নির্ভরতার ছায়াময় বটবৃক্ষ ‘বাবা’
পৃথিবীতে একটি শিশুর প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম ভরসা এবং প্রথম শক্তির উৎস হলো তার বাবা। সন্তানের চোখে বাবা যেন এক বিশাল আকাশ, যার ছায়াতলে সে নির্ভয়ে বেড়ে ওঠে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মাঝেও বাবা সন্তানের জন্য হয়ে ওঠেন এক অটল আশ্রয়, এক নির্ভরতার নাম। একটি শিশুর জন্মের পর তার ছোট-বড় সব চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবার শ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসা। সন্তান যখন কথা বলতে শেখে না, তখনও বাবা তার প্রয়োজন বুঝে নেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। কখনো সন্তানের আবদার পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কখনো কঠোর শাসনের মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, আবার কখনো কোমল মমতায় বুকের মধ্যে আগলে রাখেন। বাবার এই কঠোরতা আসলে ভালোবাসারই আরেকটি রূপ। কারণ একজন সত্যিকারের বাবা জানেন, শুধু আদর দিয়ে নয়, সুশাসন ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই একজন সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সমাজে মায়ের ভালোবাসা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, যা অবশ্যই মায়ের প্রাপ্য। কিন্তু বাবার ভালোবাসা অনেক সময় নীরব ও প্রচ্ছন্ন থেকে যায়। বাবা সাধারণত নিজের অনুভূ
পৃথিবীতে একটি শিশুর প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম ভরসা এবং প্রথম শক্তির উৎস হলো তার বাবা। সন্তানের চোখে বাবা যেন এক বিশাল আকাশ, যার ছায়াতলে সে নির্ভয়ে বেড়ে ওঠে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মাঝেও বাবা সন্তানের জন্য হয়ে ওঠেন এক অটল আশ্রয়, এক নির্ভরতার নাম।
একটি শিশুর জন্মের পর তার ছোট-বড় সব চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবার শ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসা। সন্তান যখন কথা বলতে শেখে না, তখনও বাবা তার প্রয়োজন বুঝে নেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। কখনো সন্তানের আবদার পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কখনো কঠোর শাসনের মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, আবার কখনো কোমল মমতায় বুকের মধ্যে আগলে রাখেন। বাবার এই কঠোরতা আসলে ভালোবাসারই আরেকটি রূপ। কারণ একজন সত্যিকারের বাবা জানেন, শুধু আদর দিয়ে নয়, সুশাসন ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই একজন সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
আমাদের সমাজে মায়ের ভালোবাসা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, যা অবশ্যই মায়ের প্রাপ্য। কিন্তু বাবার ভালোবাসা অনেক সময় নীরব ও প্রচ্ছন্ন থেকে যায়। বাবা সাধারণত নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন না। তিনি চোখের জল লুকিয়ে রাখেন, কষ্ট গোপন করেন, উদ্বেগ নিজের মধ্যে ধারণ করেন। কিন্তু তার প্রতিটি চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সন্তান। সন্তান যেন ভালো থাকে, সুস্থ থাকে, প্রতিষ্ঠিত হয়—এই স্বপ্নই বাবাকে দিনরাত পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করে। তাই বলা যায়, বাবার ভালোবাসা অনেকটা নদীর গভীর স্রোতের মতো, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু তার শক্তি ও প্রভাব সর্বত্র অনুভূত হয়।
বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি
ইসলাম পিতার এই অসামান্য অবদান ও মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের পারিবারিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার জন্য বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। একজন সন্তানের ওপর পিতার অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা কোরআন ও হাদিসের বহু স্থানে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামে পিতাকে শুধু পরিবারপ্রধান হিসেবে নয়, বরং সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বংশপরিচয়ের ক্ষেত্রেও ইসলাম পিতার মর্যাদাকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছে। একজন মানুষের পরিচয় তার পিতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই ইসলামে জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে নিজের বংশীয় পরিচয় যুক্ত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি সম্মান বা শ্রদ্ধার বশবর্তী হয়েও অন্য কাউকে নিজের পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অনুমতি নেই। এই বিধানের মাধ্যমে ইসলাম বংশের বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছে এবং পিতার মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পিতার মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি এবং বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি নিহিত।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৮৯৯) এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পিতার সঙ্গে সম্পর্ক কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। যে সন্তান তার বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তার কথা শোনে এবং তার কল্যাণ কামনা করে, সে মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথেই অগ্রসর হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বহুবার বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে তিনি বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’
এই আয়াতের গভীরতা আমাদের বিস্মিত করে। আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে বাবা-মায়ের মর্যাদা কতটা উচ্চ। বিশেষ করে বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের প্রতি আরও বেশি ধৈর্য, সহানুভূতি ও সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ শৈশবে তারা যেমন আমাদের অসহায় অবস্থায় লালন-পালন করেছেন, বার্ধক্যে তারাও আমাদের যত্ন ও সহমর্মিতার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন।
মৃত বাবার প্রতি দায়িত্ব
সন্তানের দায়িত্ব শুধু পিতার জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম মৃত্যুর পরও পিতার প্রতি দায়িত্ব পালনের শিক্ষা দিয়েছে। অনেক সময় মানুষ মনে করে, বাবা মারা গেলে তার প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে বাবার মৃত্যুর পরও সন্তানের জন্য অনেক দায়িত্ব অবশিষ্ট থাকে।
একবার এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করার পরও কি তাদের প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের অঙ্গীকার পূরণ করা, তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের বন্ধুদের সম্মান করা।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৪) এই হাদিস আমাদের সামনে পিতৃসেবার এক বিস্তৃত ধারণা তুলে ধরে।
পিতার জন্য দোয়া করা সন্তানের অন্যতম বড় দায়িত্ব। সন্তানের দোয়া পিতার জন্য মৃত্যুর পরও কল্যাণ বয়ে আনে। একজন নেককার সন্তানের দোয়া মৃত পিতার আমলনামায় সওয়াব যোগ করতে থাকে। তাই মৃত পিতার জন্য শুধু শোক প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; বরং তার জন্য নিয়মিত মাগফিরাতের দোয়া করা উচিত।
এ ছাড়া পিতার অসমাপ্ত দায়িত্ব বা অঙ্গীকার পূরণ করাও সন্তানের কর্তব্য। একজন বাবা জীবদ্দশায় যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যেতে পারেননি, সন্তান যদি তা পূরণ করে, তবে সেটি তার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে পিতার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের সম্মান করা পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই অংশ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো পিতার বন্ধুদের সম্মান করার বিষয়টি। একজন মানুষের বন্ধু তার জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। তারা জীবনের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী। তাই পিতার বন্ধুদের সম্মান করা মানে পিতার স্মৃতি ও মর্যাদাকে সম্মান করা। অনেক সময় দেখা যায়, পিতা মৃত্যুবরণ করার পর তার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো তাদের খোঁজখবর নেওয়া, সম্মান করা এবং সম্ভব হলে তাদের উপকার করা।
বাবা এক ছায়াময় বটবৃক্ষ
বাবাকে অনেকেই বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেন। এই উপমা সত্যিই অত্যন্ত অর্থবহ। একটি বটগাছ যেমন বিশাল ছায়া বিস্তার করে মানুষকে আশ্রয় দেয়, তেমনি বাবা তার পরিবারকে নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভালোবাসার ছায়ায় আবৃত রাখেন। ঝড়-ঝঞ্ঝা, রোদ-বৃষ্টি কিংবা জীবনের নানা সংকটের মধ্যেও তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, যাতে তার সন্তানরা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে। সন্তানরা হয়তো সবসময় বুঝতে পারে না, কিন্তু তাদের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে বাবার অগণিত ত্যাগ ও নির্ঘুম রাত লুকিয়ে থাকে।
আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে কর্মজীবন শুরু করার পর আমরা অনেকে বাবার সঙ্গে কথা বলার সময়ও বের করতে পারি না। অথচ এক সময় এই মানুষটিই আমাদের জন্য নিজের জীবনকে তিলে তিলে শেষ করেছেন। তাই আদর্শ সন্তান হিসেবে আমাদের উচিত বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার প্রয়োজনের খোঁজ নেওয়া এবং সর্বোপরি তার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

মৃত বাবা-মায়ের প্রতি ৪ কর্তব্য
বাবা পৃথিবীর সেই মহামূল্যবান নেয়ামত, যার মূল্য অনেকেই উপলব্ধি করে তখন, যখন তিনি আর পাশে থাকেন না। তাই যতদিন বাবা বেঁচে আছেন, ততদিন তার সান্নিধ্যকে মূল্যায়ন করা, তার জন্য দোয়া করা এবং তাকে ভালোবাসা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। আর তিনি যদি পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তার জন্য মাগফিরাত কামনা করা, তার অসমাপ্ত কাজ পূরণ করা এবং তার প্রিয় মানুষদের সম্মান করা—এগুলোই হবে তার প্রতি আমাদের সত্যিকারের ভালোবাসার প্রকাশ। বাবা আসলেই জীবনের বটবৃক্ষ; যার ছায়া আমাদের জীবনকে শীতল, নিরাপদ ও সুন্দর করে তোলে।
ওএফএফ
What's Your Reaction?
