ঈদ মানেই শিশুবেলার গল্প। ঈদ বা যে কোন উৎসবের রং ছোটবেলাতেই গাঢ় থাকে। বড় হতে থাকলে রঙটা ফিকে হয়ে যেতে থাকে। কারণ চোখের জলে, শোকের জলে উৎসবের রং ধুয়ে ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তখন ঈদের দিনে, উৎসবের দিনে আরও বেশি করে মনে পড়তে থাকে হারানো প্রিয় জনদের কথা। আমার যেমন মনে পড়ছে বাবার কথা।
শুধু বাবার কথা নয়, পাশাপাশি চাচা, মামা, খালা, ফুপু আর সকল প্রিয় আত্মীয় বন্ধুদের কথাও। যারা চলে গেছেন ওপারে। কত স্মৃতি, কত আনন্দ, কত উৎসবরাতির গল্প। কত অভিমান, কত না পাওয়া ও পাওয়ার জমিয়ে রাখা মোহরের রূপ।
ঈদ শুরু হয়ে যেত ‘চাঁন রাত’ থেকে। যখনি টিভি ও রেডিওতে বাজতো ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’।
তখন টিভি বলতে তো কেবল বিটিভি। সেখানে ঈদের অনুষ্ঠান দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম আমরা। ঈদের নাটক মানেই আমজাদ হোসেনের লেখা জব্বার আলী সিরিজ। আমজাদ হোসেন নিজেই অভিনয় করতেন নাম ভূমিকায়। কি অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন তিনি। আজ ভাবি, এই প্রতিভাবান মানুষটির পূর্ণ মূল্যায়ন অবশ্যই হয়নি। প্রতিবারই জব্বার আলী একটা না একটা দুর্নীতি করে ঈদের দিনটি হাজতে কাটাতো। নাটকের মধ্যে হাসি তামাশা যেমন থাকতো তেমনি সামাজিক বক্তব্যও থাকতো। ‘জবা কুসুম রোকন দোলনের মা’ বলে জব্বার আলী যখন হাঁক দিতো তখনি দর্শকদের মধ্যে হাসির ফোয়ারা বয়ে যেত।
ঈদে ছিল আনন্দমেলা। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের উইটি হিউমার খুব উপভোগ করতাম সবাই। তখন কিন্তু হিউমার মানে ভাঁড়ামি ছিল না। স্যার সবসময়েই বুদ্ধিদীপ্ত কথায় আনন্দ সৃষ্টি করতেন। আনন্দমেলা উপস্থাপনা করেছেন অনেক বছর। আনিসুল হকও ছিলেন দারুণ উপস্থাপক। তিনিও অনেক বছর আনন্দমেলা করেছেন। আনিসুল হকের অ্যাপিল ছিল দুর্দান্ত।
ঈদে বাংলা সিনেমাও দেখতাম মন দিয়ে।
চাঁন রাতে মেহেদি না পরলে মনে হতো ঈদ হবেই না। শীতকালে ঈদ হলে মা ঠান্ডা লাগার ভয়ে আমাকে মেহেদি পরার অনুমতি দিতে চাইতেন না। কিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা বেশিক্ষণ বহাল থাকতো না।তখন বাটা মেহেদির যুগ। হাতে গোল করে চাঁন তারা আঁকা হতো। আমার কাজিনরা সবাই ছিল মেহেদির নকশা আঁকায় ওস্তাদ। পাশের বাড়ির একটি মেয়ে ছিল ডলি। সেও আমার হাতে নকশা এঁকে দিত।
চানরাতে পরিবারের সবাই মিলে আমরা শপিংয়ে বের হবোই হবো। সারা মাস ধরে যত কেনাকাটাই হোক না কেন, চানরাতে কিছু না কিছু বাকি থাকবেই। চাঁন রাত থেকে ফেতরা দেওয়াও শুরু হয়ে যেত। যাকাত আগেই দেয়া হলেও কিছু শাড়ি, লুঙ্গি বাকি থাকতোই। সেগুলো চাঁন রাতে এসে চেনা পরিচিত গরীব মানুষরা নিয়ে যেতেন। তখন যাকাতের শাড়ি লুঙ্গি ছিল মিলের কাপড়। ঢাকেশ্বরী মিলের কাপড় কেনা হতো। সবুজ, নীল, মেরুন। এই তিনটি রঙই সারাজীবন দেখেছি।
আহা মনে পড়ছে আমাদের গৃহকর্মী ‘রেনুর মা’র কথা। পার্টটাইম কাজ করতেন। তাঁর কথা আলাদা করে একসময় অবশ্যই লিখবো। অসাধারণ গুণী মহিলা ছিলেন। তাঁকে আমার মা ঈদের জন্য একটা শাড়ি দিতেন। সেটা একটু ভালো মানের। আবার যাকাতের শাড়ি থেকেও একটা দিয়ে দিতেন। রেনুর মা সবসময় নীল রঙেরটা বেছে নিতেন। ফর্সা গায়ের রং, সুন্দর চেহারা। সারা জীবন অনেক কষ্ট করা সত্ত্বেও তার রূপ ছিল অটুট। সেই মানুষটিকে সেই এগারো হাত মিলের শাড়ি পরা অবস্থাতেই আমার মনে পড়ে।
ঈদের দিন নতুন কাপড় পরে আমরা চারজন(বাবা মা ভাইয়া ও আমি) আমাদের বেবি অস্টিন গাড়িতে চড়ে প্রথমে চকবাজারে দাদার বাড়ি। পরে সেগুনবাগিচায় নানুর বাড়ি। চকবাজারে আমার মেজচাচা ও লালচাচা থাকতেন। মেজচাচীকে প্রথমে সালাম করে শুরু হতো ঈদ। মেজচাচা, লালচাচা, চাচীকে সালাম করতাম। চাচাদের সালাম করে সালামী পাওয়া ছিল আরও মজার। চকের বাড়িতে সব আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা হতো। আর চকের মেলার মজা তো আছেই। চকের কেন্দ্রে একদম আমার দাদার বাড়ির(৭৯ বেগম বাজার) দরজা থেকেই মেলা বসে ছড়িয়ে পড়তো জেলখানার প্রধান ফটক অন্যদিকে উর্দুরোড আর চক মোগলটুলি অবধি। চকের মেলায় না গেলে ঈদের কোন মজাই হবে না। আমি তো একরাশ মাটির হাঁড়ি পাতিল, পুতুল কিনতাম ঝুড়ি ভরে। মনে আছে একবার ঈদে জ্বর ছিল বলে বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। পরদিন মেজচাচী এক ঝুড়ি খেলনা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমার জন্য।
বাড়ির সঙ্গেই রাস্তার উপরে মেলা। তাই মেলায় একবার নয়, বহুবার ছুটে ছুটে যাওয়া হচ্ছে। মেলায় আমার সঙ্গে অবশ্য রহমতভাই অথবা আমার বড়ভাই(উদয়) থাকছেন। যাতে হারিয়ে না যাই। মন্টুমামা, সন্তুমামা(এরা মেজচাচীর সহোদর এবং বাবার খালাতোভাই) তাদের পরিবার নিয়ে চলে এসেছেন ঈদ উদযাপনে। মন্টুমামার মেয়ে ডালিয়া আমার সমবয়সী।
ডালিয়া খুব ফর্সা আর হাসিখুশি মেয়ে। ডালিয়া-ভ্যালিয়া মিলে সারা বাড়িতে ছুটোছুটি চলছে। সন্তুমামার মেয়ে শান্তা আমাদের চেয়ে অনেক ছোট। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনও সন্তুমামা বিয়ে করেননি। তিনি অসম্ভব ভালো এবং শিশুদের সঙ্গে মিশে যাওয়া একজন মানুষ। তিনিও মেতে আছেন আমাদের সঙ্গে(আসলে, তিনি লক্ষ্য রাখছেন যেন আমরা পড়ে-টরে না যাই)। আছে দুষ্টুর শিরোমণি আমার চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ। নিত্যনতুন খেলনার খবর জানাতে আর দুষ্টুমীর কায়দা কানুন বের করতে তার জুড়ি নেই। চকের মেলা থেকে অবশ্য অবশ্যই কেনা হয়েছে ঢোল, ডুগডুগি, কটকট শব্দ করা টিনের মাছ-ডুগডুগি, দড়িটানা ড্যাং ড্যাং গাড়ি, লাঠি লাগানো টিনের প্রজাপতি যেটা চালালে কটকট শব্দ হয়। মোটকথা কানের গোড়ায় যত রকম শব্দ করা সম্ভব তা আমরা করে যাচ্ছি এবং বড়দের মাথা খারাপ করার পক্ষে তা যথেষ্ট।
একবার ঈদে এই শব্দদূষণ এতটাই মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, সন্তুমামা একটি বুদ্ধি করেন। তিনি কি একটা কায়দা করে ডুগডুগি গাড়ির ড্যাং ড্যাং শব্দ করার কাঠিগুলো খুলে ফেলেন। অন্যান্য খেলনা থেকেও কিভাবে যেন উচ্চ শব্দ বের হওয়া বন্ধ করে দেন।
চকের মেলা থেকে কেনা খেলনার মধ্যে আরও ছিল বাঁশি, কাগজের সাপ, ঘাড়ে স্প্রিং বসানো বুড়োবুড়ি, মাটির পুতুল, মাটির ও টিনের হাড়ি পাতিলের সেট ইত্যাদি। ঢাকায় যে কোন নতুন খেলনা আসরেই সেটি প্রথম পাওয়া যেত চকের মেলায়। নব্বই দশকে দেখেছি ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট থেকে আসা অসংখ্য চীনা খেলনা।
চকের মেলায় নাগরদোলার আয়োজন ছিল। জেলখানার প্রাচীরের পাশেই বসানো হতো এই নাগরদোলা। জেলখানার সামনে থেকে শুরু হয়ে মেলা ছড়িয়ে পড়তো চক সার্কুলার রোড, উর্দু রোড, বেগম বাজারের গলি, মৌলভি বাজার পর্যন্ত। পুরানো ঢাকার প্রত্যেক মহল্লাতেই ছোট ছোট খেলনার দোকানও বসতো ঈদে।
সেগুনবাগিচায় নানীর বাড়িতেও ঈদের আনন্দ জমতো খুব। খালাতো, মামাতো ভাইবোনেরা মিলে কি যে খেলা আর গল্প। ঈদের দিন সবাই আইসক্রিম খেতো। কিন্তু আমার খাওয়া ছিল নিষেধ। তবু খুব লুকিয়ে খেয়ে ফেলতাম বৈকি।
মেলা থেকে কেনা বাদাম তক্তি আর মুরলীও খাওয়ার শখ ছিল। এগুলোও লুকিয়ে খেতে হতো। কারণ মায়ের মতে এগুলো মাছি ও ধুলোপড়া, ‘পেট খারাপের জঞ্জাল’।
আশির দশকের দিকে আমার খালু(ডা. এম এ করিম) চলে যান জুরাইনে বাড়ি করে। বিউটিখালা ও খালু ছিলেন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় আত্মীয়। তাই তখন থেকে ঈদে বেড়ানোর তালিকায় জুড়াইনও যোগ হয়ে যায়।
ঈদে আমরা বড়চাচার নর্থব্রুকহল রোডের বাড়িতে আর সেজচাচার লালমাটিয়ার বাড়িতেও যেতাম বৈকি। বড়ফুপুর বাড়িতেও যাওয়া হতো। সেটি ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে।
ছোটবেলা থেকে যত দিন গেল আস্তে আস্তে হারিয়ে যাওয়া শুরু করলেন আত্মীয়রা। প্রথমে চলে গেলেন নানু। তারপর চাচা, মা, খালা, ফুপু, খালু, চাচী,মামী সকলেই চলে গেছেন অন্য ভুবনে। চাচীদের মধ্যে এখন শুধু বেঁচে আছেন লালচাচী। আর আছেন আমার মা। স্মৃতিহারা অবস্থায়।
চলে গেছেন প্রিয় মেজআপা, মনোয়ারভাই, খোকনভাই। আরও কত কাজিনরা চলে গেছেন।
যারা আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, আমার জন্য দোয়া করতেন তারা হারিয়ে গেছেন। বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর পর থেকে ঈদের আনন্দটাই পুরো ফিকে হয়ে গেছে। নতুন কাপড় পরে সালাম করার মতো মুরুব্বি, গুরুজনরা চলে গেছেন।
ঈদের সময়ে তাই বসে বসে কেবল ভাবি হারানো দিনগুলোর কথা।