গফরগাঁওয়ে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়, বাড়ছে প্রত্যাশা

একসময় ভাঙাচোরা সড়ক, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত সংকটে পিছিয়ে থাকা ময়মনসিংহের গফরগাঁও এখন উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ থেকে শুরু করে সড়ক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় একের পর এক প্রকল্প ঘিরে বদলে যেতে শুরু করেছে পুরো জনপদের চিত্র। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলকে আধুনিক জনপদে রূপ দিতে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে বহুগুণ। ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত গফরগাঁও দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। কৃষি উৎপাদন, জনসংখ্যা, ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও উন্নয়নের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল এ জনপদ। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বিজয়ী হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সড়ক উন্নয়নের একাধিক প্রকল্প পাঠানো হয়। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প অনুমো

গফরগাঁওয়ে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়, বাড়ছে প্রত্যাশা

একসময় ভাঙাচোরা সড়ক, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত সংকটে পিছিয়ে থাকা ময়মনসিংহের গফরগাঁও এখন উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ থেকে শুরু করে সড়ক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় একের পর এক প্রকল্প ঘিরে বদলে যেতে শুরু করেছে পুরো জনপদের চিত্র। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলকে আধুনিক জনপদে রূপ দিতে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে বহুগুণ।

ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত গফরগাঁও দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। কৃষি উৎপাদন, জনসংখ্যা, ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও উন্নয়নের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল এ জনপদ।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বিজয়ী হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সড়ক উন্নয়নের একাধিক প্রকল্প পাঠানো হয়। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের পথে রয়েছে, আবার কয়েকটির বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হলো নতুন ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে গফরগাঁও উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের আটটি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলে ভূমি, কৃষি, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। প্রশাসনিক সেবা নিতে আর উপজেলা সদরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে না।

স্থানীয় প্রবীণ আব্দুল কাদের বলেন, গফরগাঁও অনেক বড় উপজেলা। একটি কাজের জন্য অনেক দূরে যেতে হয়। দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা হলে মানুষের সময় ও খরচ দুটোই কমবে।

স্বাস্থ্য খাতেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা, নতুন দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলায় আরও একটি ১০১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ, ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপন, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র সংস্কার, নার্সিং ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি), সার্ভেয়ার ইনস্টিটিউট এবং দুই উপজেলায় দুটি মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গৃহিণী রওশন আরা বলেন, সাধারণ চিকিৎসার জন্যও অনেক সময় ময়মনসিংহ যেতে হয়। এখানে বড় হাসপাতাল হলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গফরগাঁও-দেওয়ানগঞ্জ সড়কের সংস্কার শেষ হয়েছে। শিবগঞ্জ-গয়েশপুর, গয়েশপুর-বারইহাটি, খান বাহাদুর ইসমাইল হোসেন সড়ক এবং সালটিয়া-যশরা সড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে।

এ ছাড়া মাওনা-ত্রিমোহনী-পাগলা বাজার-গফরগাঁও সড়ক, টোক-টোক থেকে খান বাহাদুর ইসমাইল হোসেন সড়ক এবং মাওনা-ত্রিমোহনী-পাগলা-গফরগাঁও-হোসেনপুর-কটিয়াদী-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গফরগাঁওয়ের সঙ্গে গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের যোগাযোগে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, ভালো সড়ক মানে শুধু যাতায়াত সহজ হওয়া নয়। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে।

গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নয়নের আওতায় এসেছে। বিভিন্ন ইউনিয়নের সড়ক সংস্কারের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দত্তের বাজার-মুনিয়ারিকান্দা সেতু, শিলা সেতু, মুখী-বিরুনিয়া সেতু এবং সুতারচাপুরে স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়িত হলে বহু বছরের যোগাযোগ সংকট দূর হবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।

কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, আগে ধান-সবজি বাজারে নিতে অনেক কষ্ট হতো। রাস্তা ভালো হলে সময়ও বাঁচবে, খরচও কমবে।

শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলাকার উন্নয়ন শুধু রাস্তা দিয়ে হয় না। দক্ষ জনশক্তি গড়তে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই।

গফরগাঁও ইতিহাস ও ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলনের শহীদ আব্দুল জব্বারের জন্মস্থান এ উপজেলার বর্তমান জব্বারনগর গ্রামে গড়ে উঠেছে ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। এছাড়া ঐতিহাসিক পাঁচবাগ জামে মসজিদ, তেরশ্রীর প্রাচীন স্থাপত্য এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এ অঞ্চলের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

গফরগাঁও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মো. ইসহাক বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই গফরগাঁও ও দক্ষিণ গফরগাঁওয়ে প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এলাকায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।

পাগলা থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এ কে এম আনছার উদ্দিন বলেন, দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের পথে এসেছে। পাশাপাশি সড়ক, শিক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমও দৃশ্যমান হয়েছে।

ময়মনসিংহ-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু জাগো নিউজকে বলেন, গফরগাঁও ও দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের উন্নয়নে আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক অবকাঠামো একসঙ্গে উন্নত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে একের পর এক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমার লক্ষ্য গফরগাঁও ও দক্ষিণ গফরগাঁওকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত, শিল্পায়নসমৃদ্ধ, আধুনিক ও পরিকল্পিত অঞ্চলে পরিণত করা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘোষিত ও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে গফরগাঁও শুধু ময়মনসিংহের নয়, উত্তর-মধ্যাঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হবে। উন্নত যোগাযোগ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, সম্প্রসারিত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সুফল মিললে বদলে যাবে এই জনপদের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান।

হোসাইন সুলভ/এনএইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow