কল্পনার মাঠে বিশ্বকাপ দেখেন রাবির দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনায় চার বছর পরপর কোটি কোটি মানুষ যখন এলইডি স্ক্রিন, মোবাইল কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেন, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। চোখে খেলা দেখতে না পারলেও ধারাভাষ্য, বন্ধুদের বর্ণনা, দর্শকদের উল্লাস আর কল্পনার রঙে তারাও গড়ে তোলেন নিজেদের এক অনন্য ফুটবল-জগৎ। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে গত ১১ জুন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এই তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের পর্দা নামবে ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে। ৪৮ দল নিয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উন্মাদনা। সেই উন্মাদনায় পিছিয়ে নেই রাবির দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরাও। অন্যান্য শিক্ষার্থীরা যখন রাত জেগে ফুটবল দেখেন, তখন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল খেলা নিছক দৃশ্যমান কোনো বিনোদন নয় বরং এটি শব্দ, উত্তেজনা ও আবেগের এক দারুণ মিলনমেলা। তাদের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, উত্তেজনা ও অংশগ্রহণের অনুভূতি। টেলিভিশনের দৃশ্য কিংবা জায়ান্ট স্ক্রিনে দে

কল্পনার মাঠে বিশ্বকাপ দেখেন রাবির দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনায় চার বছর পরপর কোটি কোটি মানুষ যখন এলইডি স্ক্রিন, মোবাইল কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেন, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। চোখে খেলা দেখতে না পারলেও ধারাভাষ্য, বন্ধুদের বর্ণনা, দর্শকদের উল্লাস আর কল্পনার রঙে তারাও গড়ে তোলেন নিজেদের এক অনন্য ফুটবল-জগৎ।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে গত ১১ জুন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এই তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের পর্দা নামবে ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে। ৪৮ দল নিয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উন্মাদনা। সেই উন্মাদনায় পিছিয়ে নেই রাবির দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরাও।

অন্যান্য শিক্ষার্থীরা যখন রাত জেগে ফুটবল দেখেন, তখন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল খেলা নিছক দৃশ্যমান কোনো বিনোদন নয় বরং এটি শব্দ, উত্তেজনা ও আবেগের এক দারুণ মিলনমেলা। তাদের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, উত্তেজনা ও অংশগ্রহণের অনুভূতি। টেলিভিশনের দৃশ্য কিংবা জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখতে না পারলেও তারা রেডিও, টিভির ধারাভাষ্য কিংবা মোবাইলের লাইভ অডিও শুনে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত কল্পনায় আঁকেন।

‘মনের চোখে পুরো খেলাটা কল্পনা করি’

ইতিহাস বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সোহরাওয়ার্দী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নাইম হোসেন বলেন, ‘ছোটোবেলা থেকেই ফুটবল অনুসরণ করি। তখন রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনতাম, এখনো ইংরেজি ধারাভাষ্য শুনেই খেলা উপভোগ করি। আমার কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি কল্পনার এক জগৎ। ধারাভাষ্য শুনে মনের চোখে কল্পনা করি ফ্রি-কিক কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, খেলোয়াড়রা কীভাবে পাস দিচ্ছে, আক্রমণ গড়ে তুলছে বা রক্ষণ সামলাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ছোটোবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। আর্জেন্টিনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করি না। দৃষ্টিশক্তি নেই, কিন্তু ফুটবল উপভোগ করার ক্ষেত্রে এটিকে কখনো বাধা মনে করি না। কারণ মনের চোখে পুরো খেলাটাই কল্পনা করে দেখতে পাই। বিশেষ করে গোল হওয়ার আগে ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে যখন উত্তেজনা বাড়তে থাকে, তখন মনে হয় যেন আমিও মাঠের গ্যালারিতে বসে আছি।’

‘ফুটবলের ভালোবাসাই আমার বিশ্বকাপ দেখার শক্তি’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ওসামা হোসেন নাহিদ বলেন, ‘চোখে খুব বেশি দেখতে পাই না, তবে কিছুটা দৃষ্টি রয়েছে। পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করে খেলা দেখার চেষ্টা করি। অনেকেই মনে করেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশ্বকাপ উপভোগ করা কঠিন, কিন্তু আমার কাছে ফুটবল শুধু দেখার বিষয় নয়, অনুভব করার বিষয়।’

নাহিদ বলেন, ‘খেলা ভালোভাবে দেখতে প্রতিটি ম্যাচ শুরুর এক থেকে দেড় ঘণ্টা আগে বড় পর্দার সামনে গিয়ে বসি। সামনের দিকে জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত যতটা সম্ভব উপভোগ করতে পারি। আমার আবেগ, আনন্দ বা উত্তেজনা অন্যদের মতোই। ফুটবল আমাকে আনন্দ দেয় এবং সবার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ করে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, আমি ব্রাজিলের সমর্থক। এবারের বিশ্বকাপে প্রিয় দল বিদায় নেওয়ায় কষ্ট পেয়েছি। তবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। যারা ভালো খেলেছে এবং পরবর্তী ধাপে উঠেছে, তাদের অভিনন্দন জানাই। ফুটবল শুধু জয়-পরাজয়ের খেলা নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ ও মিলনের একটি উৎসব। আমি বিশ্বাস করি, চোখের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা ও অনুভূতির কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।’

‘হৃদয়ের ক্যানভাসেই বিশ্বকাপ দেখি’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা কখনো এই খেলার প্রতি আমার ভালোবাসাকে আটকে রাখতে পারেনি। আমরা যারা পুরোপুরি পরিষ্কারভাবে চোখে দেখতে পাই না, আমাদের কাছে ফুটবল খেলাটি ধরা দেয় শব্দের ছন্দে, ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠের উত্তেজনায় এবং চারপাশের দর্শকদের উল্লাসে। রেফারির বাঁশি, গ্যালারির গর্জন আর বলের শব্দ শুনেই মনের ক্যানভাসে পুরো স্টেডিয়ামের একটা ছবি এঁকে ফেলি। যখন একটা গোল হয়, তখন সেই আনন্দের কম্পন আমরাও সমানভাবে অনুভব করি।

হাবিবুর বলেন, ‘একজন আর্জেন্টিনা-সমর্থক হিসেবে ফুটবল নিয়ে আরও বেশি গর্বিত। এই তো সম্প্রতি মিশর এবং আর্জেন্টিনার মধ্যকার রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি উপভোগ করেছি। তবে এত আনন্দের মধ্যেও বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা রয়ে যায় যে, কেন এই বিশ্বমঞ্চে প্রিয় মাতৃভূমি নেই। দোয়া করি, হামজা ভাইদের বিশ্বমঞ্চে খুব শিগগিরই দেখব।’

তিনি আরও বলেন, ‘খেলাধুলা যেন কোনো একক গোষ্ঠীর না হয় বরং আমাদের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্যও যেন শ্রবণনির্ভর বা উপযোগী খেলার পরিবেশ আরও উন্নত করা হয় সেটিই আমার অন্যতম প্রত্যাশা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফুটবল আমার কাছে একটি সার্বজনীন ভাষা, যা অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে আমাদের মনের ভেতর আনন্দের আলো ছড়িয়ে দেয়। চোখে না দেখেও বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী হই।’

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলিফ বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় মাঠে বা টেলিভিশনে ফুটবল ম্যাচ স্পষ্টভাবে দেখতে অনেক কষ্ট হয়। তাই খেলার অনেক মুহূর্ত অন্যদের বর্ণনা বা ধারাভাষ্যের মাধ্যমে বুঝতে হয়। তারপরও ফুটবলের প্রতি আমার ভালোবাসা কমেনি। আমাদের এলাকায় আর্জেন্টিনার সমর্থক বেশি ছিল। তাদের ট্রলের জবাব দিতেই আমি ব্রাজিলকে সমর্থন করা শুরু করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনুভূতিটা একেবারেই আলাদা। হামজা চৌধুরী ও জামাল ভূঁইয়াদের মতো খেলোয়াড়দের দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ একদিন অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলবে। এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ১–০ গোলের জয় আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ফুটবল মুহূর্তগুলোর একটি।’

মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা সুলতানা বলেন, ‘ফুটবল মূলত একটি দৃশ্যনির্ভর খেলা। তাই যাদের দৃষ্টিশক্তি নেই, তারা অন্যদের মতো সরাসরি খেলা দেখতে পারেন না। তবে তারা বন্ধুদের বর্ণনা, দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবং ধারাভাষ্য শুনে খেলার আনন্দে অংশগ্রহণ করেন ও ম্যাচটি কল্পনার মাধ্যমে উপভোগ করেন। বর্তমানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ফুটবলকে আরও সহজে দেখার বা অনুভব করার মতো কোনো বিশেষ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে সম্পর্কে জানা নেই।’

তবে প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন হলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দর্শকদের জন্য খেলা উপভোগ করা সহজ হবে বলে মনে করেন তারা। বিশেষ করে অডিও ডেসক্রিপশন সুবিধাসহ সরাসরি সম্প্রচার চালু হলে মাঠের দৃশ্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল প্রমাণ করে, খেলার আনন্দ কেবল চোখে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনুভূতি, কল্পনা এবং ভালোবাসা দিয়েও ফুটবলের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিহীন এই শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা সেই সত্যকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

এসজেডএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow