সাংবাদিকতা কি দালালি পেশা
সাংবাদিকতা কী? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি তার ওপর। সাংবাদিকতা মূলত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থে তা প্রকাশ করার একটি পেশা। এটি কেবল খবর পরিবেশন নয়, বরং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে আনা, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, এবং সমাজকে সচেতন রাখার একটি প্রক্রিয়া। এই কারণেই সাংবাদিকতাকে প্রায়ই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কিন্তু এখানেই মূল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যখন সাংবাদিকতা ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে ক্ষমতার সাথে আপস করে, যখন সত্যের পরিবর্তে সুবিধা বেছে নেয়, তখনই “দালালি” শব্দটি উঠে আসে। অর্থাৎ সাংবাদিকতা তখন আর স্বাধীন থাকে না, বরং কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি বা কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিনিধিতে পরিণত হয়। সাংবাদিকতার ভূমিকা : আদর্শ বনাম বাস্তবতা আদর্শভাবে সাংবাদিকতার কাজ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: প্রথমত, সত্য অনুসন্ধান দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা তৃতীয়ত, জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এই কাঠামোটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। যেমন Reporters Without Borders বা Committee to Protect Journalists সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এ
সাংবাদিকতা কী? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি তার ওপর।
সাংবাদিকতা মূলত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থে তা প্রকাশ করার একটি পেশা। এটি কেবল খবর পরিবেশন নয়, বরং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে আনা, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, এবং সমাজকে সচেতন রাখার একটি প্রক্রিয়া। এই কারণেই সাংবাদিকতাকে প্রায়ই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়।
কিন্তু এখানেই মূল দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
যখন সাংবাদিকতা ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে ক্ষমতার সাথে আপস করে, যখন সত্যের পরিবর্তে সুবিধা বেছে নেয়, তখনই “দালালি” শব্দটি উঠে আসে। অর্থাৎ সাংবাদিকতা তখন আর স্বাধীন থাকে না, বরং কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি বা কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিনিধিতে পরিণত হয়।
সাংবাদিকতার ভূমিকা : আদর্শ বনাম বাস্তবতা
আদর্শভাবে সাংবাদিকতার কাজ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে:
প্রথমত, সত্য অনুসন্ধান
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা
তৃতীয়ত, জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা
এই কাঠামোটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। যেমন Reporters Without Borders বা Committee to Protect Journalists সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তাকে গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই তিনটি স্তম্ভই নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রভাব, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা : সাংবাদিকতার শক্তি
সাংবাদিকতা একটি অদৃশ্য ক্ষমতা। এটি সরাসরি শাসন করে না, কিন্তু জনমত তৈরি করে। আর জনমতই শেষ পর্যন্ত রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করে।
একটি খবর সরকারের পতন ঘটাতে পারে, আবার একটি গোপন তথ্য যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতি উন্মোচন করেছে, ক্ষমতাবানদের পতন ঘটিয়েছে।
কিন্তু এই শক্তির একটি বিপজ্জনক দিকও আছে।
যদি এই শক্তি নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে এটি হয়ে ওঠে প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার।
কখন সাংবাদিকতা ‘দালালি’ হয়ে ওঠে?
সাংবাদিকতা তখনই দালালিতে পরিণত হয় যখন-
তথ্য বিকৃত করা হয়
ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু তথ্য গোপন রাখা হয়
রাজনৈতিক বা কর্পোরেট স্বার্থে খবর পরিবেশন করা হয়
সাংবাদিক নিজের পেশাগত নীতির বদলে ব্যক্তিগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়
এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ করে ঘটে না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, চাপ, ভয়, লোভ এবং কাঠামোগত দুর্বলতার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট : সংকট কোথায়?
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা একটি জটিল বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে চলছে।
একদিকে আছে সাহসী সাংবাদিক, যারা জীবন ঝুঁকিতে রেখে সত্য তুলে ধরছেন। অন্যদিকে আছে এমন একটি কাঠামো যেখানে:-
মিডিয়ার মালিকানা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত
আইন ও বিধিনিষেধ সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সীমিত করে
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব সাংবাদিকদের আপস করতে বাধ্য করে
ডিজিটাল মিডিয়ার দ্রুত বিস্তার তথ্য যাচাইকে কঠিন করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতা অনেক সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সেটি ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘দালালি’ ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।
কেন আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না?
এর পেছনে কয়েকটি মূল কারণ আছে-
প্রথমত, কাঠামোগত সমস্যা
মিডিয়া হাউসের মালিকানা এবং অর্থায়ন যদি নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক চাপ
ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ অনেক সময় সংবাদ প্রকাশকে প্রভাবিত করে।
তৃতীয়ত, পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা
কম বেতন, অনিশ্চিত চাকরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সাংবাদিকদের আপস করতে বাধ্য করে।
চতুর্থত, নৈতিক সংকট
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ব্যক্তিগত নৈতিকতা। কারণ শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা একটি পেশা হলেও এটি একটি নৈতিক অবস্থান।
কীভাবে চলা উচিত?
সাংবাদিকতা টিকে থাকতে হলে কিছু মৌলিক শর্ত নিশ্চিত করতে হবে:
সম্পূর্ণ সম্পাদকীয় স্বাধীনতা
স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো
তথ্য যাচাইয়ের কঠোর প্রক্রিয়া
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নৈতিকতার প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি
করণীয় : বাস্তবসম্মত পথ
প্রথমত, আইনি সংস্কার
যেসব আইন সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে সীমিত করে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মিডিয়া মালিকানার স্বচ্ছতা
কারা মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে, তা জনগণের জানা উচিত।
তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা
আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, জনসচেতনতা
পাঠক এবং দর্শকদেরও দায়িত্ব আছে, তারা যেন যাচাইবিহীন তথ্য গ্রহণ না করে।
আর কী করা উচিত?
প্রথমত, সত্যের প্রতি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে
সাংবাদিকতা কোনো প্রতিষ্ঠানের আগে একটি ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান। একজন সাংবাদিক যদি নিজের কাছে সৎ না থাকেন, তাহলে কোনো নীতিমালা তাকে সৎ রাখতে পারবে না। তাই পরিবর্তনের শুরুটা ব্যক্তি থেকেই হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, “না” বলার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে
সবচেয়ে বড় সংকট হলো চাপের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ। সাংবাদিকদের শিখতে হবে কোথায় থামতে হবে, কোথায় আপস না করতে হবে। এই ‘না’ বলার সাহসই সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড।
তৃতীয়ত, সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে বাস্তব অর্থে নিশ্চিত করতে হবে
অনেক ক্ষেত্রে কাগজে কলমে স্বাধীনতা থাকলেও বাস্তবে থাকে না। মালিকানা, বিজ্ঞাপনদাতা, রাজনৈতিক প্রভাব, সবকিছু থেকে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে আলাদা করতে না পারলে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
চতুর্থত, শক্তিশালী পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে
একজন সাংবাদিক একা দুর্বল, কিন্তু সম্মিলিতভাবে তারা শক্তিশালী। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সংযুক্তি বাড়াতে হবে, যেমন Reporters Without Borders বা Committee to Protect Journalists এর মতো সংস্থাগুলোর সাথে সক্রিয় সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।
পঞ্চমত, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে
দ্রুত খবরের দৌড়ে গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সমাজ পরিবর্তন করে অনুসন্ধানী রিপোর্টিং। সময়, অর্থ এবং প্রশিক্ষণ, এই তিনটিতে বিনিয়োগ ছাড়া মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।
ষষ্ঠত, ডিজিটাল যুগে তথ্য যাচাইকে বাধ্যতামূলক করতে হবে
ভুয়া খবর এখন সবচেয়ে বড় হুমকি। প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে শক্তিশালী ফ্যাক্ট চেকিং ইউনিট থাকা উচিত। দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সপ্তমত, পাঠককেও দায় নিতে হবে।
শুধু সাংবাদিক নয়, সমাজও দায়মুক্ত নয়। আমরা কী পড়ছি, কী শেয়ার করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক যদি যাচাইবিহীন তথ্য গ্রহণ করে, তাহলে অসৎ সাংবাদিকতার বাজার তৈরি হয়।
অষ্টমত, রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, স্বাধীন সাংবাদিকতা শত্রু নয়
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কখনো স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ভয় পায় না। বরং সেটিকে ব্যবহার করে নিজেকে আরও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। এখানে নীতিগত পরিবর্তন জরুরি।
শেষ উপলব্ধি
সাংবাদিকতা ঠিক করার দায়িত্ব শুধু সাংবাদিকদের না।
এটি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজ, সবাই জড়িত।
যদি আমরা সত্যিই চাই সাংবাদিকতা দালালি থেকে বেরিয়ে আসুক, তাহলে আমাদের সবাইকে নিজেদের অবস্থান থেকে একটি করে সৎ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সাংবাদিকতা নিজে দালালি পেশা নয়।
কিন্তু সাংবাদিকতা যখন তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সেটি দালালির রূপ নিতে পারে।
প্রশ্নটি তাই পেশাকে নয়, বরং পেশার চর্চাকে ঘিরে।
সাংবাদিকতা একা দালাল হয় না।
যখন সমাজ সত্য এড়িয়ে যায়, তখনই দালালির বাজার তৈরি হয়।
এখন প্রশ্ন, এই বাজারের ক্রেতা আমরা নই তো?
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
What's Your Reaction?