বর্জ্যের দখলে টাঙ্গাইলের প্রবেশদ্বার
টাঙ্গাইল পৌরসভার বয়স প্রায় ১৩৯ বছর। দেশের অন্যতম প্রাচীন প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভা এখনও গড়ে তুলতে পারেনি একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। ফলে শহরের দুই প্রধান প্রবেশপথ—রাবনা বাইপাস ও কাগমারী এলাকায় প্রতিদিন উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে শত শত টন ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধ, বায়ুদূষণ, মেডিকেল বর্জ্য, জলাবদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি—সব মিলিয়ে শহরে প্রবেশের প্রথম অভিজ্ঞতাই এখন ভাগাড়ের। জানা গেছে, ১৮৮৭ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল পৌরসভা। ২৯ দশমিক ৪৩ বর্গ কিলোমিটারের এই পৌরসভায় ভোটার সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। দীর্ঘদিনেও এখানে নির্মাণ করা হয়নি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শোধনাগার। শহরের সব ধরনের ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাবনা বাইপাসে রাস্তার পাশে। এ স্থান দিয়ে উত্তর টাঙ্গাইলের ৬ উপজেলাসহ উত্তরবঙ্গের ১৬টি ও ময়মনসিংহের চারটি জেলার মানুষ যাতায়াত করে এই সড়ক দিয়ে। ময়লার ভাগাড়ে পরিণত শহরের প্রবেশপথ সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রাবনা বাইপাস এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশমুখ কাগমারী শ্মশানঘাট এলাকার প্র
টাঙ্গাইল পৌরসভার বয়স প্রায় ১৩৯ বছর। দেশের অন্যতম প্রাচীন প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভা এখনও গড়ে তুলতে পারেনি একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। ফলে শহরের দুই প্রধান প্রবেশপথ—রাবনা বাইপাস ও কাগমারী এলাকায় প্রতিদিন উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে শত শত টন ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধ, বায়ুদূষণ, মেডিকেল বর্জ্য, জলাবদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি—সব মিলিয়ে শহরে প্রবেশের প্রথম অভিজ্ঞতাই এখন ভাগাড়ের।
জানা গেছে, ১৮৮৭ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল পৌরসভা। ২৯ দশমিক ৪৩ বর্গ কিলোমিটারের এই পৌরসভায় ভোটার সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। দীর্ঘদিনেও এখানে নির্মাণ করা হয়নি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শোধনাগার। শহরের সব ধরনের ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাবনা বাইপাসে রাস্তার পাশে। এ স্থান দিয়ে উত্তর টাঙ্গাইলের ৬ উপজেলাসহ উত্তরবঙ্গের ১৬টি ও ময়মনসিংহের চারটি জেলার মানুষ যাতায়াত করে এই সড়ক দিয়ে।
ময়লার ভাগাড়ে পরিণত শহরের প্রবেশপথ
সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রাবনা বাইপাস এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশমুখ কাগমারী শ্মশানঘাট এলাকার প্রধান সড়কের পাশে পৌরসভার ট্রলি ও ভ্যান দিয়ে দিনে-রাতে উন্মুক্তভাবে বর্জ্য ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। মহাসড়ক ধরে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহনের যাত্রীরা নাকে রুমাল বা কাপড় চেপে এই এলাকা পার হন। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানের ময়লা ফেলে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব জায়গায় মরা গরু, মুরগীসহ পচা-বাসী খাবার ফেলার কারণে এখানকার পরিবেশ হয়ে উঠেছে অসহ্য। যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে নাকে কাপড় চেপে যাচ্ছেন। এতে দুর্গন্ধে নাক ধরে টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করতে হয়। আশেপাশের মানুষও এই দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
তারা জানান, সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ক্ষতিকারক মেডিকেল বা ক্লিনিক্যাল বর্জ্য সরাসরি এই ভাগাড়গুলোতে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলা হচ্ছে।
এখানে ময়লা ফেলানোর কারণে বাসা পরিবর্তন করেছি। দুর্গন্ধের কারণে থাকা কষ্ট হয়ে পড়ে। এখানকার টিউবওয়েলের পানিতেও দুর্গন্ধ হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা আবর্জনা থেকে রোগজীবাণু বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে এলাকায় অ্যাজমা, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভার-কিডনির জটিল রোগসহ ঝুঁকি চরমভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
খাল ভরাট ও জলাবদ্ধতা
একসময় টাঙ্গাইল শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ভিক্টোরিয়া রোড ঘেষে শ্যামা বাবুর খালসহ বেশ কয়েকটি খাল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ দখল ও বর্জ্য ফেলার কারণে। এছাড়াও বৃষ্টির সময় সড়কের উন্মুক্ত বর্জ্য ও প্লাস্টিক ধুয়ে নালা ও ড্রেনে আটকে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
পথচারীরা ও স্থানীয়রা জাগো নিউজকে বলেন, এ এলাকায় এক মিনিটের জন্যও দাঁড়ানো যায় না। প্রচন্ড দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে নাকে কাপড় ধরে চলাচল করতে হয় আমাদের। অতি দ্রুতই আমরা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শোধনাগারে দাবি করছি।

মহাসড়কই এখন ময়লার ভাগাড়
কাগমারী ব্রিজের বাসিন্দা মো. সুমন জাগো নিউজকে বলেন, এখানে ময়লা ফেলানোর কারণে বাসা পরিবর্তন করেছি। দুর্গন্ধের কারণে থাকা কষ্ট হয়ে পড়ে। এখানকার টিউবওয়েলের পানিতেও দুর্গন্ধ হয়।
বৃষ্টি আসলে আমাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। দুগন্ধে আমরা অসহ্য হয়ে পড়ছি। সকল ময়লা আবর্জনা এখানে ফেলা হয়। পৌরসভা থেকে কোনো ব্যবস্থা করে না
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মোশের্দা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, বৃষ্টি আসলে আমাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। দুগন্ধে আমরা অসহ্য হয়ে পড়ছি। সকল ময়লা আবর্জনা এখানে ফেলা হয়। পৌরসভা থেকে কোনো ব্যবস্থা করে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। পানি খাওয়া যায় না। এভাবে কি মানুষ বসবাস করা যায়।
রাবনা বাইপাস এলাকার অটো চালক মো. বাবু জাগো নিউজকে বলেন, গন্ধ নিয়েই আমাদের যাতায়াত করতে হয়। মাক্স ছাড়া চলাফেরা কষ্ট হয়ে যায়। আমাদের যেমন কষ্ট হয়, যাত্রীদেরও তেমন কষ্ট হয়। এটি সমাধানের দ্রুত দাবি করছি।
স্থানীয় ইমাম হোসেন তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, ছোট বেলা থেকেই দেখছি এখানে ময়লা ফেলানো হচ্ছে। বাতাসে এর দুর্গন্ধ ছড়ায়। আমরা দাবি করছি ময়লাগুলো যেনো অন্য জায়গায় ফেলায়।
হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য
পরিবেশবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, টাঙ্গাইল শহরের প্রবেশমুখে দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা শুধু পরিবেশের সৌন্দর্যই নষ্ট করছে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
টাঙ্গাইল প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অরণ্য ইমতিয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে উন্মুক্ত স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। এতে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একই সঙ্গে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু না হলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে আরও বড় পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুজাউদ্দিন তালুকদার বলেন, উন্মুক্ত বর্জ্যের স্তূপ থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতব কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। এতে অ্যাজমা, অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এসব দূষিত উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের ক্যান্সার, লিভার ও কিডনির জটিলতাসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য বড় প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রজেক্টের কাজ শুরু হবে।
দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এ ব্যাপারে কী প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুর্গন্ধরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্তের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
এমএএএন/কেএইচকে
What's Your Reaction?

