাফকারীরা ধারাবাহিকভাবে যখন দশ দিন মসজিদে অবস্থান করেন, স্বভাবতই মসজিদের সঙ্গে তাদের একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়, ভালোলাগা ও ভালোবাসা তৈরি হয়। এ সম্পর্ক হাশরের ময়দানে তাদের উপকৃত করবে। সম্মানের মুকুট পরাবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাত শ্রেণির মানুষদের আল্লাহতায়ালা হাশরের ময়দানে আরশের নিচে ছায়া দেবেন। তন্মধ্যে অন্যতম হলো যাদের হৃদয়টা মসজিদের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে।’ (বুখারি: ৩২১৫)। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা বান্দাদের ডেকে ডেকে বলবেন, আমার প্রতিবেশী লোকেরা কোথায়? তখন ফেরেশতারা বলবেন, আপনার প্রতিবেশী আবার কারা? তখন আল্লাহতায়ালা বলবেন, যারা দুনিয়াতে আমার ঘরের (মসজিদ) সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রেখেছে এবং মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১০/২০৩)। মসজিদে অবস্থান করলে মহান আল্লাহর রহমত লাভ করা যায়। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন আল্লাহর ঘর থেকে কোনো ঘরে একত্র হয়, যেখানে তারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে বা পরস্পর আলোচনা করে, তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল হতে থাকে, তাদের রহমত ঢেকে রাখে এবং ফেরেশতারা তাদের বেষ্টন করে রাখে। আর আল্লাহ নিকটবর্তী ফেরেশতাদের সঙ্গে তাদের নিয়ে আলোচনা করেন। আর যার আমল তাকে পিছিয়ে দেয়, তার বংশ তাকে এগিয়ে নেয় না।’ (মুসলিম: ২৬৯৯) গুনাহমুক্ত থাকার সৌভাগ্য: মসজিদের পরিবেশ ইবাদতের জন্য অনুকূল। গুনাহের কাজের প্রতিকূল। যার ফলে সহজেই গুনাহমুক্ত থাকা যায়। কারণ, মানবজীবনে পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। পরিবেশ মানুষকে প্রভাবান্বিত করে দারুণভাবে। এ কারণেই আল্লাহতায়ালার ইরশাদ হলো, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তওবা: আয়াত ১১৯) আত্মার প্রশান্তি: ইতিকাফকারী মসজিদের পরিবেশে থাকার কারণে হৃদয়ে সত্যিকারের এক প্রশান্তি অর্জন করেন। কারণ তারা আল্লাহতায়ালার স্মরণে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন, তসবিহ-তাহলিল ও জিকির-আজকারে মশগুল থাকেন। ফলে তাদের হৃদয়ের উৎকর্ষ সাধন হয় ও প্রশান্তি অর্জন হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তর শান্তি পায়।’ (সুরা রাদ: ২১)। নফল ইবাদতের সুযোগ: ইতিকাফের সবচেয়ে বড় একটি উপকার হচ্ছে, অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতের সুযোগ পাওয়া যায়। আর নফল ইবাদতের দ্বারা বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে যায়। যেমনটি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ বলেন, আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নিকটবর্তী হয় না। বান্দা নফল ইবাদতের দ্বারা আমার নিকটবর্তী হতে থাকবে।’ (বুখারি: ৬৫০২) সুন্নতে কিফায়া পালন: রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া। পুরো মহল্লার কিছু মানুষ আদায় করলেই সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। তবে যারা ইতিকাফে বসেন, তারা নবীজি (সা.)-এর এ সুন্নতটি অন্যের দ্বারা আদায় না করিয়ে, সরাসরি নিজেরাই আদায় করলেন (দুররে মুখতার: ২/৪৪০)। আল্লাহতায়ালা ইতিকাফের মাধ্যমে বর্ণিত কল্যাণগুলো লাভ করার তওফিক দান করুন। লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow