যুদ্ধ-উচ্ছেদে ম্লান মধ্যপ্রাচ্যের ঈদ আনন্দ
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যেন ম্লান হয়ে গেছে। নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎসব উদযাপন যেন অনেকের কাছেই বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ডাউনটাউন ওয়াটারফ্রন্টে আলা নামের এক ব্যক্তি মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে ফিরছেন। সিরীয় এই শরণার্থী, যিনি মূলত অধিকৃত গোলান মালভূমির বাসিন্দা, এখন গৃহহীন। তিনি জানান, সারা দিন লেবাননের রাজধানীজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন আশ্রয়ের সন্ধানে। তিনি আগে বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর দাহিয়েতে থাকতেন—যেখানে ইসরায়েলি হামলায় তছনছ হয়ে গেছে এলাকা এবং এ পর্যন্ত লেবাননজুড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য কোথাও নিরাপদে থাকা। সেই বাস্তবতায় শুক্রবার শুরু হওয়া মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর তার চিন্তায়ও নেই। ঈদে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি ‘না’ বলেন। বরং তার একমাত্র লক্ষ্য এখন একটি তাঁবু জোগাড় করা। আলা বলেন, একটি স্কুলে থাকার আবেদন করেছিলাম, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর কর্নিশে গিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। পরে পৌরসভার লোকজন আমাকে ডাউনটাউন বৈরুতের ওয়াটারফ্রন্টে আসতে বলে। তিনি
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যেন ম্লান হয়ে গেছে। নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎসব উদযাপন যেন অনেকের কাছেই বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ডাউনটাউন ওয়াটারফ্রন্টে আলা নামের এক ব্যক্তি মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে ফিরছেন। সিরীয় এই শরণার্থী, যিনি মূলত অধিকৃত গোলান মালভূমির বাসিন্দা, এখন গৃহহীন। তিনি জানান, সারা দিন লেবাননের রাজধানীজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন আশ্রয়ের সন্ধানে।
তিনি আগে বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর দাহিয়েতে থাকতেন—যেখানে ইসরায়েলি হামলায় তছনছ হয়ে গেছে এলাকা এবং এ পর্যন্ত লেবাননজুড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এখন তার একমাত্র লক্ষ্য কোথাও নিরাপদে থাকা। সেই বাস্তবতায় শুক্রবার শুরু হওয়া মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর তার চিন্তায়ও নেই।
ঈদে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি ‘না’ বলেন। বরং তার একমাত্র লক্ষ্য এখন একটি তাঁবু জোগাড় করা।
আলা বলেন, একটি স্কুলে থাকার আবেদন করেছিলাম, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর কর্নিশে গিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। পরে পৌরসভার লোকজন আমাকে ডাউনটাউন বৈরুতের ওয়াটারফ্রন্টে আসতে বলে।
তিনি এখনো একটি তাঁবু পাননি এবং খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাচ্ছেন। তবে আশপাশের অনেকেই তাঁবু পেয়েছেন, ফলে দামি রেস্তোরাঁ ও বারঘেরা ডাউনটাউন এলাকা এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের অস্থায়ী তাঁবু নগরীতে পরিণত হয়েছে। লেবাননজুড়ে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
লেবাননবাসী জানেন না এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন এই সংকট তৈরি হয়েছে।
ফলে উৎসব উদযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে—এটি বর্তমান সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সব দেশেরই অভিন্ন চিত্র।
ইরানে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার তৃতীয় সপ্তাহ চলছে, যুদ্ধের আগে থেকেই চলা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মানুষ ঈদের কেনাকাটা করার মতো সামর্থ্য হারিয়েছে।
এছাড়া তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের মতো স্থানে কেনাকাটা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ বোমা হামলায় এসব জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঈদের ধর্মীয় দিকটি সরকারবিরোধী ইরানিদের জন্য আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। তাদের কেউ কেউ এখন ধর্মীয় চর্চাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখছেন।
এদিকে, এ বছর শুক্রবার পারস্য নববর্ষ নওরোজ পড়ায় সরকারবিরোধী অনেকেই ঈদের বদলে সেই উৎসবেই মনোযোগ দিচ্ছেন এবং ঈদের আয়োজন এড়িয়ে যাচ্ছেন।
গাজায় সংগ্রামময় ঈদ
গাজার অনেক ফিলিস্তিনি ঈদ উদযাপন করতে চান, কিন্তু ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট তা কঠিন করে তুলেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় পণ্য প্রবেশে ইসরায়েলের কড়াকড়ি আরও বেড়েছে, ফলে শিশুদের খেলনাসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
গাজা সিটির আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি বাড়িতে থাকা ৬২ বছর বয়সী খালেদ দীব ঈদের আগে বাজারে ফল ও সবজির দাম দেখতে কেন্দ্রীয় রেমাল মার্কেটে যান।
তিনি বলেন, বাইরে থেকে ঈদের পরিবেশ বেশ প্রাণবন্ত মনে হয়, কিন্তু আর্থিকভাবে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে এখন তাঁবুতে বসবাস করছে। যুদ্ধের মধ্যে সবাই সবকিছু হারিয়েছে।
খালেদ বলেন, তিনি এখন ফল-সবজি কেনার সামর্থ্য রাখেন না। তার ভাষায়, এসব এখন শুধু রাজাদের জন্য, আমাদের মতো ক্লান্ত-দরিদ্র মানুষের জন্য নয়।
যুদ্ধের আগের স্মৃতি তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। তখন তার একটি সুপারমার্কেট ছিল।
তিনি বলেন, ঈদের সময় আমি মেয়েদের ও বোনদের তিন হাজার শেকেলের বেশি উপহার দিতাম, বাড়ি সাজাতাম, সন্তানদের নতুন কাপড় কিনে দিতাম, মিষ্টি-চকলেট কিনতাম। কিন্তু এ বছর সেসব কিছুই হচ্ছে না, এমনকি গাজায় যুদ্ধবিরতি হলেও না।
একই কথা বলেন তিন সন্তানের মা শিরিন শ্রেইম। বলেন, আমাদের ঈদের আনন্দ অপূর্ণ। দুই বছরের যুদ্ধের কষ্ট কাটিয়ে উঠতেই পারিনি, তার ওপর এখন এমন এক জীবন, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসও পাওয়া যায় না।
ইসরায়েল হামলা বন্ধের কোনো লক্ষণ না দেখানোয় গাজা কবে পুনর্গঠিত হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
শিরিন বলেন, আমি এমন একটি ফ্ল্যাটে থাকি যার দেয়াল প্রায় ভেঙে গেছে। আমরা ত্রিপল ও কাঠ দিয়ে কোনোভাবে জীবন চালাচ্ছি। তবু আমরা অনেকের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবার বাসায় ফিরলে মন খারাপ হয়ে যায়। রাস্তায় মানুষ নাইলন ও কাপড়ের তাঁবুতে বসবাস করছে, কোনো মানবিক আশ্রয় নেই। তারা কীভাবে ঈদ উদযাপন করবে?
সংকটে থেকেও সংহতির আশা
বৈরুতে ফিরে, রাজনৈতিক গবেষক ও সংগঠক করিম সাফিয়েদ্দিন পরিস্থিতি নিয়ে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেন। বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন।
তার ভাষায়, যুদ্ধের কারণে আমরা বাস্তুচ্যুত হলেও, পারিবারিক বন্ধন শক্ত রাখা এবং সামাজিক সংহতি তৈরি করাই এই যুদ্ধ থেকে বাঁচার প্রথম শর্ত।
তিনি বলেন, সংহতি ছাড়া আমরা কোনো সমাজ বা দেশ গড়ে তুলতে পারব না। বোমার মধ্যে থেকেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন গড়তে হলে এটিই প্রথম ধাপ—অবশ্যই কোনো ভান করা ইতিবাচকতা ছাড়াই।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ
What's Your Reaction?