নিষিদ্ধ জালে অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ

চলছে বর্ষা মৌসুম। হাওর, নদী, খাল ও বিল পানিতে টইটম্বুর। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার হবিগঞ্জের হাওরগুলোতে কিছুটা আগেই পানি এসেছে। বৈশাখ মাস থেকেই টানা বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় তখন থেকেই চারদিকে পানিতে থইথই অবস্থা। কিন্তু এত পানি থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দেশীয় প্রজাতির মাছ। নিষিদ্ধ রিং, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশীয় প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। শুধু মাছই নয়, হাওরের উপকারী ব্যাঙ, পোকামাকড় ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়েছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। জেলা শহরের উপকণ্ঠের হাওরগুলোতেও এসব নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার চোখে পড়লেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য অফিস থাকলেও তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা দেখা যায় না’ আরও পড়ুন চায়না দুয়ারির ফাঁদে অস্তিত্ব সংকটে দেশীয় মাছ সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার নয়টি উপজেলার প্রায় সব হাওরেই দেশীয় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। ব

নিষিদ্ধ জালে অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ

চলছে বর্ষা মৌসুম। হাওর, নদী, খাল ও বিল পানিতে টইটম্বুর। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার হবিগঞ্জের হাওরগুলোতে কিছুটা আগেই পানি এসেছে। বৈশাখ মাস থেকেই টানা বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় তখন থেকেই চারদিকে পানিতে থইথই অবস্থা। কিন্তু এত পানি থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দেশীয় প্রজাতির মাছ।

নিষিদ্ধ রিং, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশীয় প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। শুধু মাছই নয়, হাওরের উপকারী ব্যাঙ, পোকামাকড় ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়েছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। জেলা শহরের উপকণ্ঠের হাওরগুলোতেও এসব নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার চোখে পড়লেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য অফিস থাকলেও তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা দেখা যায় না’

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার নয়টি উপজেলার প্রায় সব হাওরেই দেশীয় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারেও উঠছে না আগের মতো দেশীয় সুস্বাদু মাছ। বিশেষ করে ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বানিয়াচং, লাখাই, আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরগুলোতে দেশীয় মাছের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তবে মাছ কমে গেলেও হাওরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, রিং জাল ও চায়না দুয়ারি। এসব জালে মাছ, কাঁকড়া এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণী নির্বিচারে ধরা পড়ে মারা যাচ্ছে। একবার কোনো প্রাণী এসব জালে আটকা পড়লে সহজে বের হতে পারে না।

হাওরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে নতুন পানি এলেই শোল, গজার, টেংরা, পাবদা, কৈ, বোয়াল, আইড়, মাগুর, পুঁটি, শিং, বাইম, চিংড়ি, বাইলা ও নানিসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন সেই মাছের দেখা খুব কমই মেলে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা, ডিমওয়ালা মা-মাছ, এমনকি মাছের ডিমও নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে।

নিষিদ্ধ জালে অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ
লাখাইয়ে বাড়ির পাশেই হাওরে নিষিদ্ধ রিং জাল পেতে রাখা হয়েছে/ ছবি- জাগো নিউজ

এ ছাড়া হেমন্ত মৌসুমে হাওর, খাল, বিল ও নদীর পানি শুকিয়ে গেলে মাছ ধরতে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এতে মাটিতে থাকা মাছের ডিমও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং হাওরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

এ অবস্থায় দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা এবং মা-মাছ নিধন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন হাওরবাসী। তাদের মতে, নিষিদ্ধ জালের বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

‘দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা এবং মা-মাছ নিধন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন হাওরবাসী। তাদের মতে, নিষিদ্ধ জালের বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে’

বানিয়াচং উপজেলার শতমুখা গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আগে আষাঢ় মাসে নতুন পানি এলেই নানা ধরনের দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছের স্বাদ ছিল অতুলনীয়। এখন প্রত্যন্ত এলাকাতেও দেশীয় মাছ তেমন পাওয়া যায় না। যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর দামও অনেক বেশি। প্রায় সব বাজারেই এখন চাষের মাছের আধিক্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘মা-মাছ ও পোনা নিধনের কারণেই মাছের সংখ্যা বাড়ছে না। নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ছোট ছোট মাছ ধরা হচ্ছে। ফলে মাছ বড় হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। দিন দিন হাওরের সুস্বাদু দেশীয় মাছ কমে যাচ্ছে।’

একসময় বর্ষা মৌসুমে হাওরে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন সেই চিত্র নেই। গ্রামে-গঞ্জেও এখন চাষের মাছই বেশি দেখা যায় বলে মন্তব্য করেন লাখাই উপজেলার স্বজনগ্রামের রফিক উদ্দিন।

তিনি আরও বলেন, ‘হাওরে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারের কারণেই মাছ কমে যাচ্ছে। পুরো হাওরজুড়ে এসব জাল ব্যবহার করা হচ্ছে। জালে আটকা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক মাছ মারা যায়। বাজারে পৌঁছানোর আগেই অনেক মাছ নষ্ট হতে শুরু করে। এসব জাল এতই ক্ষতিকর যে এতে মাছের অতি ক্ষুদ্র পোনা থেকে শুরু করে হাওরের উপকারী ক্ষুদ্র পোকামাকড়ও আটকা পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

তিনি দ্রুত এসব জালের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য অফিস থাকলেও তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা দেখা যায় না।’

‘আমরা কী করব? হাওরে গিয়ে মাছই পাই না। যা পাই, তাই ধরে এনে বিক্রি করে সংসার চালাই। আগে জাল নিয়ে হাওরে গেলেই মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন ঘুরেও তেমন মাছ মেলে না বলে জানান মৎস্য বিক্রেতা রাজেশ দাস।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম বলেন, ‘নিষিদ্ধ জাল বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শহরের চৌধুরী বাজারে দুই দফা অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ টন নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে। পরে সেগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন ঠেকাতে জেলাজুড়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‌‘এসব জাল হাওরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে অতি ক্ষুদ্র মাছ থেকে শুরু করে হাওরের উপকারী পোকামাকড়ও আটকা পড়ে মারা যায়। ফলে শুধু মাছের ক্ষতিই নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এসব জালের বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ নজরদারি রাখা হচ্ছে।’

ইআরকে/এসজেডএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow