ফটিকছড়ির স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যেসব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান
রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি বরাবরই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এক জনপদ। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ রাজনীতিবিদদের পদচারণায় সমৃদ্ধ হয়েছে এ উপজেলার রাজনৈতিক ইতিহাস। শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পর এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সফর ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ফটিকছড়ি। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার আগে থেকেই জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ফটিকছড়ির যোগাযোগ রয়েছে। কখনো নির্বাচনি প্রচারণা, কখনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কর্মসূচি, আবার কখনো জনসভা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সাক্ষাৎ উপলক্ষে শীর্ষ নেতারা এসেছেন এ জনপদে। আরও পড়ুন প্রধানমন্ত্রীকে বরণে প্রস্তুত চট্টগ্রাম, উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা শেখ মুজিবের নির্বাচনি সফর স্বাধীনতার আগে তৎকালীন এমপি মির্জা মনসুরের সময় ফটিকছড়িতে এসেছিলেন শেখ মুজিব। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নাজিরহাটের কালা পশ্চিমকুল-হাটহাজারী সড়কের খাইরিয়া
রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি বরাবরই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এক জনপদ। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ রাজনীতিবিদদের পদচারণায় সমৃদ্ধ হয়েছে এ উপজেলার রাজনৈতিক ইতিহাস।
শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পর এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সফর ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ফটিকছড়ি।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার আগে থেকেই জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ফটিকছড়ির যোগাযোগ রয়েছে। কখনো নির্বাচনি প্রচারণা, কখনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কর্মসূচি, আবার কখনো জনসভা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সাক্ষাৎ উপলক্ষে শীর্ষ নেতারা এসেছেন এ জনপদে।
শেখ মুজিবের নির্বাচনি সফর
স্বাধীনতার আগে তৎকালীন এমপি মির্জা মনসুরের সময় ফটিকছড়িতে এসেছিলেন শেখ মুজিব। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নাজিরহাটের কালা পশ্চিমকুল-হাটহাজারী সড়কের খাইরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন কালাব্রিজের পাশে নির্বাচনি বক্তব্য দেন।
এরপর নাজিরহাট বাজারে মির্জা মনসুরের নির্বাচনি পথসভাতেও বক্তব্য রাখেন তিনি। স্থানীয় প্রবীণদের কাছে এসব ঘটনা এখনো ফটিকছড়ির রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসেবে বিবেচিত।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার দরবার শরীফে যান
মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়ার যাতায়াত
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ফটিকছড়ির সঙ্গে জড়িয়ে যায় তৎকালীন মেজর জিয়ার নাম। রামগড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপনের প্রেক্ষাপটে তিনি ফটিকছড়ি হয়ে যাতায়াত করতেন বলে স্থানীয় প্রবীণ ও সাংবাদিকদের ভাষ্য।
স্থানীয়দের দাবি, সে সময় নাজিরহাট কলেজেও তার অবস্থানের স্মৃতি রয়েছে। স্বাধীনতার পরও জিয়া ফটিকছড়িতে এসেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়কার যোগাযোগপথ এবং রামগড়ের সঙ্গে ফটিকছড়ির ভৌগোলিক সম্পর্কের কারণে স্বাধীনতার ইতিহাসেও এ অঞ্চলের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
এরশাদের জনসভা ও সেতু উদ্বোধন
সামরিক শাসক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ফটিকছড়িতে এসেছিলেন। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে তার এ সফর অনুষ্ঠিত হয়।
সফরকালে তিনি নাজিরহাট নতুন ব্রিজ উদ্বোধন করেন। পরে নাজিরহাট আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এরশাদের ওই সফর ঘিরে তখন ফটিকছড়িতে ব্যাপক রাজনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল বলে এলাকার প্রবীণদের ভাষ্য। তার সফরের স্মৃতি এখনো স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়।
হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের পেলাগাজীর দিঘি এলাকায় যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে বাবুনগর মাদরাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে তার।
মাইজভান্ডার দরবার শরীফে খালেদা জিয়া
স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফটিকছড়ি সফর করেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে তিনি ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার দরবার শরীফে যান। দেশের অন্যতম বৃহৎ সুফি ঐতিহ্যের কেন্দ্র মাইজভান্ডারকে ঘিরে ফটিকছড়ির ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে তার এ সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এরপর ১৯৯৬ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবেও তিনি ফটিকছড়ি সফর করেন বলে জানা যায়।
জনসভায় বক্তব্য শেখ হাসিনার
এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৩ সালে ফটিকছড়িতে আসেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সফরকে কেন্দ্র করে পুরো উপজেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তিনি পাইন্দং ইউনিয়নের পেলাগাজীর দিঘি সিএনবি মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
শেখ হাসিনার সেই সফরও ফটিকছড়ির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতির কারণে তখন ফটিকছড়ি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৯ আগস্ট ফটিকছড়ি সফর করবেন
এবার তারেক রহমান
২০২৬ সালে আবারও সরকারপ্রধানের সফর ঘিরে ফটিকছড়িতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তার ফটিকছড়ি সফরের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে কর্মসূচিতে পরিবর্তন আসে। সর্বশেষ কর্মসূচি অনুযায়ী, রোববার (৯ আগস্ট) এখানে আসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
সফরসূচি অনুযায়ী, বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কর্মসূচি শেষে হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের পেলাগাজীর দিঘি এলাকায় যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে বাবুনগর মাদরাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে তার।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলেমদের মতবিনিময়েরও আয়োজন রয়েছে। এসময় ফটিকছড়ির উন্নয়ন ও স্থানীয় বিভিন্ন দাবির বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
উন্নয়ন নিয়ে নানা প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে রাজনৈতিক বা দলীয় নানা কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে উন্নয়নের নানা প্রত্যাশা।
ফটিকছড়িতে একটি সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সরকারিকরণ, তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, স্থানীয় গ্যাসের সুবিধা নিশ্চিত করা, চা ও রাবারশিল্পে গ্যাস সংযোগ এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের।
এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ফটিকছড়ির দীর্ঘদিনের সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন-চাহিদা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে।
আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ির দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাগুলো আরও গুরুত্ব পাবে।- মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম সংগঠনের ফটিকছড়ি সভাপতি সাইফুদ্দিন সুমন
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ফটিকছড়ির জন্য গর্বের
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম সংগঠনের ফটিকছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি সাইফুদ্দিন সুমন জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন ফটিকছড়িবাসীর জন্য গৌরবের। তার সফরকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীরের নেতৃত্বে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাকে বরণ করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ির দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাগুলো আরও গুরুত্ব পাবে।’
রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায়
ফটিকছড়ির রাজনৈতিক ইতিহাসে শীর্ষ নেতাদের সফর নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্বাধীনতার আগে শেখ মুজিব থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়ার যাতায়াত, এরপর রাষ্ট্রপতি এরশাদ এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সফর এ জনপদের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মৃতি হয়ে আছে। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সেই ধারায় যুক্ত করতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়।
রাজনৈতিক ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উন্নয়ন-সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ ফটিকছড়ির মানুষের কাছে তাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, সেই সঙ্গে উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনারও উপলক্ষ।
এমআরএএইচ/একিউএফ
What's Your Reaction?




