ধর্ষণের বিরুদ্ধে নীরবতা নয়, হোক প্রতিরোধ
ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক পরাজয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং এর ভয়ংকর ফল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা এবং ধর্ষণের পর হত্যার যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, তা শুধু সংবাদ নয়; এগুলো আমাদের বিবেকের সামনে রাখা রক্তাক্ত আয়না। একটি সমাজ কতটা নিরাপদ, তা বোঝা যায় তার শিশু, নারী ও দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে। আজ সেই নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে; জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে, ১৪ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। একই সঙ্গে পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অচেনা মানুষ নয়; প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, স্থানীয় প্রভাবশালী বা পরিচিত কেউ। শিশুরা যাদের বিশ্বাস করে, যাদের সামনে নির্ভয়ে চলা
ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক পরাজয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং এর ভয়ংকর ফল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা এবং ধর্ষণের পর হত্যার যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, তা শুধু সংবাদ নয়; এগুলো আমাদের বিবেকের সামনে রাখা রক্তাক্ত আয়না। একটি সমাজ কতটা নিরাপদ, তা বোঝা যায় তার শিশু, নারী ও দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে। আজ সেই নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে; জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে, ১৪ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। একই সঙ্গে পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অচেনা মানুষ নয়; প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, স্থানীয় প্রভাবশালী বা পরিচিত কেউ। শিশুরা যাদের বিশ্বাস করে, যাদের সামনে নির্ভয়ে চলাফেরা করার কথা, সেই পরিচিত মুখই কখনো কখনো হয়ে উঠছে হিংস্র শিকারি। মুন্সিগঞ্জে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা-এসব ঘটনা আমাদের বলে দেয়, বিপদ শুধু অন্ধকার রাস্তায় নয়; বিপদ ঘরের কাছেও, সম্পর্কের ভেতরেও, পরিচয়ের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে।
নরসিংদীতে, যেখানে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার পর এক কিশোরীকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে, তা খুবই দুঃখজনক। এই ধরনের ঘটনা শুধু অপরাধ নয়; এটি বিচার চাওয়ার অধিকারকেও হত্যা করার চেষ্টা। যখন ভুক্তভোগী বা তার পরিবার বিচার চাইতে গিয়ে আরও হামলা, অপহরণ বা হত্যার শিকার হয়, তখন সমাজে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। অপরাধী তখন শুধু একজন ব্যক্তিকে আঘাত করে না; সে পুরো সমাজকে বার্তা দেয় ‘চুপ থাকো।’ আর এই চুপ করিয়ে দেওয়ার রাজনীতিই ধর্ষণ সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন অপরাধ বারবার ঘটছে? উত্তর একক নয়। এর পেছনে আছে বিচারহীনতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত, সামাজিক নীরবতা, রাজনৈতিক প্রভাব, মাদকাসক্তি, বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং পারিবারিক-শিক্ষাগত মূল্যবোধের অবক্ষয়। ধর্ষণকে শুধু ‘কামপ্রবৃত্তির অপরাধ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ক্ষমতা, দখলদারত্ব, সহিংসতা এবং মানুষকে মানুষ না ভাবার মানসিকতার ফল। এটি শুধু আইনগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট।
আইন থাকা সত্ত্বেও যদি অপরাধী শাস্তি না পায়, তবে আইন কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। বিচারকের মতামত অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে দেশে আইন থাকলেও মূল সংকট হলো সঠিক প্রয়োগ, দুর্বল তদন্ত, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি। তদন্তে ত্রুটি থাকলে আদালতের সদিচ্ছা থাকলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রথম দাবি হওয়া উচিত—শুধু কঠোর আইন নয়, কঠোর ও দক্ষ প্রয়োগ।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানে শুধু শাস্তির দাবি নয়; এটি মানবিক সমাজ পুনর্গঠনের দাবি। যে সমাজে শিশু নিরাপদ নয়, সে সমাজ উন্নত নয়। যে রাষ্ট্রে নারী বিচার চাইতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র ন্যায়ভিত্তিক নয়। তাই আজ আমাদের উচ্চারণ হতে হবে স্পষ্ট: ধর্ষকের কোনো পরিচয় নেই, কোনো দল নেই, কোনো ক্ষমা নেই। নীরবতা নয়—প্রতিরোধ। ভয় নয়—ন্যায়বিচার। আর প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।
আমরা প্রায়ই দেখি, একটি ঘটনা ঘটার পর সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় ওঠে, মিছিল হয়, বিবৃতি আসে, তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার শান্ত হতে পারে না। তাদের জীবন থেমে যায় আদালত, থানা, লোকলজ্জা, ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতার গোলকধাঁধায়। তাই ক্ষণিকের প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক সামাজিক প্রতিরোধ। প্রতিটি স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মস্থল, পাড়া-মহল্লা এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোকে শিশুবান্ধব ও নারী-নিরাপদ করতে হবে।
প্রতিরোধের শুরু পরিবার থেকে, কিন্তু দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। শিশুদের চুপ থাকতে শেখানো নয়, নিরাপদে কথা বলতে শেখাতে হবে। ভালো স্পর্শ-মন্দ স্পর্শ, ব্যক্তিগত সীমানা, বিপদে কার কাছে যাবে—এসব বিষয় বয়স অনুযায়ী শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, জেন্ডার-সংবেদনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। যে সমাজ যৌনতা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পায়, সেই সমাজ যৌন সহিংসতা প্রতিরোধেও পিছিয়ে থাকে।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণের পর সমাজের একাংশ প্রথমেই প্রশ্ন তোলে, সে কোথায় ছিল, কী পোশাক পরেছিল, কেন একা ছিল, কেন আগে বলেনি। এই প্রশ্নগুলো অপরাধীর বিরুদ্ধে নয়, ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে যায়। ফলে অনেক পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। ধর্ষণের দায় কেবল ধর্ষকের; কোনো নারী বা শিশুর পোশাক, বয়স, অবস্থান, সম্পর্ক বা নীরবতা কখনোই অপরাধীর পক্ষে যুক্তি হতে পারে না।
রাষ্ট্রকে এখন প্রতীকী আশ্বাসের বাইরে গিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত তদন্ত, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা, শিশুবান্ধব আদালত, পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং প্রভাবশালী আসামির ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থবল বা সামাজিক প্রভাব যেন কোনো অপরাধীকে রক্ষা করতে না পারে—এটাই জিরো টলারেন্সের বাস্তব পরীক্ষা।
সমাজকেও নিজের দায় নিতে হবে। প্রতিবেশী যদি সন্দেহজনক আচরণ করে, শিক্ষক যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে, স্থানীয় প্রভাবশালী যদি মামলা ধামাচাপা দিতে চায়—তখন চুপ থাকা মানে অপরাধকে সহায়তা করা। মসজিদ, মন্দির, স্কুল, স্থানীয় ক্লাব, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন—সবাইকে একসঙ্গে শিশু ও নারীর নিরাপত্তার পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানে শুধু শাস্তির দাবি নয়; এটি মানবিক সমাজ পুনর্গঠনের দাবি। যে সমাজে শিশু নিরাপদ নয়, সে সমাজ উন্নত নয়। যে রাষ্ট্রে নারী বিচার চাইতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র ন্যায়ভিত্তিক নয়। তাই আজ আমাদের উচ্চারণ হতে হবে স্পষ্ট: ধর্ষকের কোনো পরিচয় নেই, কোনো দল নেই, কোনো ক্ষমা নেই। নীরবতা নয়—প্রতিরোধ। ভয় নয়—ন্যায়বিচার। আর প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
এইচআর/এমএফএ/এমএস
What's Your Reaction?