শিশু ধর্ষণ ও হত্যা রোধে প্রয়োজন ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ন্যায়বিচার
বর্তমানে আমাদের সমাজ এক চরম অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে শিশু ধর্ষণ ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বীভৎস খবর। রামিসার মতো অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে মানুষরূপী কিছু হায়েনার লালসার শিকারে। এই পরিস্থিতি কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং আমাদের বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পৈশাচিকতা রুখতে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের অনিবার্য দাবি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধের বিস্তার একটি অপরাধ ঘটার পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আমাদের দেশে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক প্রভাবে পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা বিলম্বিত বিচার অপরাধীদের মনে এক ধরণের সাহস তৈরি করে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন অপরাধী মনে করে সে আইনের ফাঁক দিয়ে পার পেয়ে যাবে, তখনই অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। ইসলামে হত্যার শাস্তি কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ) ইসলাম মানুষের জীবনের নিরাপত্তা (হককুল ইবাদ) রক্ষায় আপসহীন। ই
বর্তমানে আমাদের সমাজ এক চরম অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে শিশু ধর্ষণ ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বীভৎস খবর। রামিসার মতো অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে মানুষরূপী কিছু হায়েনার লালসার শিকারে। এই পরিস্থিতি কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং আমাদের বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পৈশাচিকতা রুখতে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের অনিবার্য দাবি।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধের বিস্তার
একটি অপরাধ ঘটার পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আমাদের দেশে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক প্রভাবে পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা বিলম্বিত বিচার অপরাধীদের মনে এক ধরণের সাহস তৈরি করে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন অপরাধী মনে করে সে আইনের ফাঁক দিয়ে পার পেয়ে যাবে, তখনই অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়।
ইসলামে হত্যার শাস্তি কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ)
ইসলাম মানুষের জীবনের নিরাপত্তা (হককুল ইবাদ) রক্ষায় আপসহীন। ইসলামে কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করাকে পুরো মানবজাতিকে হত্যার সমান অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। হত্যার শাস্তি হিসেবে ইসলামে ‘কিসাস’ বা সমদণ্ডের বিধান দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর ‘কিসাস’ (প্রাণের বদলে প্রাণ) গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে’ (সুরা আল-বাকারা: ১৭৮)। পরবর্তী আয়াতেই বলা হয়েছে যে, এই কিসাসের মধ্যেই মূলত জীবন নিহিত রয়েছে (বাকারা: ১৭৯)।
যখন একজন হত্যাকারী জানবে যে, তার কৃতকর্মের পরিণাম মৃত্যুদণ্ড, তখন সে এই অপরাধ করার আগে শতবার ভাববে। এটি মূলত বৃহত্তর সমাজের জীবন রক্ষার একটি ঐশ্বরিক কৌশল।
ইসলামে ধর্ষকের শাস্তি
ধর্ষণের ক্ষেত্রে এক পক্ষ থেকে ব্যভিচার সংঘটিত হয়। আর অন্য পক্ষ হয় মজলুম বা নির্যাতিত। তাই মজলুমের কোনো শাস্তি নেই। শুধু জালিম বা ধর্ষকের শাস্তি হবে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সংঘটিত হয়—ব্যভিচার, বল প্রয়োগ এবং সম্ভ্রম লুণ্ঠন।
ব্যভিচারের জন্য কোরআনে বর্ণিত ব্যভিচারের শাস্তি পাবে। ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি ব্যক্তিভেদে একটু ভিন্ন। ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। আর যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত করা হবে। হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব মতে, ধর্ষণের জন্য ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
তবে ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে, ধর্ষণের অপরাধে ব্যভিচারের শাস্তির পাশাপাশি ‘মুহারাবা’র শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। ‘মুহারাবা’ হলো অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়াই ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা কিংবা লুণ্ঠন করা। এককথায় ‘মুহারাবা’ হলো পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি, লুণ্ঠন, নিরাপত্তা বিঘ্নিতকরণ, ত্রাসের রাজ্য কায়েম করা ইত্যাদি।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ‘মুহারাবা’র শাস্তি এভাবে নির্ধারণ করেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে : তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে বা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা, আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।’ (সুরা মায়িদা: ৩৩)
এ আয়াতের আলোকে মালেকি মাজহাবে ধর্ষণের শাস্তিতে ‘মুহারাবা’র শাস্তি যুক্ত করার মত দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, সমাজে ধর্ষণ মহামারির আকার ধারণ করলে, সমাজ থেকে ধর্ষণ সমূলে নির্মূল করার লক্ষ্যে এ শাস্তি প্রয়োগ করা জরুরি। (আল মুগনি: ৮/৯৮)
আর যদি ধর্ষণের সঙ্গে হত্যাজনিত অপরাধ যুক্ত হয়, তাহলে ঘাতকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
নৈতিক সংস্কার ও প্রতিরোধে করণীয়
কেবল কঠোর শাস্তিই যথেষ্ট নয়, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়। শৈশব থেকেই পরকালীন জবাবদিহিতা এবং নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে হবে। মাদক ও অশ্লীলতার বিস্তার রোধে কঠোর সামাজিক ও আইনি অবস্থান প্রয়োজন। যখন আইনের শাসন এবং ধর্মীয় ও পারিবারিক নৈতিকতার সমন্বয় ঘটবে, তখনই সমাজ থেকে এ ধরণের অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হবে।
উপসংহার
রামিসাদের রক্তমাখা মুখগুলো আমাদের বিবেককে আজ দংশন করছে। বর্তমান প্রচলিত আইনে কঠোর সাজার বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ ও দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ কমাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পৈশাচিকতার শেষ দেখতে হলে অপরাধীকে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ন্যায়বিচার কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং একটি নিরাপদ ও শান্তিময় সমাজ গঠনের কার্যকর পথ। রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালকদের আজ এই সমাধানের পথে হাঁটার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
লেখক: সাবেক সভাপতি, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ
What's Your Reaction?