কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে সহজ, স্বচ্ছ এবং মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা। নিলুফার ইয়াসমিন মিলির কবিতায় এই শক্তির একটি উজ্জ্বল প্রকাশ দেখা যায়। তার কবিতায় যেমন আছে বিষণ্নতার ধূসর আবহ, তেমনি আছে আশার মৃদু আলো। যেমন আছে ব্যক্তিগত বেদনার গভীরতা, তেমনি আছে নারীজীবনের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা। আবার অপূর্ণতা, বিরহ, হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা এবং আত্মজিজ্ঞাসার ভেতর দিয়েও তিনি পৌঁছাতে চেয়েছেন এক অনন্ত, আধ্যাত্মিক অনুভবের কাছে। সব মিলিয়ে তার কবিতাগুলো পাঠকের মনে নিঃশব্দ অথচ গভীর আলোড়ন তোলে।
‘মুক্তি খোঁজে অনন্ত ভূবন’ কবিতাটি যেন এক ক্লান্ত আত্মার আর্তস্বর। এখানে বিষণ্নতা কেবল মন খারাপের প্রকাশ নয়, উপরন্তু জীবনের ভার, অস্তিত্বের ক্লান্তি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার কাব্যিক প্রকাশ। ‘হৃদয়ের কুল ভেঙে জল থৈ থৈ’ কিংবা ‘মৃত্যুর ভাবনায় অস্থির চিত্ত’ ধরনের পংক্তিগুলো কবির অনুভবের গভীরতাকে স্পষ্ট করে তোলে। তবে এই কবিতার বিশেষ সৌন্দর্য হলো, এটি শুধুই হতাশার বয়ান নয়। ‘স্রষ্টার অনুগ্রহের অপেক্ষায়’ থাকার মধ্য দিয়ে কবি বেদনার মাঝেও বিশ্বাসের এক আশ্রয় গড়ে তুলেছেন। তাই এই কবিতাটি মানবমনের ক্লান্তি ও আধ্যাত্মিক প্রত্যাশার এক অনন্য দলিল হয়ে উঠেছে।
‘মেয়ে’ কবিতায় কবি যেন সমগ্র নারীসমাজের উদ্দেশে এক স্নেহময় আহ্বান জানিয়েছেন। এই কবিতার ভাষা সহজ, কোমল ও আন্তরিক। ‘ও মেয়ে তুমি, কেন এত কাঁদো’ এই উচ্চারণ শুধু একটি প্রশ্ন নয়, এটি যেন দীর্ঘদিনের নীরব বেদনার বিপরীতে এক মমতাময় ডাকে পরিণত হয়েছে। কবি নারীদের আত্মমর্যাদা, আত্মপ্রেম এবং নিজের প্রতি যত্নবান হওয়ার কথা অত্যন্ত মানবিক ভঙ্গিতে বলেছেন। ‘নিজের খেয়াল করো, নিজেকে ভালবাস’ এই পংক্তি আজকের সময়েও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। এই কবিতায় শুধু সহানুভূতি নেই, আছে শক্তি জাগানোর আহ্বান। আছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা। এ কারণেই কবিতাটি বিশেষভাবে প্রশংসার যোগ্য।
‘কোন বিরহে মন পুড়ে’ কবিতায় বিরহকে কবি শুধু প্রেমের বেদনা হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে রূপ দিয়েছেন এক অদৃশ্য, না বলা, গভীর অনুভবের আগুনে। অলীক স্বপ্ন, অদেখা মুখ, একপলক দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং না বলতে পারার কষ্ট মিলে এই কবিতায় এক বিষণ্ন রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়েছে। ‘বৃষ্টির মতো টুপটাপ অথচ তুমি কিছুই জানলে না’ এই চিত্রকল্পের মধ্যে এমন এক নীরব কান্না আছে, যা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কবির বড় সাফল্য এখানেই যে তিনি অপ্রকাশিত ভালোবাসার যন্ত্রণা খুব স্বাভাবিক অথচ গভীর আবেগে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।
‘বিস্ময়ে ভরা দিনলিপি’ কবিতাটি আত্মসমীক্ষা ও জীবনবোধের এক সুন্দর প্রকাশ। এখানে ভালোবাসা, স্বপ্ন, সামাজিক অনুশাসন, অপূর্ণতা, একাকিত্ব এবং বন্দিত্ব মিলেমিশে এক গভীর কাব্যিক আবহ তৈরি করেছে। ‘পরিযায়ী পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে চায়’ পংক্তিতে যেমন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আছে, তেমনি ‘নিজ গৃহে বন্দিদশা জীবন’ উচ্চারণে ধরা পড়েছে বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য। কবি নিজের অনুভূতিকে ব্যক্তিগত গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। বরং তা বহু মানুষের নীরব অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। এ কবিতার ভাবগম্ভীরতা এবং জীবন সম্পর্কে কবির গভীর উপলব্ধি সত্যিই মুগ্ধকর।
‘ধরা ছোঁয়ার বাইরে’ কবিতায় স্মৃতি, অভিমান, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং প্রিয়জনের অনুপস্থিতিকে কবি খুব মায়াময় ভাষায় প্রকাশ করেছেন। ‘দু দিনের বাড়িয়ালি ঘর, ভেঙে হয় চুরমার’ এই পংক্তি জীবনের অস্থায়িত্বকে অসাধারণভাবে তুলে ধরে। প্রিয়জনকে না পাওয়া, ফিরে না আসা সময়কে মনে আঁকড়ে ধরা এবং কল্পনার ভেতর একটি সুখের ঘর নির্মাণ করা, এসব অনুভূতি কবিতাটিকে স্নিগ্ধ ও বেদনাময় সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিয়েছে। কবির কল্পনা এখানে নিছক স্বপ্ন নয়, বরং স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষার এক আশ্রয়। তাঁর শব্দচিত্র পাঠককে খুব সহজেই কবিতার ভেতরের আবহে নিয়ে যায়।
‘হারায়ে গেছে অমূল্য রতন’ কবিতাটি জীবনবোধের এক গভীর, সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র প্রকাশ। এখানে অসমাপ্তি, অপূর্ণতা, না পাওয়ার বেদনা এবং জীবনের অদ্ভুত দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে ধরা পড়েছে। ‘অসমাপ্ত রয়ে গেল জীবনের পাণ্ডুলিপি’ এই পংক্তিটি যেন মানুষের সমগ্র জীবনযাত্রার এক সারাংশ। আমরা যা পাই, তাকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলি। আর যা পাই না, তার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলি। এই চিরন্তন সত্যকে কবি এমন সহজ কিন্তু গভীর ভাষায় বলেছেন যে তা পাঠককে ভাবায়, থামায় এবং নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। এটাই বড় কবিতার পরিচয়।
নিলুফার ইয়াসমিন মিলির কবিতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তার সহজ ভাষায় গভীর অনুভব প্রকাশের ক্ষমতা। তিনি দুর্বোধ্য শব্দ বা কৃত্রিম অলংকারের আড়ালে যান না। বরং হৃদয়ের ভাষায়, জীবনঘনিষ্ঠ উপমায় এবং স্বাভাবিক বর্ণনায় তিনি এমন এক কাব্যজগৎ তৈরি করেন, যা পাঠকের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গেও মিশে যায়। তার কবিতায় বেদনা আছে, কিন্তু তা নিছক অন্ধকার নয়। সেখানে মমতা আছে, আশা আছে, আত্মার আর্তি আছে, মানবিক উষ্ণতা আছে।
এই কবিতাগুলো পড়লে মনে হয়, কবি শুধু শব্দ সাজাননি। তিনি তার হৃদয়ের ক্ষত, মমতা, স্বপ্ন, অপূর্ণতা এবং আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিয়েছেন। তার কবিতা কখনও পাঠকের চোখে জল আনে, কখনও মনে জাগিয়ে তোলে কোমল আলো। এই কারণেই নিলুফার ইয়াসমিন মিলির কবিতাগুলো শুধু প্রশংসার নয়, গভীরভাবে অনুভব করারও বিষয়। তার কাব্যভাষা আরও বিস্তৃত পাঠকমহলে পৌঁছাক, এটাই প্রত্যাশা।
মুক্তি খোঁজে অনন্ত ভুবন
কেন আজ বিষণ্ন লাগে,
হৃদয়ের কুল ভেঙে জল থৈ থৈ!
কেন বাতাসে আজ দমকা হাওয়া,
নিঃশ্বাস নিতে কেন এত কষ্ট!
মৃত্যুর ভাবনায় অস্থির চিত্ত,
পৃথিবীর সব রঙ বেদনার রঙে ভারাক্রান্ত!
কোন কিছুতেই মজে না আর মন,
মুক্তি খোঁজে অনন্ত ভূবন।
পথের মধ্যি খানে এসে,
পাথেয় গেছে ফুরায়ে,
তাই তো দেহের অসুখ নাহি সারে।
ক্লান্ত বায়ু অতি ধীরে বয়,
সব কিছুতে ব্যথা ক্ষতময়।
কষ্টে যার দিনানিপাত,
তবু বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা সাধ।
মিথ্যা খোঁজে উড়ে বেড়ার পথ !
কোথা থেকে কোথা যাব ,
ভাবি মনে মনে,
স্রষ্টার অনুগ্রহের অপেক্ষায় তবু দিন গুনে।
শুধুই অপেক্ষা পাড়ি জমার অনন্ত ভূবনে।
বিবেকের দেয়াল থেকে খসে পড়ে বিবেকের ধুলিকণা
এইভাবে একদিন দিন ফুরাবে প্রয়োজন ফুরাবে আপন জনের।
গ্রহ তারা হয়ে জ্বলবে সেদিন রাত্রির আঁধারে!!
মেয়ে
(নারী/মেয়েরা ভালো থাকুক সর্ব সময়)
কৃষ্ণপক্ষের আধখানা চাঁদ আকাশে যখন উঠে,
মনের মাঝে জমানো ব্যাথা উথাল করে তাতে।
বুকের ভিতর চাপা কান্না,জোর করে বেঁচে থাকা,
জীবন টা মনে হয় শুধুই ছেঁড়া পাতা।
ও মেয়ে তুমি , কেন এত কাঁদো?
কান্না রেখে একটু খানি হাসো।
দুঃখের ঝোলা পানিতে ফেলে আসো।
জানাও তোমার গোপন ব্যাথা গুলো,
জমানো যত ব্যাথা আছে , সব সরিয়ে ফেলো।
ও মেয়ে তুমি আর কেঁদো না,
কেঁদে ও কোন কুল পাবে না।
দুঃখ গুলো উড়িয়ে দাও হাওয়ায়,
রোদের বৃষ্টির আলোর দিশার বন্যায়।
ও মেয়ে তুমি একটু হাসো,
নিজের খেয়াল করো, নিজেকে ভালবাস।
যা কিছু দুঃখ,ব্যাথা ভুলে যাও অকোপটে,
সত্য সুন্দর নির্মল হও , বাঁচো মনের সুখে।
কোন বিরহে মন পুড়ে
অলিক অদৃশ্য স্বপ্নগুলো,
কেমন যেন ছন্নছাড়া,বড্ড বেহায়া
শাসন অনুশাসন তোয়াক্কা করে না।
স্পর্শের বাইরে অগোচরে উঁকি দেয় হররোজ।
কতক টা কৌতুহল আর উদ্দীপনায় মন ঘেসে রয়।
কোন এক মুখচ্ছবি মনের অগোচরে হাতছানি দেয়।
সবার অজান্তে অতি সন্তর্পণে,
মনে মনে কথা হয় তার সাথে।
স্বপ্নের মধ্যে যার বাস।
তাই তো স্বপ্নে বিভোর থাকে তাকে ঘিরে।
স্বপ্নে আসে স্বপ্নেই যায়,
ধরা ছোঁয়ার বাইরে লোক চক্ষুর অন্তরালে।
হৃদয় পুড়ে, কেমন যেন দম আটকে আসে, নিশ্বাস ভারী হয়।
শুধু এক পলক দেখার অদম্য ইচ্ছা ছটফট করে মন,
দেখা অদেখার মাঝ খানে রয়ে যায়।
অবশেষে অভিমানে ঝরে পড়ে অশ্রু ,
বৃষ্টির মত টুপটাপ অথচ তুমি কিছুই জানলে না ,
থেকে গেলে কল্পনায়। বলা হলো না কোনদিন,
কোন বিরহে কেন যে মন পুড়ে।।
বিস্ময়ে ভরা দিনলিপি
বুকের গহিনে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসাটা
মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
চুপিসারে একাকী সুর তোলে,
ভুঁইফোড় হয়ে প্লাবিত হয় মন।
পরিযায়ী পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে চায়,
ঠিকানা তার অনিশ্চিত অজানা জেনে ও,
জীবনের রঙ খুঁজে হিয়া!
নতুন করে নিজেকে সাজাবে বলে।
ঘুরে ফিরে যে কার সেই!
ঘুম ভেঙ্গে দেখে,
বন্দি ডেরায় আটকে আছে জীবন!
শাস্ত্র মানতে গিয়ে নিজেকে নিয়ে আর হলো না উড়া!
বিধির বিধান অমান্য করি সাধ্যি বলো কার !
জীবনের চাওয়া পাওয়া বলতে আজ আর কিছু নেই,
কতটুকু পেলাম জানা হলো না, হারিয়েছি ঢের বেশি!
চমৎকার মায়ার ছলনায় আটকে গেছি।
নিজ গৃহে বন্দিদশা জীবন!
এভাবে দিন কেটে যায় সময়ের গ্যালারিতে বসে।
একাকীত্বের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়,
যদিও লাভ ক্ষতির কোন বালাই নেই।
খুব যে চাওয়া ছিল তা নয়,
চাওয়া পাওয়ার বোধদ্বয় গুলো থাকনা হয়ে বিস্ময়।।
ধরা ছোঁয়ার বাইরে
সুদিনে অবহেলায় করেছি দিন পার,
যে সময় যায়, ফিরে না কখনো আর!
প্রিয়জন চলে গেলে, স্মৃতি আঁকড়ে রয়েছি পড়ে,
দু' দিনের বাড়িয়ালি ঘর, ভেঙ্গে হয় চুরমার!
নির্জন বিষন্নতায় কাটে তখন মন,
অভিমান আর দীর্ঘশ্বাসে কাঁদে দু'নয়ন!
যদিও অদৃশ্য, থাকে এক আশ্চর্য গভীর হৃদয় ছুঁয়ে,
স্বার্থহীন পবিত্র ভালবাসার চাদরে মোড়ায়ে।
কতকটা আশংকা কতকটা চাপা কষ্ট,
প্রিয়জন বিহনে জীবন হয় বিপন্ন
নিঃশেষিত হতে হতে বেঁচে যাওয়া জীবন,
দিনান্তে আঁকড়ে থাকে সুখ স্মৃতির আচ্ছাদন।
ভাবনার জগৎ জুড়ে কিছু অগোছালো আবদার,
যদি ও বেহিসেবি ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে,
তবু ও কেন যে ডাকি বারংবার।
ধরা দেবে না জেনেও কল্পনায় আঁকি সুখের পায়রা ঘর,
কবিতার অক্ষরে সাজায়,
যদি কখনো আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে ওঠে বাতিঘর!
‘হারায়ে গেছে অমূল্য রতন’
নিলুফার ইয়াসমিন মিলি
সূচনা ঠিক মত বুঝা হলোনা,
উপসংহার কিভাবে লিখি?
অসমাপ্ত রয়ে গেল জীবনের পান্ডুলিপি!
ভেবে ছিলাম খুব সুন্দর একটা কাব্যের বাগান গড়ব,
তাতে থাকবে নিসর্গ শৈল্পিকতার ছোঁয়া।
নানান রঙের শব্দের বুননে,
যেখানে তুমি থেকে আমরা সবাই আছি।
শব্দের শূন্যতায় লেখা হলোনা আর!
মানুষের জীবন কেমন যেন অদ্ভুত!
কোনটা সুখ কোনটা অসুখ,
বুঝতে বুঝতে সময়ের ঘন্টা বেজে যায়।
প্রাপ্য টুকু পেলে হেলায় হারায়,
না পাওয়াটাকে, পাওয়ার জন্য আফশোস করে যায়!
একটা জীবন ঘিরে কত জল্পনা কল্পনা,
কতকটা পূরণ হয় কতকটা অধরা থেকে যায়।
প্রাপ্য টুকু পেয়ে ও সন্তুষ্ট হয় না মন
তাইতো নিতল দিঘির কাল জলে করি সুখের সন্ধান,
হাতড়ে খুঁজি হারায়ে যাওয়া অমূল্য রতন।