ঈদের আনন্দ যেন যাত্রাপথের ভোগান্তিতেই শেষ না হয়

ঈদ মানেই ঘরে ফেরা। প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন সময়। রাজধানীর ব্যস্ত অফিসপাড়া থেকে শুরু করে পোশাক কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা শ্রমঘন শিল্পাঞ্চল—সবখানেই এখন এক অদৃশ্য টান কাজ করছে। কেউ গ্রামের মায়ের হাতে রান্না করা খাবারের স্বাদ নিতে চান, কেউবা বহুদিন পর সন্তানের মুখে হাসি দেখতে। কিন্তু বাংলাদেশে ঈদযাত্রা যতটা আনন্দের হওয়ার কথা, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয় ভোগান্তি, ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ পরীক্ষায়। আগামী ২৮ মে দেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে। সরকার সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক কোটি মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবারও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রার কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তুতি এখনো দৃশ্যমান নয়। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে উন্নয়নকাজ চলছে, কোথাও সেতু নির্মাণ, কোথাও রাস্তা প্রশস্তকরণ, কোথাও কালভার্ট সংস্কার। স্বাভাবিক সময়েই যেসব স্থানে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়, ঈদের চাপে সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে—এটি অনুমান করতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিভিন্ন বছরের পর্যবেক্ষণে দে

ঈদের আনন্দ যেন যাত্রাপথের ভোগান্তিতেই শেষ না হয়

ঈদ মানেই ঘরে ফেরা। প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন সময়। রাজধানীর ব্যস্ত অফিসপাড়া থেকে শুরু করে পোশাক কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা শ্রমঘন শিল্পাঞ্চল—সবখানেই এখন এক অদৃশ্য টান কাজ করছে। কেউ গ্রামের মায়ের হাতে রান্না করা খাবারের স্বাদ নিতে চান, কেউবা বহুদিন পর সন্তানের মুখে হাসি দেখতে। কিন্তু বাংলাদেশে ঈদযাত্রা যতটা আনন্দের হওয়ার কথা, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয় ভোগান্তি, ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ পরীক্ষায়।

আগামী ২৮ মে দেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে। সরকার সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক কোটি মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবারও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রার কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তুতি এখনো দৃশ্যমান নয়। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে উন্নয়নকাজ চলছে, কোথাও সেতু নির্মাণ, কোথাও রাস্তা প্রশস্তকরণ, কোথাও কালভার্ট সংস্কার। স্বাভাবিক সময়েই যেসব স্থানে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়, ঈদের চাপে সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে—এটি অনুমান করতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিভিন্ন বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঈদের আগে ও পরে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এক ধরনের নিয়মিত দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছর আগে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে মানুষকে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত যানজটে আটকে থাকতে হয়েছিল। অনেক পরিবার শিশু ও বৃদ্ধ সদস্য নিয়ে মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এত অভিজ্ঞতার পরও কেন আমরা প্রতি ঈদে একই সংকটের পুনরাবৃত্তি দেখি?

এর অন্যতম কারণ পরিকল্পনার ঘাটতি। আমাদের দেশে ঈদযাত্রাকে এখনো একটি ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ হিসেবে দেখা হয়, অথচ এটি প্রতি বছরের পূর্বনির্ধারিত জাতীয় বাস্তবতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় উৎসব বা ছুটিকে কেন্দ্র করে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চীনে চন্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে বিশ্বের বৃহত্তম মানবস্থানান্তর ঘটে। সে সময় রেল, সড়ক ও বিমান চলাচলকে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করা হয়। জাপানে গোল্ডেন উইক বা দক্ষিণ কোরিয়ায় চুসক উৎসবের সময় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি, সময়ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের মাধ্যমে চাপ কমানো হয়। বাংলাদেশেও ঈদযাত্রাকে একই গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত অপারেশন হিসেবে দেখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো চলমান সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজ। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সময়জ্ঞানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের আগে মহাসড়কে খোঁড়াখুঁড়ি বা অসমাপ্ত প্রকল্প মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অতীতে দেখা গেছে, সামান্য একটি নির্মাণাধীন অংশ পুরো মহাসড়কে কয়েক কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি করেছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ঈদযাত্রার অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় সড়ককাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। যেসব অংশে কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়, সেগুলোতে বিকল্প লেন ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু অবকাঠামো নয়, দুর্বল ব্যবস্থাপনাও বড় সংকট। ঈদের সময় মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহন নামে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, যাত্রীবাহী বাস—সব মিলিয়ে সড়কে এক ধরনের বিশৃঙ্খল চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে গরুবাহী ট্রাক ও পশুর হাট কেন্দ্র করে মহাসড়কের অনেক অংশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। সড়কের পাশে অস্থায়ী পশুর হাট বসানো, অবৈধ পার্কিং কিংবা হাইওয়ের ওপর পশু নামানো যান চলাচলকে বিপজ্জনক করে তোলে। প্রশাসনকে এক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে। মহাসড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিত পশুর হাট বসতে দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট স্থানে হাট স্থাপন, ট্রাক চলাচলের সময় নির্ধারণ এবং পশুবাহী যানবাহনের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা জরুরি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো গণপরিবহনের শৃঙ্খলাহীনতা। অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া, ফিটনেসবিহীন বাস চলাচল, অনভিজ্ঞ চালক এবং বেপরোয়া গতি ঈদের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, ক্লান্ত চালক এবং দীর্ঘ সময় টানা গাড়ি চালানোও দুর্ঘটনার বড় কারণ। তাই চালকদের জন্য নির্ধারিত বিশ্রামব্যবস্থা, ফিটনেস যাচাই এবং অতিরিক্ত ট্রিপের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি শুধু টোলপ্লাজা বা চেকপোস্টে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; ঝুঁকিপূর্ণ অংশে মোবাইল টহল ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা জরুরি।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার, নিরাপদ টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি বা জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রায় নেই বললেই চলে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের শিকার হন। জাতীয় মহাসড়কগুলোর নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর অস্থায়ী মেডিকেল বুথ, মোবাইল টয়লেট ও বিশ্রামকেন্দ্র স্থাপন করা গেলে যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেক কমবে। উন্নয়ন শুধু সড়ক নির্মাণ নয়; যাত্রাপথকে মানবিক করাও উন্নয়নের অংশ।

ঈদযাত্রায় রেলপথ ও নৌপথকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে সড়কের চাপ অনেক কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রেল টিকিট পাওয়া দুরূহ, অনলাইন ব্যবস্থাপনায় নানা অভিযোগ, আবার অনেক নৌঘাটে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা থাকে। অথচ বাংলাদেশে নদীপথের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক নৌপরিবহন, নিরাপদ টার্মিনাল ও সময়নিষ্ঠ সেবা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ বিকল্প পরিবহনের প্রতি আগ্রহী হবে। একইভাবে রেলওয়েতে অতিরিক্ত বগি সংযোজন, বিশেষ ট্রেন চালু এবং কালোবাজারি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জরুরি।

এখনকার যুগে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা শুধু পুলিশের বাঁশির ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রযুক্তিভিত্তিক রিয়েল-টাইম ট্রাফিক মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় যানজট তৈরি হচ্ছে, কোন রুটে চাপ বাড়ছে, কোথায় দুর্ঘটনা ঘটেছে—এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাত্রীদের জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, এফএম রেডিও এবং ডিজিটাল সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বিকল্প পথের তথ্য দিলে অনেক চাপ কমানো সম্ভব। উন্নত দেশগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখন তথ্যনির্ভর; বাংলাদেশকেও সেই পথে হাঁটতে হবে।

ঈদযাত্রার আরেকটি অবহেলিত দিক হলো মানবিক সুবিধা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার, নিরাপদ টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি বা জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রায় নেই বললেই চলে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের শিকার হন। জাতীয় মহাসড়কগুলোর নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর অস্থায়ী মেডিকেল বুথ, মোবাইল টয়লেট ও বিশ্রামকেন্দ্র স্থাপন করা গেলে যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেক কমবে। উন্নয়ন শুধু সড়ক নির্মাণ নয়; যাত্রাপথকে মানবিক করাও উন্নয়নের অংশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমন্বয়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, রেলওয়ে, বিআইডব্লিউটিএ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। প্রায়ই দেখা যায়, এক সংস্থা কাজ করছে কিন্তু অন্য সংস্থা সে অনুযায়ী প্রস্তুত নয়। ফলে সংকট আরও বাড়ে। তাই ঈদযাত্রা কেন্দ্র করে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যা ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবে।

এখানে নাগরিক সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক যাত্রী শেষ মুহূর্তে রওয়ানা দেন, আবার কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক বা খোলা পিকআপে ভ্রমণ করেন। অতিরিক্ত চাপের একটি বড় কারণ হলো একই দিনে বিপুল মানুষের যাত্রা শুরু করা। যদি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে ছুটি কার্যকর করে এবং মানুষ পরিকল্পিতভাবে যাত্রা করে, তাহলে চাপ কিছুটা কমতে পারে। একইভাবে মোটরসাইকেলে দীর্ঘ দূরত্বে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রের পথে এগোতে চায়। বড় বড় সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল সেই অগ্রযাত্রার প্রতীক। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অবকাঠামোর আকারে নয়; মানুষের যাত্রা কতটা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সম্মানজনক—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঈদযাত্রা যদি প্রতি বছর আতঙ্ক, ক্লান্তি ও ভোগান্তির প্রতিশব্দ হয়, তাহলে আমাদের উন্নয়নের বয়ানে একটি বড় ঘাটতি থেকেই যায়।

মানুষ ঈদে বাড়ি যায় আনন্দ নিয়ে, দুর্ভোগের জন্য নয়। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকের সেই যাত্রা নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখা। কারণ সড়কে আটকে থাকা প্রতিটি বাসের ভেতরে থাকে কারও মায়ের অপেক্ষা, কারও সন্তানের স্বপ্ন, কারও বৃদ্ধ বাবার নিঃশ্বাস। ঈদের আনন্দ যেন যাত্রাপথেই নিঃশেষ না হয়ে যায়—এ দায়িত্ব রাষ্ট্র, প্রশাসন, পরিবহন খাত এবং নাগরিক—সবার। এবার অন্তত এমন এক ঈদযাত্রা হোক, যেখানে ঘরে ফেরার গল্পগুলো ক্লান্তির নয়, স্বস্তির হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow