যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের ১০ জলাধার, বাড়ছে ‘মহাদেশীয় শুষ্কতা’
বিশ্বজুড়ে দ্রুত হারে হারিয়ে যাচ্ছে মিঠাপানির উৎস। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর পৃথিবী প্রায় ৩২৪ ট্রিলিয়ন লিটার (৮৫.৬ ট্রিলিয়ন গ্যালন) মিঠাপানি হারাচ্ছে, যা দিয়ে বছরে প্রায় ২৮ কোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো। বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে ‘কন্টিনেন্টাল ড্রাইং’ (Continental Drying) বা ‘মহাদেশীয় শুষ্কতা’ নামে অভিহিত করছেন। দীর্ঘমেয়াদি খরা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই নয় এমন ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় সচেতনতা বাড়াতে জাতিসংঘ প্রতি বছর ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে। এই উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাওয়া ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নদী, হ্রদ ও জলাধারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ১. পারানা নদী, আর্জেন্টিনা প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পারানা নদী দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। এটি ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনাকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ। বর্তমানে এই নদীর পানিপ্রবাহ এতটাই কমেছে যে ১৯৪৪ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৯০ ও ২০২৬ সালের
বিশ্বজুড়ে দ্রুত হারে হারিয়ে যাচ্ছে মিঠাপানির উৎস। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর পৃথিবী প্রায় ৩২৪ ট্রিলিয়ন লিটার (৮৫.৬ ট্রিলিয়ন গ্যালন) মিঠাপানি হারাচ্ছে, যা দিয়ে বছরে প্রায় ২৮ কোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো।
বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে ‘কন্টিনেন্টাল ড্রাইং’ (Continental Drying) বা ‘মহাদেশীয় শুষ্কতা’ নামে অভিহিত করছেন। দীর্ঘমেয়াদি খরা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই নয় এমন ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় সচেতনতা বাড়াতে জাতিসংঘ প্রতি বছর ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে। এই উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাওয়া ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নদী, হ্রদ ও জলাধারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
১. পারানা নদী, আর্জেন্টিনা
প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পারানা নদী দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। এটি ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনাকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ।
বর্তমানে এই নদীর পানিপ্রবাহ এতটাই কমেছে যে ১৯৪৪ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৯০ ও ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনায় দেখা যায়, আর্জেন্টিনার রোসারিও বন্দরের কাছে নদীর পানির স্তর নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে শস্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে, ইতাইপু বাঁধে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ও নদীর তলদেশের বিশাল অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
২. লেক পুপো, বলিভিয়া
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লেক পুপো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত হারিয়ে যাওয়া উচ্চভূমির হ্রদগুলোর একটি।
১৯৮৪ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, একসময় বলিভিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদটি প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। একসময় এর আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার বর্গকিলোমিটার।
পানি সরিয়ে নেওয়া, খরা ও উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হ্রদটি শুকিয়ে গিয়ে লবণাক্ত সমতলে পরিণত হয়েছে। এতে স্থানীয় মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়েছে ও আদিবাসী উরু জনগোষ্ঠীর জীবিকাও বিপর্যস্ত হয়েছে।
৩. লেক এনগামি, বতসোয়ানা
১৮৪৯ সালে বিখ্যাত স্কটিশ অভিযাত্রী ডেভিড লিভিংস্টোন প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে এই হ্রদটি আবিষ্কার করেন। তখন এটি একটি বিশাল জলাশয় ছিল।
এই হ্রদের পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ ওকাভাঙ্গো নদীর বন্যার ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি প্রায়শই শুকিয়ে গিয়ে তৃণভূমি বা কর্দমাক্ত এলাকায় পরিণত হয় ও বন্যার সময় আবার পানিতে ভরে ওঠে।
যখন হ্রদে পানি থাকে, তখন এটি লক্ষ লক্ষ জলচর পাখি, পেলিকান, ফ্লেমিংগো এবং বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর মিলনমেলায় পরিণত হয়।
১৯৮৪ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, হ্রদটি কখনো জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে, আবার কখনো প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। তীব্র খরা ও উজানের পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এক পর্যায়ে এটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
৪. লাগুনা দে আকুলেও, চিলি
চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই হ্রদটি আগে পাহাড়ি সৌন্দর্যের জন্য জনপ্রিয় ছিল। এর চারপাশ মৃদু ঢালু মাটি ও কর্দমাক্ত তীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল।
স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত ছিল যে এই হ্রদের তলদেশে ইনকাদের প্রচুর সোনা লুকিয়ে আছে।
২০০৭ ও ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট ছবির তুলনায় দেখা গেছে, হ্রদের পানি প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। চরম খরা ও পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধকে এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখা হয়।
৫. লেক উরমিয়া, ইরান
উত্তর-পশ্চিম ইরানে অবস্থিত লেক উরমিয়া একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় লবণাক্ত হ্রদ ছিল। ১৯৯০-এর দশকে এর আয়তন ছিল প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৮১ বর্গকিলোমিটারে, অর্থাৎ আগের আকারের ১০ শতাংশেরও কম।
ক্রমাগত খরা, কৃষিকাজে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে হ্রদের বিশাল অংশ এখন উন্মুক্ত লবণাক্ত সমভূমিতে পরিণত হয়েছে।
৬. আল-চিবাইশ জলাভূমি, ইরাক
দক্ষিণ ইরাকে অবস্থিত আল-চিবাইশ মার্শ বা জলাভূমি মেসোপটেমিয়ান ওয়েটল্যান্ডসের অংশ ও এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানি দ্বারা পুষ্ট এই জলাভূমি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চলগুলোর একটি।
১৯৮৪ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকে ব্যাপক পানি নিষ্কাশন ও খরার কারণে অঞ্চলটির বড় অংশ শুকিয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ফলে কিছু অংশ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
৭. আম্বোভোম্বে, মাদাগাস্কার
দক্ষিণ মাদাগাস্কারের আম্বোভোম্বে অঞ্চল দেশটির সবচেয়ে খরাপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। মালাগাছি ভাষায় এই জায়গার নামের অর্থ ‘অনেক কূপের স্থান’।
লাল বালুর ঝড় এবং বৃষ্টিপাতের ঘাটতি পানির উৎস ও কৃষিজমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে জীবিকানির্ভর কৃষি ও পশুপালন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগ ও বাস্তুচ্যুতি সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৮৫ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, বহু বছরের খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে অঞ্চলটি ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে।
৮. লেক ফাগুইবিন, মালি
লেক ফাগুইবিন মালির টিম্বাক্টু অঞ্চলে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক হ্রদ। একসময় পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম ও উর্বর এই জলাভূমিটি ১৯৭০-এর দশকের তীব্র খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে
১৯৮৪ থেকে ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, কম বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি খরা ও পলিমাটি জমার কারণে হ্রদটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
৯. লেক মিড, যুক্তরাষ্ট্র
নেভাদা ও অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত লেক মিড ধারণক্ষমতার বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম জলাধার। ১৯৩০-এর দশকে কলোরাডো নদীর ওপর নির্মিত হুভার ড্যাম থেকে এটি সৃষ্টি হয় ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকোর লাখো মানুষের পানির প্রধান উৎস।
১৯৮৪ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের কারণে জলাধারটির পানির স্তর ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর ফলে তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ও আগে পানির নিচে থাকা ভূমি এখন উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
১০. দক্ষিণ আরাল সাগর, উজবেকিস্তান
আরাল সাগর একটি হ্রদের নাম যা আরবদের নিকট তার বিশালতার কারণে সাগর হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ সালের দিকে এটা পৃথিবীর ৪র্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল। উত্তর থেকে সির দরিয়া ও দক্ষিণ থেকে আমু দরিয়া নদী থেকে জল এসে মিশতো আরালের বুকে। লেকটি ধীরে ধীরে শুকাতে শুরু করে।
২০১৪ সালের নাসার প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায় হ্রদটির পূর্বাঞ্চলীয় বেসিনের পুরোটাই শুকিয়ে গেছে। অঞ্চলটি এখন আরালকুম মরুভূমি নামে পরিচিত।
১৯৮৪ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, সেচ প্রকল্পের জন্য কয়েক দশক ধরে নদীর পানি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার ফলে এই বিশাল জলাধারটি ৯০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়ে গেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ
What's Your Reaction?