জন্মান্ধ রাজুর চোখে আলো না থাকলেও স্বপ্ন অনেক

‘বাদাম লাগবে? বুট লাগবে?’ বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রতিদিনই ভেসে আসে এই হাঁক। কণ্ঠটি খুব পরিচিত। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। গলায় ঝুলছে লোহার সরু একটি রিং। সেই রিংয়ে থরে থরে সাজানো বাদাম, ভাজা ছোলা ও চানাচুরের ছোট ছোট প্যাকেট। হাতে অন্ধের যষ্টি লাঠিতে ভর করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন তিনি। চোখে আলো নেই। তাই কে বাদাম কিনলেন, কে হাতে টাকা দিলেন তা দেখার উপায়ও নেই। তবু মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অটুট। কেউ বাদাম কিনে হাতে টাকা তুলে দিলে তা না গুনেই পকেটে রেখে দেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই দীর্ঘ পথচলায় সেই বিশ্বাসে কখনো বড় ধাক্কাও আসেনি। পরিষদে আসা অনেকেই দূর থেকে ডাক দেন রাজু কেমন আছ? মুখে হাসি ফুটিয়ে তার সহজ উত্তর ভালো আছি। রাজুর চোখে মুখে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। আরও পড়ুন যে বয়সে ছেলের হাত ধরে হাঁটার কথা সে বয়সে করছেন বাঁচার লড়াই চল্লিশোর্ধ্ব দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রাজু আহমেদ দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পশ্চিম জয়দেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আজিজার রহমান। রাজুর এই ছোট্ট ব্যবসার আয়েই চলে স্ত্রীসহ তিন-চার সদস্যের সংসার। ১৮ বছর ধরে বিরামপু

জন্মান্ধ রাজুর চোখে আলো না থাকলেও স্বপ্ন অনেক

‘বাদাম লাগবে? বুট লাগবে?’ বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রতিদিনই ভেসে আসে এই হাঁক। কণ্ঠটি খুব পরিচিত। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। গলায় ঝুলছে লোহার সরু একটি রিং। সেই রিংয়ে থরে থরে সাজানো বাদাম, ভাজা ছোলা ও চানাচুরের ছোট ছোট প্যাকেট। হাতে অন্ধের যষ্টি লাঠিতে ভর করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন তিনি।

চোখে আলো নেই। তাই কে বাদাম কিনলেন, কে হাতে টাকা দিলেন তা দেখার উপায়ও নেই। তবু মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অটুট। কেউ বাদাম কিনে হাতে টাকা তুলে দিলে তা না গুনেই পকেটে রেখে দেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই দীর্ঘ পথচলায় সেই বিশ্বাসে কখনো বড় ধাক্কাও আসেনি।

পরিষদে আসা অনেকেই দূর থেকে ডাক দেন রাজু কেমন আছ? মুখে হাসি ফুটিয়ে তার সহজ উত্তর ভালো আছি। রাজুর চোখে মুখে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

চল্লিশোর্ধ্ব দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রাজু আহমেদ দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পশ্চিম জয়দেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আজিজার রহমান। রাজুর এই ছোট্ট ব্যবসার আয়েই চলে স্ত্রীসহ তিন-চার সদস্যের সংসার। ১৮ বছর ধরে বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বাদাম, ছোলা ও চানাচুর বিক্রি করছেন তিনি।

জন্মান্ধ রাজু চোখের আলো হারালেও হারাননি স্বপ্ন। ছোটবেলায় স্থানীয় একটি হাফেজিয়া মাদরাসায় পড়তেন রাজু। স্বপ্ন ছিল হাফেজ হওয়ার। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের বাস্তবতা তার স্বপ্নের পথে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়। অভাবের সংসারে বাবার পক্ষে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হয়নি। থেমে যায় হাফেজ হওয়ার স্বপ্নও।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিপ্রতি রাজুর জীবনের পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। চোখের আলো না থাকায় গ্রামের মানুষও তাকে কাজ দিতে চাইতেন না। পরিবারে বোঝা হয়ে থাকার কষ্ট তাকে ভেতর থেকে তাড়িয়ে বেড়াত। এক সময় শুরু করেন বাদাম বিক্রি।

বাদাম বিক্রি শুরু করার সময় অনেকেই তাকে ভয় দেখিয়েছিলেন, করেছিলেন তাচ্ছিল্য। অনেকেই বলেছিল তুমি তো চোখে দেখো না। কেউ বাদাম নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে গেলে বুঝবে কীভাবে? ব্যবসার পুঁজি হারাবে, আরও কত কী? কিন্তু মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখেই গলায় বাদামের রিং ঝুলিয়ে নেমে পড়েছিলেন জীবনের নতুন যুদ্ধে। আজ ১৮ বছর ধরে সেই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসের সামনে কথা হয় জন্মান্ধ রাজুর সঙ্গে। তিনি বলেন, তার সঙ্গে কখনো এমন হয়নি যে কেউ বাদাম নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে গেছে। বরং অনেক সময় ১০ টাকার বাদাম কিনে কেউ কেউ খুশি হয়ে তার হাতে ২০ টাকাও তুলে দিয়েছেন।

রাজু বলেন, বর্তমানে বাদামের পাশাপাশি ভাজা ছোলা ও চানাচুরও বিক্রি করা হয়। দিন শেষে আয় হয় প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এই আয় দিয়েই চলে সংসারের নিত্যদিনের খরচ।

তিনি বলেন, দিন শেষে বাড়ি ফেরার পথে দিনের আয় থেকে শহরের মুদিখানা থেকে কাঁচা বাদাম ও ছোলা কিনে নিয়ে যান। বাড়িতে সেগুলো চুলায় ভেজে প্রস্তুত করেন তার স্ত্রী। এরপর ১০ টাকা দামের ছোট ছোট প্যাকেট তৈরি করে সেগুলো লোহার রিংয়ে গেঁথে দেন। পরদিন আবার সেই প্যাকেট গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন রাজু। জীবনের এই চক্রে নেই কোনো ছুটি। নেই ক্লান্তির কাছে আত্মসমর্পণ। আছে শুধু টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেননি কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে রাজু বলেন, ভিক্ষা করলে হাত পাততে হবে। বাদাম বিক্রি করাই সম্মানের, এতে সামাজিক মর্যাদাও ঠিক থাকে।

রাজুর পরিবারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার বাবা ও ভাই অন্যের জমিতে কাজ করেন। মা মানুষের বাড়িতে কাজ করলেও সন্তানসম্ভবা স্ত্রী বাড়িতেই থাকেন।

কথার ফাঁকে হতাশার ঢোক গিলে রাজু বলেন, উপজেলা পরিষদ বন্ধের দিন ও দুর্যোগের দিনে কমে যায় বিক্রি। সেদিন ৫০ থেকে ১০০ টাকা আয় হয়। অফিস খোলার দিন উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানুষের আনাগোনা থাকায় বিক্রি বাড়ে।

রাজু বলেন, দিন শেষে আয় কম হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে দিনের আয়ের হিসাব দিই। এতে ওই দুই কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সহায়তাও করেন।

জন্মান্ধ রাজুর বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিরামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলা পরিষদে রাজু বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। এটা আমাদের জন্য ভালো খবর। সমাজে জন্মান্ধরা এভাবে কাজ করে আত্মনির্ভরশীল হবে এটাই চাওয়া।

তিনি জানান, যেদিন রাজুর বাদাম বিক্রি কম হয়, সেদিন তিনি তার অফিসে আসেন। তখন তাকে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করা হয়। পাশাপাশি সরকারি সুবিধাগুলোও তাকে দেওয়া হচ্ছে। রাজুর জন্য ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিনা খাতুন জানান, রাজু দীর্ঘদিন ধরে পরিষদে বাদামের পাশাপাশি চানাচুর, বুটসহ কয়েক প্রকার খাদ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার চাওয়া খুব সাধারণ। সে নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করে পরিবার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে আছেন।

মো. মাহাবুর রহমান/এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow