ড. ইউনূস যাওয়ার বেলায় কিছু কী দিয়ে গেলেন, নাকি নীরবে চলে গেলেন

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে অবস্থান নেন। ক্ষমতার হঠাৎ শূন্যতা রাষ্ট্রকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। প্রশাসন কার্যত ক্লান্ত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব শূন্য, রাস্তায় উত্তেজনা, প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থাহীন। এমন এক সময়ে দেশ প্রবেশ করে এক গভীর অন্তর্বর্তী পর্বে। এই প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সামনে আনা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, যিনি দেশে বিতর্কিত হলেও ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে অক্ষত। বলা হয়েছিল, জাতীয় সংকটে তিনি হবেন ঐকমত্যের প্রতীক। বহু মানুষ তাকে সমমানের সঙ্গে বরণ করেছে, প্রত্যাশা ছিল যে তিনি সংকটকালে ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব দেবেন। তিনি দায়িত্ব নেন নিজের মনোনীত কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে। দেশের অবস্থা ছিল চরম কঠিন। ক্লান্ত প্রশাসন, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আস্থাহীন ব্যাংকিং খাত, অর্থপাচারের অভিযোগে উত্তাল জনমত, মুখোমুখি রাজনীতি, রাষ্ট্র তখন শুধুমাত্র একজন প্রশাসক নয়, খুঁজছিল নৈতিক আস্থার প্রতীক। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্

ড. ইউনূস যাওয়ার বেলায় কিছু কী দিয়ে গেলেন, নাকি নীরবে চলে গেলেন

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে অবস্থান নেন। ক্ষমতার হঠাৎ শূন্যতা রাষ্ট্রকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। প্রশাসন কার্যত ক্লান্ত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব শূন্য, রাস্তায় উত্তেজনা, প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থাহীন। এমন এক সময়ে দেশ প্রবেশ করে এক গভীর অন্তর্বর্তী পর্বে।
এই প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সামনে আনা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, যিনি দেশে বিতর্কিত হলেও ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে অক্ষত। বলা হয়েছিল, জাতীয় সংকটে তিনি হবেন ঐকমত্যের প্রতীক। বহু মানুষ তাকে সমমানের সঙ্গে বরণ করেছে, প্রত্যাশা ছিল যে তিনি সংকটকালে ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব দেবেন।


তিনি দায়িত্ব নেন নিজের মনোনীত কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে। দেশের অবস্থা ছিল চরম কঠিন। ক্লান্ত প্রশাসন, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আস্থাহীন ব্যাংকিং খাত, অর্থপাচারের অভিযোগে উত্তাল জনমত, মুখোমুখি রাজনীতি, রাষ্ট্র তখন শুধুমাত্র একজন প্রশাসক নয়, খুঁজছিল নৈতিক আস্থার প্রতীক।

সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

আমি তখন তাকে নিয়ে লিখেছিলাম। আজ আবার লিখছি, বিদায়ের মুহূর্তে। সেই লেখা ছিল আশা পূর্ণ, সতর্কতারও। আজ, তিনি দায়িত্ব ছেড়েছেন। আবার লিখছি। এবার প্রশ্ন আরও বড়, আরও গভীর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুটি প্রবণতা স্পষ্ট। এক পক্ষ দেবত্ব আরোপ করে, অন্য পক্ষ শত্রু নির্মাণ। ড. ইউনূসকে ঘিরেও এর ব্যতিক্রম নেই। কেউ তাঁকে ত্রাণকর্তা বলেন, কেউ সন্দেহের চোখে দেখেন। বাস্তবতা সবসময় মাঝখানে।


অর্থনীতি আংশিক ঘুরেছে, তবে কাঠামোগত সংস্কার এখনো চলমান। মতপ্রকাশ কিছুটা উন্মুক্ত হয়েছে, কিন্তু আইনি সংস্কার পূর্ণ নয়। নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। এই জটিলতার ভেতরেই তাঁর মূল্যায়ন করতে হবে।


বড় প্রশ্ন এখানেই, রাষ্ট্র ক্লান্ত, রিজার্ভ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছিল, ব্যাংকিং খাত আস্থাহীন, জনগণ ক্ষুব্ধ, রাজনীতি মুখোমুখি। রাষ্ট্র তখন প্রশাসক নয়, প্রতীক খুঁজছিল। বিশ্বে স্বীকৃত, দেশে বিতর্কিত, কিন্তু ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে অক্ষত একজন মানুষ। ইতিহাসে কখনও কখনও ব্যক্তি হয়ে ওঠে সময়ের প্রয়োজন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই প্রয়োজন।


তার বিরুদ্ধে মতভেদ দীর্ঘদিনের। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক সুনাম উজ্জ্বল, দেশে রাজনৈতিক ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ও সমর্থন, দুটিই প্রবল। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক আচরণ, বিরোধী পক্ষের প্রতি মনোভাব, নির্বাচনী অঙ্গীকার, সবই তার শাসনকালকে ঘিরে বিস্তৃত আলোচনার বিষয়।


ড. ইউনূসের সময়ে দেশের গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত পরিবেশ পেয়েছে, এমন দাবি সমর্থকদের। টেলিভিশন টকশো, পত্রিকার সম্পাদকীয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরকারবিরোধী মতপ্রকাশে তুলনামূলক কম বাধা ছিল। কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে, মতপ্রকাশের ক্ষেত্র কিছুটা প্রশস্ত হয়েছে।


তবে সমালোচকরা বলেন, কাঠামোগত পরিবর্তন বা দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া পরিবেশগত শিথিলতা টেকসই স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা, রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি সংক্রান্ত আইনগুলোর প্রয়োগ ও সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ দূর হয়নি। প্রশ্ন রয়ে গেছে, এটি নীতিগত পরিবর্তন নাকি সাময়িক প্রশাসনিক নমনীয়তা।


রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণেও তার সময় বিশেষভাবে আলোচিত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সম্মান প্রদর্শন এবং তারেক রহমানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, এই পদক্ষেপগুলো অনেকে প্রতিহিংসাহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত মনে করেন। সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন, এটি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার অংশ নাকি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রতিফলন।


নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতে এবং প্রবাসী ভোটাধিকারের প্রসার ঘটেছে। সমর্থকরা এটিকে গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিদর্শন মনে করেন। তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণের মাত্রা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক ছিল। নির্বাচন আয়োজন যথেষ্ট হলেও রাজনৈতিক আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি।


ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত। বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন। তবে দেশীয় রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সবসময় অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যে রূপ নেয় না। তাই প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেউ দেখেন সংস্কারের সূচনা হিসেবে, আবার কেউ সীমিত প্রভাবের অন্তর্বর্তী উদ্যোগ হিসেবে।


বিদায়ের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তিনটি, এক, এক বছরের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রটোকল দেওয়া; দুই, রাষ্ট্রপতি পদের সম্ভাব্য দায়িত্ব; তিন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সম্ভাব্য ভূমিকা।


রাষ্ট্রীয় প্রটোকল কেবল নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক সংকেত। এটি যদি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হয়, তবে নজির স্থাপন হবে। অন্যথায় বিতর্কের জন্ম হবে।


ভারতের ভূমিকা নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও বাস্তবতা স্বার্থনির্ভর। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানি বণ্টন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, এগুলো প্রধান। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হলে ভারতের সমর্থন নিশ্চিত হবে এমন সরল সমীকরণ বাস্তবসম্মত নয়।
ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে তিনটি শর্ত জরুরি, প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ন্যূনতম সমঝোতা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য, এবং তার নিজস্ব আগ্রহ ও সম্মতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সর্বসম্মত রাষ্ট্রপতি প্রায় অসম্ভব। তবে অসম্ভব শব্দ ইতিহাসে কখনও ভেঙেছে, জনসংখ্যার আবেগ নয়, সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা জরুরি।


জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ভূমিকায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিশেষ ভূমিকা নিতে সক্ষম। সামাজিক ব্যবসা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়নে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। তবে জাতিসংঘের উচ্চ পদগুলোর জন্য রাজনৈতিক সমর্থন ও আঞ্চলিক ভারসাম্য অপরিহার্য।


গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় ব্যক্তিগত মালিকানা না রাখা, অলাভজনক কাঠামো, দরিদ্র গ্রাহকের অংশীদারিত্ব, এই নৈতিক অবস্থান তাঁকে আলাদা করেছে। ক্ষুদ্রঋণের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়ের পথ অগ্রাহ্য করেছেন।

শেষ বিচার, সংকটকালে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ নাকি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জাগরণের সূচনা, উত্তর নির্ভর করবে কাঠামোগত ফলাফল, যেমন ব্যাংকিং সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের আইনি নিরাপত্তা, নির্বাচন ও আস্থাভিত্তিক গণতন্ত্র। যদি এই কাঠামোগত রূপান্তর স্থায়ী হয়, ইতিহাস এটিকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অধ্যায় হিসেবে লিখবে। অন্যথায় এটি উজ্জ্বল কিন্তু সাময়িক বিরতি।
ইতিহাস ব্যক্তি দিয়ে শুরু হয় না, ব্যক্তি দিয়ে শেষও হয় না। ইতিহাস টিকে থাকে তখনই, যখন জাতি সংকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এখন প্রশ্ন ড. ইউনূস নয়, প্রশ্ন বাংলাদেশ। আমরা কি ব্যক্তি নির্ভর রাজনীতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রে উঠতে পারব? আমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করব, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করব?


ইতিহাস অপেক্ষা করছে। আমরা তা লিখব না, আমরা তা বাঁচাব।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow