সরকারে থেকেও হত্যা-হামলার শিকার, ক্ষুব্ধ বিএনপির নেতাকর্মীরা

ক্ষমতায় আসার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছিল বিএনপি। তবে সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মী নিহত ও আহত হওয়ার একাধিক ঘটনায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও খুলনায় আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার প্রকাশিত পরিসংখ্যানও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার একটি চিত্র তুলে ধরছে। এসব ঘটনার পর দলীয় তৃণমূলে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়েছে-সরকারে থাকার পরও যদি নিজ দলের নেতাকর্মীরা ধারাবাহিকভাবে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাহলে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়াও কি আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত? তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের মূল্যায়ন শুধু অপরাধ দমনের পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়। আলোচনায় কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী হত্যার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগের রাজারবাগ এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্র

সরকারে থেকেও হত্যা-হামলার শিকার, ক্ষুব্ধ বিএনপির নেতাকর্মীরা

ক্ষমতায় আসার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছিল বিএনপি। তবে সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মী নিহত ও আহত হওয়ার একাধিক ঘটনায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও খুলনায় আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার প্রকাশিত পরিসংখ্যানও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার একটি চিত্র তুলে ধরছে।

এসব ঘটনার পর দলীয় তৃণমূলে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়েছে-সরকারে থাকার পরও যদি নিজ দলের নেতাকর্মীরা ধারাবাহিকভাবে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাহলে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়াও কি আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত?

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের মূল্যায়ন শুধু অপরাধ দমনের পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়।

আলোচনায় কয়েকটি হত্যাকাণ্ড

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী হত্যার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগের রাজারবাগ এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রকাশ্য এ হত্যাকাণ্ড রাজধানীজুড়ে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

এর আগে ১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম (জাহাঙ্গীর) নিজ বাসার সামনে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, এ ঘটনায় ভাড়াটে হামলাকারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

এরও আগে ১২ জুন খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম গাজীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

তৃণমূলে আলোচনার বিষয়

দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরোধী দলে থাকাকালে এ ধরনের ঘটনায় কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত বিবৃতি, প্রতিবাদ কর্মসূচি কিংবা প্রতিনিধিদল পাঠানোর নজির ছিল। সরকারে আসার পর প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলেও দলীয় সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় কম দৃশ্যমান বলে মনে করছে নেতাকর্মীদের একাংশ।

জেলা পর্যায়ের এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার আমাদের। তাই বিচার নিশ্চিত করার দায়ও আমাদের। কর্মীরা শুধু শোকবার্তা নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপও দেখতে চান।’

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, কোনো নেতাকর্মী হামলা বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে আইনগত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, কেন্দ্রীয় নেতাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সংগঠনের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেয়। সরকারে থাকার কারণে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাংগঠনিক উপস্থিতিও কর্মীদের কাছে সমান গুরুত্ব বহন করে।

সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ

সাম্প্রতিক সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ২৪ জুলাই। যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা শামসুদ্দিন খানের ওপর হামলার ঘটনায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন যৌথ বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানান। তারা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে আহত নেতার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

তবে তৃণমূলের একাংশের প্রত্যাশা, আলোচিত অন্যান্য ঘটনায়ও একই ধরনের দৃশ্যমান সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া আরও নিয়মিতভাবে দেখা যাবে।

পরিসংখ্যানের চিত্র

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তীসময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ১১৯টির বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় অন্তত ২৪ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক নিহত এবং এক হাজার ৫৮৫ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতার প্রায় ৯৪ শতাংশ ঘটনাই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।

এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণে শিল্পাঞ্চলভিত্তিক এলাকায় ঝুট ও স্ক্র্যাপ ব্যবসা, বালুমহাল, অটোরিকশা স্ট্যান্ড, পশুর হাট এবং ফুটপাতকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্ব ও পদপ্রত্যাশীদের মধ্যকার দ্বন্দ্বও কিছু এলাকায় সহিংসতার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

যা বলছেন বিএনপি নেতারা

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তরের দায়িত্বে) সাইদুর রহমান মিন্টু জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমাদের অসতর্কতার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।’

কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক শিকদার বলেন, ‘গত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে মার খেয়েছি। এখন সরকার গঠন করার পরও মার খেতে হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টের এবং এটি নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।’

সাম্প্রতিক হামলা-হত্যার ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তাদের কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন, কেউ ঘটনার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছে বলে জানিয়েছেন তারা।

সাবেক জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, ‘দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে যে কেউ মারা যেতে পারেন। এখানে দল বা দলের বাইরের বিষয় নয়। সরকার আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, ‘বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অংশ হিসেবে দেখা যায়। সরকার পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তারপরও মাঝেমধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেবে সরকার।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘এসব ঘটনার অধিকাংশই ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ঘটছে, রাজনৈতিক কারণে নয়। প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিষয়টি দল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছে।’

ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘এটিকে সরকারি ব্যর্থতা বলব না। মৃত্যুর পেছনের কারণ আগে দেখতে হবে। এরপর মন্তব্য করা উচিত।’

অন্যদিকে, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না থাকায় এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

নতুন বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন একটি দলের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিজেদের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। তাদের ভাষ্য, আলোচিত প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দলীয় নেতৃত্বের দৃশ্যমান অবস্থান কর্মীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারে থাকা অবস্থায় কোনো দলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতার মূল্যায়ন শুধু অপরাধ দমনের সাফল্য দিয়ে হয় না; বরং নিজেদের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাও জনমনে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, প্রতিটি ঘটনার কারণ ভিন্ন হতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ঘটনাকে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে আইনগত প্রক্রিয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া অধিকতর গ্রহণযোগ্য।

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিএনপি নেতারাও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্ত, বিচারিক অগ্রগতি এবং দলীয় সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া কতটা দৃশ্যমান হয়, সেটিই এখন দলীয় নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে।

কেএইচ/এমএএইচ/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow