ইবিতে শিক্ষিকা হত্যা: অন্তর্দ্বন্দ্ব, বেতন ও অর্থ তছরুপের অভিযোগ পরিবারের

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিজকক্ষেই ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। গত ৪ মার্চ বুধবার বিকেল ৪টার দিকে বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। নিহত রুনার পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বেতন সংক্রান্ত বিরোধ ও অর্থ তছরুপের অভিযোগ এনেছেন এবং দ্রুততার সঙ্গে মূল কুশীলবদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। রুনা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিভাগটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অসহযোগিতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের শিকার হয়ে আসছিলেন বলে পরিবারের দাবি।অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুনি ফজলু শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বিভাগ থেকে তিনি মাসিক ছয় হাজার টাকা বেতন পেতেন। আসমা সাদিয়া রুনা সভাপতি হয়ে তার বেতন এক হাজার টাকা বাড়িয়ে সাত হাজার করেন। পরে বিভাগীয় অর্থসংকট কাটাতে গত বছরের নভেম্বরে একাডেমিক সিদ্ধান্তে ফজলুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিভাগ। এ অনুযায়ী তিনি ব

ইবিতে শিক্ষিকা হত্যা: অন্তর্দ্বন্দ্ব, বেতন ও অর্থ তছরুপের অভিযোগ পরিবারের

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিজকক্ষেই ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। গত ৪ মার্চ বুধবার বিকেল ৪টার দিকে বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। নিহত রুনার পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বেতন সংক্রান্ত বিরোধ ও অর্থ তছরুপের অভিযোগ এনেছেন এবং দ্রুততার সঙ্গে মূল কুশীলবদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। রুনা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিভাগটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অসহযোগিতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের শিকার হয়ে আসছিলেন বলে পরিবারের দাবি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুনি ফজলু শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বিভাগ থেকে তিনি মাসিক ছয় হাজার টাকা বেতন পেতেন। আসমা সাদিয়া রুনা সভাপতি হয়ে তার বেতন এক হাজার টাকা বাড়িয়ে সাত হাজার করেন। পরে বিভাগীয় অর্থসংকট কাটাতে গত বছরের নভেম্বরে একাডেমিক সিদ্ধান্তে ফজলুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিভাগ। এ অনুযায়ী তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছয় হাজার টাকা পেতেন। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে ফজলুর দাবির প্রেক্ষিতে বিভাগ থেকে চার হাজার বাড়িয়ে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে এতেও ফজলু সন্তুষ্ট না হয়ে আগের সাত হাজারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় হাজার মিলিয়ে মোট ১৩ হাজার টাকা দাবি করেন। এতে রুনার সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে ফজলু নিয়মিত রুনার সঙ্গে বেয়াদবি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও রুনার সঙ্গে ফজলুর বিভিন্ন বাজে আচরণের নজির থাকায় বিভাগ থেকে তাকে একাধিকবার লিখিত সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং ফজলু কয়েকবার লিখিতভাবে ক্ষমাও চান। আচরণে পরিবর্তন না আসায় অ্যাকাডেমিক সিদ্ধান্তে গত ১ ফেব্রুয়ারি তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়।

ফজলুকে বদলি করার পর তিনি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সভাপতি রুনার কাছে তাকে পুনর্বহালের অনুরোধ জানান। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা রুনার কাছে গেলে তিনি বলেন, "মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে অনেকবার ক্ষমা করেছি। এরপরও তোমরা তাকে রাখতে চাইলে আমি চেয়ারম্যানশিপ ছেড়ে দেব। আমি অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলায় সে আমাকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে। তার এসব অসদাচরণ কত সহ্য করব?"

ডিন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষিকা রুনা তার সহকর্মী শ্যাম সুন্দর সরকার (মামলার ২ নম্বর আসামি), সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার (মামলার ২ নম্বর আসামি) এবং নৈশপ্রহরী সুমন দ্বারা অসহযোগিতার শিকার হয়ে আসছিলেন। বিশ্বজিৎ কুমার সভাপতির কাছে বিভাগের হিসাবের ভাউচার-কাগজপত্র বুঝিয়ে না দিয়ে শুধুমাত্র স্বাক্ষর করে দিতে বলতেন। পরে বিশ্বজিৎ দাপ্তরিক কাজে অদক্ষ হওয়ায় তাকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলে বদলি করা হয়। বদলি হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রুনা একাধিকবার তাকে নতুন সহকারী রেজিস্ট্রার মোজাম্মেলকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বললেও তিনি তা গ্রাহ্য করেননি। এদিকে প্রায় দেড় বছর পেরোলেও সাবেক সভাপতি শ্যাম সুন্দর রুনাকে পূর্বের ভাউচার ও হিসাব-নিকাশের কাগজপত্র বুঝিয়ে দেননি। বিভাগ থেকে শ্যাম সুন্দরকে একাধিকবার অ্যাকাডেমিক মিটিং করে চিঠি দেওয়া হলেও তিনি তা আমলে নেননি। এ নিয়ে রুনার সঙ্গে শ্যাম সুন্দরের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বিশ্বজিতের প্ররোচনায় বিভাগের অন্য কর্মচারীরা রুনা ম্যামের সঙ্গে অসদাচরণ করতেন। শ্যাম সুন্দর স্যারও চাইতেন রুনা ম্যাম যেন সভাপতি হিসেবে সফল না হন। এছাড়া বিভাগের নৈশপ্রহরী সুমনও ম্যামের সঙ্গে বেয়াদবি এবং নির্দেশনা মানতেন না। তবে হাবিব স্যারের সঙ্গে ভেতরে বিরোধ থাকলে সেটিও বেরিয়ে আসুক।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. বেগম রোকসানা মিলি বলেন, ফজলু রুনার সঙ্গে অশালীন ও অসদাচরণ করতেন। এ বিষয়ে রুনা বহুবার অভিযোগ করলে কয়েকবার সমাধানও করেছিলাম। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের মাধ্যমেও সমাধান হয়। অনেকে বলছে ফজলুর ৮-৯ মাসের বেতন বকেয়া ছিল। আমি সাক্ষী তার এক মাসের বেতনও বাকি ছিল না। বরং রুনা অনেক চেষ্টা করে তাকে দৈনিক মজুরির অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরে অসদাচরণ ও বেতনসংক্রান্ত ঝামেলায় তাকে বদলি করা হয়।

ড. মিলি আরও বলেন, বিশ্বজিৎ রুনাকে শুধু হিসাব-নিকাশের কাগজ দিয়ে স্বাক্ষর করে দিতে বলতেন। এমনকি একবার আমার সামনেই তিনি রুনাকে ম্যাডাম না বলে 'সে' বলে সম্বোধন করেছেন। পরে বিশ্বজিৎ বিভাগীয় কাজে অদক্ষ হওয়ায় তাকে বদলি করা হয়। শ্যাম সুন্দরও তাকে অসহযোগিতা করতেন। এমনকি আগের অনেক হিসাব-নিকাশও তিনি বুঝিয়ে দেননি। এ বিষয়ে চিঠি দেওয়ার পরও শ্যাম সুন্দর বলতেন, "আমি যখন ইচ্ছা তখন দেব।" নৈশপ্রহরী সুমনও রুনার আদেশ মানতেন না। এ অভিযোগগুলো রুনা ডিন হিসেবে আমার কাছে অনেকবার করেছেন।

বিশ্বজিতের স্থলে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, "এক সপ্তাহ পার হলেও বিশ্বজিৎ আমাকে পূর্বের কাজ বুঝিয়ে দেননি। তাকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ তাকে অবহিত করার জন্য একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছিল।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow